এইচ এম আলাউদ্দিন ঃ বেডের চেয়ে রোগী বেশি খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের করোনা ইউনিটে। অতিরিক্ত রোগী ভর্তি না করায় প্রায় দিনই বেড পূর্ণ থাকে শহীদ শেখ আবু নাসের বিশেষায়িত হাসপাতালের করোনা ইউনিটেও। আর একমাত্র খুলনা জেনারেল হাসপাতালেই বেডের চেয়ে রোগী কম থাকে। এ চিত্র খুলনার তিনটি সরকারি হাসপাতালের।
এদিকে, জনবহুল এলাকার খুলনা জেনারেল হাসপাতালটি আড়াইশ’ শয্যার হলেও এখানে ৮০ বেডের করোনা হাসপাতালের কার্যক্রম চলছে। এ হাসপাতালে আইসিইউ সুবিধা এবং লিফট না থাকায় চার তলা পর্যন্ত রোগী নিয়ে ওঠানামা করতে দুর্ভোগ পোহানোর ফলে রোগীরাও খুব বেশি সংকটে না পড়লে এ হাসপাতাল এড়িয়ে চলার চেষ্টা করেন। আবার দেখা যাচ্ছে, কখনও জেনারেল হাসপাতালের কোন রোগীর অবস্থা খারাপ হলে তাকে হয় খুলনা মেডিকেলে অথবা আবু নাসেরে নেয়া হয়। এতেও আইসোলেটেড(পৃথক) রাখার সুযোগ থাকছে না করোনা রোগীদের। শহরের মধ্য থেকেই এক হাসপাতাল থেকে অন্য হাসপাতালে নিতে হয় রোগী। ফলে করোনাভাইরাস আরও সংক্রমিত হওয়ারও আশংকা থাকে।
সব মিলিয়ে জনবহুল এলাকার এ হাসপাতালটির পরিবর্তে খুমেক হাসপাতালের বেডসংখ্যা বাড়ানোর পাশাপাশি খুলনায়ও ফিল্ড হাসপাতাল করার চিন্তা-ভাবনা করা যেতে পারে এমন প্রস্তাবও দেয়া হয়েছে খুলনার স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞসহ সচেতন মহলের পক্ষ থেকে। আর ফিল্ড হাসপাতাল করা হলে অন্তত: একাধিক জায়গায় করোনা রোগীদের রেখে সংক্রমণের ঝুঁকিও থাকবেনা বলেও তাদের মন্তব্য।
এছাড়া শুরুতেই যেখানে করা হয়েছিল সেই ডায়াবেটিক হাসপাতালে পুনরায় করোনা হাসাতাল চালুরও মত দিয়েছেন অনেকে। কিন্তু গত বছর সাত মাস সেখানে করোনা হাসপাতাল করার ফলে প্রায় কোটি টাকার ক্ষতিপূরণ দাবি আজও বাস্তবায়ন হয়নি। এজন্য খুলনা ডায়াবেটিক সমিতির পক্ষ থেকে তৎকালীন জেলা প্রশাসকের কাছে একাধিকবার লিখিত আবেদন করেও ক্ষতিপূরণ মেলেনি। বর্তমানে ডায়াবেটিক হাসপাতালের চিকিৎসক, কর্মকর্তা, কর্মচারীদের প্রায় চার মাসের বেতন বকেয়া রয়েছে বলেও খুলনা ডায়াবেটিক সমিতির সদস্য সচিব এ্যাড. রজব আলী সরদার জানান।
সমিতির পরিচালনা পরিষদের সদস্য ও খুলনা চেম্বার অব কমার্স এন্ড ইন্ডাষ্ট্রির পরিচালক মফিদুল ইসলাম টুটুল বলেন, খুলনার সরকারি তিনটি ও একটি বেসরকারি হাসপাতালে করোনা রোগীদের জন্য ইউনিট করে চিকিৎসা সেবা দেয়া হলেও অনেক বড় বড় বেসরকারি হাসপাতাল এখনও করোনার পরীক্ষা ও চিকিৎসার আওতায় আনা হয়নি। বর্তমানে খুলনার যে অবস্থা তাতে দ্রুততম সময়ের মধ্যেই খুলনা সিটি মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, আদ্ দ্বীন আকিজ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এবং ইসলামী ব্যাংক হাসপাতালসহ বৃহৎ যেসব প্রতিষ্ঠান রয়েছে সেগুলোকেও কোভিড-১৯ রোগীদের চিকিৎসার আওতায় আনা উচিত বলেও তিনি মনে করেন।
খুলনা বিএমএ’র সভাপতি ডা: শেখ বাহারুল আলম অবশ্য নতুন ফর্মুলার কথা জানান। তিনি বলেন, রাজধানীতে যেমন পাঁচটি ফিল্ড হাসপাতাল করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে তেমন হাসপাতাল খুলনায়ও করা যেতে পারে। এমন সিদ্ধান্তের জন্য তিনি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকেও ধন্যবাদ জানান। খুলনায় অস্থায়ী ভিত্তিক এমন ফিল্ড হাসপাতাল করা হলে করোনা রোগীদের দ্রুত পরীক্ষা ও চিকিৎসার আওতায় আনা সম্ভব বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
খুলনা বিএমএ’র সাধারণ সম্পাদক ডা: মো: মেহেদী নেওয়াজ বলেন, সাধারণত যুদ্ধকালীন সময় একসাথে অনেক আহত লোককে চিকিৎসা দেয়ার জন্যই বড় কোন মাঠে বা বড় জায়গায় তাবু টানিয়ে যে চিকিৎসাকেন্দ্র করা তার আলোকেই ফিল্ড হাসপাতালের ধারণাটি আসে। ঠিক তেমনিভাবে যুদ্ধকালীন না হলেও যেহেতু এটি একটি মহামারী সেজন্য ওই আদলে ফিল্ড হাসপাতাল করার ধারণা দেয়া হয়। তবে এটি যে, শুধু মাঠে বা ফাঁকা জায়গায়ই হতে হবে তেমনটি নয়, অন্য কোন প্রাতিষ্ঠানিক স্থাপনায়ও এমন হাসপাতাল করা যেতে পারে। যেমনটি গত বছর ঢাকায় বসুন্ধরায় করা হয়েছিল। যদিও সেসময় কোন রোগী ভর্তি না হওয়ায় সেখানের জন্য যেসব মালামাল দেয়া হয়েছিল সেগুলো দেশের বিভিন্ন সরকারি হাসপাতালে দেয়া হয়। যার আলোকে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থাপন করা হয়েছে স্পেক্ট্রা কোম্পানীর অক্সিজেন ট্যাংকি। যদিও এখনও পর্যন্ত সেখানে অক্সিজেন দিতে ব্যার্থ হয়েছে সংশ্লিষ্ট কোম্পানী। সরকারের সদিচ্ছা থাকার পরও এ ধরনের কোম্পানীর কারণেই মাঝে-মধ্যে সরকারকে প্রশ্নের মুখে ফেলে দেয়া হয় বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
তবে খুলনার আদ্ দ্বীন ও সিটি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সাথে আলোচনা চলছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ওই দু’টি হাসপাতালে দেড়শ’ থেকে দুশ’ আর খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে সর্বমোট তিন শতাধিক বেড প্রস্তুত করা গেলে হয়তো আর ফিল্ড হাসপাতালের প্রয়োজন হবে না। কিন্তু এর পরও যদি পরিস্থিতি অবনতি হয় তখন হয়তো ফিল্ড হাসপাতালের বিষয়টি মাথায় রাখতে হবে বলেও তিনি জানান।
অবশ্য সরাসরি ফিল্ড হাসপাতাল না হলেও এমন ধারণা থেকেই খুলনায় করোনা রোগীদের চিকিৎসার জন্য সেনাবাহিনীর ব্যবস্থাপনায় পৃথক করোনা চিকিৎসা কেন্দ্র স্থাপনের দাবি জানিয়েছেন খুলনা-২ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য নজরুল ইসলাম মঞ্জু। তিনি বলেন, করোনার প্রকোপ যে হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে তাতে এর কোন বিকল্প নেই।
সংশ্লিষ্ট হাসপতালগুলোর মুখপাত্রদের দেয়া তথ্য অনুযায়ী খুলনার তিনটি সরকারি হাসপাতালের মধ্যে খুমেক হাসপাতালের করোনা ইউনিটে দেড়শ’ বেডের বিপরীতে গতকাল সকালে ছিলেন ১৮৮ রোগী আর শহীদ শেখ আবু নাসের বিশেষায়িত হাসপাতালে ৪৫ বেডের বিপরীতে ৪৪জন রোগী ছিলেন। এছাড়া খুলনা জেনারেল হাসপাতালে ৮০টি বেডের বিপরীতে গতকাল রোগী ছিলেন ৭৬জন। এছাড়া বেসরকারি প্রতিষ্ঠান গাজী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে দেড়শ’ বেডের বিপরীতে গতকাল ছিলেন ১৩০ রোগী।
উল্লেখ্য, করোনাভাইরাসে সংক্রমিত রোগীদের চিকিৎসার জন্য চট্টগ্রামে দেশের প্রথম ফিল্ড হাসপাতালের কার্যক্রম শুরু হয়েছিল গত বছর ২১ এপ্রিল থেকে। কয়েক মাস পর রোগীর চাপ কমলে হাসপাতালটি বন্ধ করা হয়। তবে সেখানকার স্থানীয় সাংবাদিক সাইফুল ইসলাম শিল্পী এ প্রতিবেদককে বলেন, চট্টগ্রামের অনেকগুলো বেসরকারি প্রতিষ্ঠানেই করোনা রোগীদের চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে। যে কারণে ফিল্ড হাসপাতালের আপাতত: কোন প্রয়োজন হচ্ছে না।