হার কমলেই করোনা ইউনিট সরিয়ে
ফেলার প্রস্তাব দেবো : সিভিল সার্জন

এইচ এম আলাউদ্দিন ঃ আড়াইশ’ বেডের খুলনা জেনারেল হাসপাতালে সর্বোচ্চ ৮০টি করোনা রোগীর চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে। পক্ষান্তরে আন্ত: ও বহি:বিভাগে প্রতিদিন সেবা বঞ্চিত হচ্ছে অর্ধ সহ¯্রাধিক রোগী। করোনা পরিস্থিতি সামাল দিতে গিয়ে কর্তৃপক্ষকে নিতে হয়েছে এমন সিদ্ধান্ত।
এদিকে, করোনা রোগীদের চিকিৎসা সেবা অব্যাহত রাখতে শুধুমাত্র মেডিসিন বিভাগের চিকিৎসকরা পেশাগত দায়িত্ব পালনের সুযোগ পেলেও সার্জারী, শিশু, গাইনীসহ অন্যান্য বিভাগের ডাক্তারদের ব্যস্ত সময় কাটাতে হচ্ছে অফিসিয়াল কাজে। কেউ কেউ বসে বসে অলস সময় কাটাচ্ছেন।
এ অবস্থায় করণীয় কি তার পরামর্শও দেয়া হয়েছিল করোনা ইউনিট করার সময়। হাসপাতালের একজন চিকিৎসক ওই সময় বলেছিলেন, খুলনা জিলা স্কুলে অস্থায়ীভাবে অন্তত: বহি:বিভাগের সেবা চালু রাখা যায় কি না সেটি বিবেচনায় নিতে। কিন্তু সেটি তখন আমলে নেয়া হয়নি।
খুলনা জেনারেল হাসপাতালে গতকাল বুধবার সকালে গিয়ে দেখা যায়, বেশ কয়েকজন রোগী আসছেন সেবা নিতে। করোনা ইউনিট চালুর পরও কেন এখানে এসেছেন জানতে চাইলে একজন বৃদ্ধা জানালেন, মাঝে মধ্যে এখানের ডাক্তারদের কাছে রোগের কথা বললে ওষুধ দেয়া হয়। এখন আবার একই সমস্যা দেখা দিয়েছে, তাই তিনি এসেছেন। হাসপাতাল থেকে বলা হচ্ছে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে গিয়ে ডাক্তার দেখাতে। কিন্তু সেখানে যাওয়ার সঙ্গতি তার নেই। একদিকে লকডাউন চলছে, অপরদিকে রিক্সাযোগে যেতে যে টাকা লাগবে তা তার নেই। এজন্য ব্যর্থ হয়েই ফিরে যান বাসায়।
অপর এক রোগী আসেন তার শিশু সন্তানকে রক্ত দেয়ার জন্য। কিন্তু এখন সে সুযোগটি নেই। বাইরে থেকে তার সন্তানকে রক্ত দিতে হলে অনেক টাকার প্রয়োজন। তার স্বামী বড় বাজারের হ্যান্ডলিং শ্রমিক। বর্তমানে কাজ প্রায় বন্ধ। বাইরে থেকে রক্ত দেয়ার সঙ্গতি তার নেই।
হাসপাতালের শিশু বিভাগের কনসালটেন্ট ডা: শরাফাত হোসেন বলেন, করোনা ইউনিট চালুর আগে মাসে অন্তত: ১২৯টি শিশুকে রক্ত দেয়া হতো। এখন সেটি বন্ধ হয়ে গেছে। এতে অনেক রোগীই সংকটে পড়েছেন এমনটি স্বীকারও করেন তিনি। তার মতে গরীব রোগীগুলো অনেক সমস্যায় পড়ে গেলো। অবশ্য যে হারে করোনা ভয়াবহ আকারে বাড়ছে তাতে এর কোন বিকল্পও ছিল না বলেও তিনি উল্লেখ করেন। কেননা আগে মহামারী থেকে দেশকে রক্ষার জন্যই সব চেষ্টা করতে হবে, তারপর অন্য চিন্তা।
খুলনা জেনারেল হাসপাতালের অপর একটি সূত্র জানায়, এ হাসপাতালের সার্জারী বিভাগের বর্তমান চিকিৎসক ডা: রফিকুল ইসলাম যোগদানের পর থেকে এ পর্যন্ত দেড়শ’র উপরে ল্যাপারেস্কপি অপারেশন করেছেন। এছাড়া প্রতি মাসে শতাধিক সার্জারী হয়। গাইনী বিভাগেরও একটি উল্লেখযোগ্য সংখ্যক রোগী এখান থেকে সেবা পেতো। বিশেষ করে শিশু বিভাগে প্রতিদিন কয়েকশ’ রোগীর বহি:বিভাগ ও আন্ত:বিভাগে সেবা দেয়া হতো। বহি:বিভাগের প্রায় প্রতিটি বিভাগেই বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক দিয়ে সেবা দেয়া হতো। অথচ ইএনটি বিভাগের চিকিৎসককে এখন করোনা ইউনিটের মুখপাত্র হিসেবে কাজ করতে হচ্ছে। শিশু কনসালটেন্ট রয়েছেন রোষ্টার নিয়ে ব্যস্ত। ডেন্টাল বিভাগের চিকিৎসকও করোনা ইউনিটের সহযোগী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। সিনিয়র হওয়ায় সার্জারীর চিকিৎসক অনেকটা অলস সময় কাটাচ্ছেন। অর্থাৎ শুধুমাত্র মেডিসিন বিভাগ ছাড়া অন্যান্য বিভাগের চিকিৎসকদের রাখা হয়েছে চিকিৎসা সেবার বাইরে। যেটি তাদের পেশাগত ক্ষেত্রে যেমনটি প্রভাব ফেলতে পারে তেমনি রোগীরাও হচ্ছে সেবা বঞ্চিত।
অপরদিকে, করোনা ইউনিটে ১৫দিন ডিউটি করার পর পরবর্তী ১৫দিন হোম কোয়ারেন্টাইনে থাকতে হবে চিকিৎসক, নার্স ও কর্মচারীদের। সে ক্ষেত্রেও করোনা ইউনিটের জন্য জনবল আরও প্রয়োজন। অর্থাৎ অন্যান্য বিভাগের জনবল থাকলেও মেডিসিন বিভাগের ডাক্তারের স্বল্পতা রয়েছে। সব মিলিয়ে করোনার রোগীদের সেবা এখন স্বাভাবিক গতিতে চললেও একটি পর্যায় গিয়ে সেখানেও সংকট তৈরি হতে পারে এমন আশংকাও করছেন অনেকে।
যদিও হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ও খুলনার সিভিল সার্জন ডা: নিয়াজ মোহাম্মদ বলেন, যেহেতু সাময়িক সময়ের জন্য করোনা ইউনিট চালু করা হয়েছে সেহেতু এ সমস্যাও সাময়িক। আক্রান্তের হার কমলেই এ হাসপাতাল থেকে করোনা ইউনিট সরিয়ে নেয়ার প্রস্তাব দেবেন তিনি। কেননা এজন্য সাধারণ রোগীদের ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে। জেনারেল হাসপাতালে রোগীর সংখ্যা ২০জনে নেমে আসলেই জেলা করোনা বিষয়ক কমিটির সদস্য সচিব হিসেবে তিনি এ প্রস্তাব দেবেন বলেও উল্লেখ করেন।
হাসপাতালের করোনা ইউনিটের মুখপাত্র ডা: কাজী আবু রাশেদ বলেন, গতকাল সকালে এ হাসপাতালে ৮০ বেডের বিপরীতে ৬৫জন রোগী ছিল। বিগত ২৪ ঘন্টায় এ হাসপাতালে পাঁচজনের মৃত্যু হয়। অবস্থা খারাপ হওয়ায় একজনকে দুপুরে শহীদ শেখ আবু নাসের বিশেষায়িত হাসপাতালে নেয়া হয়েছে। যেহেতু এখানে মূমূর্ষ কাউকে রাখা হয় না সেহেতু অবস্থা একটু ভালোর দিকে গেলেই করোনা ইউনিট নিয়ে হয়তো বিকল্প কিছু ভাবা হবে।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, খুলনা জেনারেল হাসপাতালের জরুরি বিভাগের চারতলা ভবনটি করোনা ইউনিট করা হলেও মূল ভবনটি প্রায় অকেজো হয়ে পড়ে আছে। অপারেশন থিয়েটারে ও.টি নেই, কেবিলগুলো তালাবদ্ধ আর কয়েকটি বিভাগের সারি সারি বেড সব ফাঁকা। প্রশাসনিক কাজকর্ম আগের মতোই চললেও ডাক্তারদের চেম্বারগুলো এখন ব্যবহার হচ্ছে করোনা ইউনিটের সমন্বয়ের কাজের ক্ষেত্র হিসেবে। রক্ত পরিসঞ্চালন ও প্যাথলজি বিভাগের কাজও কমে গেছে। ওই ভবনটি এখন ব্যবহৃত হচ্ছে ভ্যাকসিন কেন্দ্র হিসেবে। এজন্য প্রতিদিন সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত লাইন দিয়ে মানুষ ভ্যাকসিন নিচ্ছেন।
অবশ্য বহি:বিভাগের রোগী দেখা বন্ধ থাকলেও চালু রয়েছে ফ্লু কর্ণারের রোগী দেখা। অর্থাৎ করোনার উপসর্গ আছে এমন রোগীদের দেখে সেবা দেয়া হচ্ছে জেনারেল হাসপাতালে। সংশ্লিষ্ট বিভাগে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ফ্লু কর্ণারে দৈনিক ৬০ থেকে একশ’ রোগী দেখা হয়। কিন্তু অন্য কোন রোগী এ হাসপাতালে দেখা হচ্ছে না।