খুমেক হাসপাতালের নবাগত
পরিচালক ডা: রবিউল হাসান

এইচ এম আলাউদ্দিন ঃ করোনার রোগীদের সেবার বিষয়টিকেই আগে প্রাধান্য দেয়া হবে। এরপর অন্যান্য রোগীদেরও সেবার মান পর্যায়ক্রমে বৃদ্ধি করা হবে। এজন্য আপাতত হাসপাতালের আইসিইউ ভবনকেই করোনা ডেডিকেটেড হাসপাতাল হিসেবে রাখা হবে। পরবর্তীতে করোনা দীর্ঘমেয়াদী হওয়ার আশংকা থাকলে পৃথক কোন স্থানে করোনা হাসপাতাল স্থানান্তর করে আইসিইউ ভবনেই শুধুমাত্র আইসিইউ বা নিবিড় পরিচর্চাকেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করা হবে। পাশাপাশি আইসিইউ ভবনে বা করোনা ডেডিকেটেড হাসপাতালে স্পেক্ট্রা কোম্পানীর অক্সিজেন প্লান্ট স্থাপনের ব্যাপারেও স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও মন্ত্রণালয়ে যোগাযোগ করা হবে। এছাড়া হাসপাতালের বহি:বিভাগ ও আন্ত:বিভাগের বহিরাগত কথিত দালালদের হাত থেকে রোগী হয়রানি বন্ধের পদক্ষেপসহ নানা পরিকল্পনার কথা জানালেন খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নবাগত পরিচালক ডা: মো: রবিউল হাসান।
গতকাল রোববার তিনি এ প্রতিবেদককে বলেন, তত্ত্বাবধায়ক হিসেবে অনেকেই দায়িত্ব পালন করলেও পরিচালক হিসেবে তিনি তৃতীয় ব্যক্তি। অর্থাৎ আগের দু’পরিচালকের রেখে যাওয়া কাজকে তিনি এগিয়ে নেবেন। মূলত: এটিই তার প্রাথমিক পরিকল্পনা। এর পরেও সীমিত জনবল দিয়ে তিনি রোগীদের সেবার মান বজায় রাখার চেষ্টা করবেন উল্লেখ করে বলেন, প্রাথমিকভাবে রোগীদের বাইরের ডায়াগনষ্টিক সেন্টারে যাওয়া থেকে নিবৃত করার চেষ্টা করবেন। এজন্য তিনি হাসপাতালের চিকিৎসক, নার্সসহ অন্যান্য কর্মকর্তা-কর্মচারীদের উদ্বুদ্ধ করবেন। যাতে তাদের পক্ষ থেকে রোগীদের বাইরের প্রতিষ্ঠান থেকে পরীক্ষা করাতে নিরুৎসাহিত করা হয়। তাছাড়া রোগীদেরকেও বোঝানো হবে যে, বাইরের প্রতিষ্ঠানের চেয়ে হাসপাতালে অনেক কম মূল্যে প্যাথলজীক্যালসহ অন্যান্য পরীক্ষা-নিরীক্ষার সুযোগ রয়েছে। যেহেতু এটি একটি সরকারি হাসপাতাল, সেহেতু সরকারি এ সুযোগটি নেয়ার জন্য তিনি রোগীদের প্রতি আহবান জানাবেন। পাশাপাশি বহিরাগত দালালদের দৌরাত্ম্য দূর করতে তিনি চেষ্টা করবেন উল্লেখ করে বলেন, এজন্য ইতোমধ্যেই তিনি চিকিৎসক ও অন্যান্য কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সাথে আলোচনা করেছেন। সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় তিনি সকল ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা আনার চেষ্টা করবেন। স্বচ্ছতার জন্য তিনি সকল প্রকার ইউজার ফি(সেবার বিনিময়ে গ্রহণ করা অর্থ) ব্যাংকের মাধ্যমে গ্রহণের ব্যবস্থা করবেন। এতে সংশ্লিষ্ট কর্মচারীদের জবাবদিহিতার আওতায় আনা সম্ভব হবে। এক কথায় জনগনের সেবাই থাকবে তার মূল উদ্দেশ্য। কেউ যাতে হাসপাতালে এসে হয়রানীর শিকার না হয় সেদিকেও নজরদারি রাখা হবে।
সেবার মান বৃদ্ধির বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে খুমেক হাসপাতালের নয়া পরিচালক বলেন, মূলত: স্বাস্থ্যসেবার জন্য তিনটি বিষয়কে প্রাধান্য দিতে হয়। এগুলো হচ্ছে, অবকাঠামোগত উন্নয়ন, প্রয়োজন অনুযায়ী জনবল পদায়ন এবং যন্ত্রপাতির চাহিদা মেটানো। এর মধ্যে বর্তমানে জনবল ও অবকাঠামোগত সমস্যাই এখানে বেশি। জনবলের অভাবে যেমন অধিক রোগীর চাপ সামলানো কঠিন হয়ে পড়ছে তেমনি অবকাঠামোগত উন্নয়নের অভাবে অনেক বিভাগ খোলা যাচ্ছে না। বিশেষ করে ইউরোলজী, নিউরোলজীসহ অনেক বিভাগ এখনও চালু হয়নি এ হাসপাতালে। অথচ এসব বিভাগে দক্ষ চিকিৎসক রয়েছেন।
জনবল ও অবকাঠামো সংকট থাকলেও যন্ত্রপাতি ও ওষুধ সংকট আপাতত নেই বলেও তিনি উল্লেখ করেন। আর জনবলের সংকটটি যেমন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ এবং অর্থ মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনের ওপর নির্ভরশীল সেহেতু এজন্য মন্ত্রণালয়ে পত্র দেয়া হয়েছে। আশা করা যাচ্ছে দ্রুত এর একটি সমাধান হবে। আর অবকাঠামোগত উন্নয়নও ধারাবাহিকভাবে হচ্ছে। তবে এজন্য দীর্ঘ মেয়াদী পরিকল্পনা নেয়া দরকার।
হাসপাতাল অভ্যন্তরে স্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর যে মাল্টিপারপাস ভবন নির্মাণ করছে সেটি হলেও রোগীর ভিজিটরদের জন্য যেমন অবকাশের সুযোগ সৃষ্টি হবে তেমনি চিকিৎসকরাও কিছুটা বিশ্রামের সুযোগ পাবেন। সেই সাথে খুলনার বাইরে থেকে আগত বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের জন্য থাকবে মান সম্মত গেষ্ট হাউজ এবং একটি কনফারেন্স রুম। পাশাপাশি হাসপাতালের ওষুধ ও অন্যান্য মূল্যবান যন্ত্রপাতি রাখার জন্যও উপযুক্ত পরিবেশ সৃষ্টি হবে। সব মিলিয়ে মাল্টি পারপাস ভবনটিও স্বাস্থ্যসেবার ক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা হচ্ছে।
দীর্ঘদিন ধরে হাসপাতালে মেডিকেল সার্টিফিকেট বাণিজ্য বন্ধ আছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এখন শুধুমাত্র আদালত বা থানা থেকে চাহিদার আলোকেই মেডিকেল সার্টিফিকেট ইস্যু করা হয়। সুতরাং রোগী সরাসরি চিকিৎসক বা অন্যান্য মধ্যম শ্রেণির কারও কাছ থেকে অর্থের বিনিময়ে এমসি(মেডিকেল সার্টিফিকেট) নিতে পারছেন না। তবে ওষুধ চুরি বহিরাগত দালালদের নির্মূল করতে তিনি ইতোমধ্যেই বেশ কয়েক দফায় সংশ্লিষ্টদের সাথে আলোচনা করেছেন। করোনার প্রভাব কিছুটা কমলে স্বাস্থ্যসেবা কমিটির বৈঠক করেও এ ব্যাপারে পরিকল্পনা গ্রহণ করা হবে।
হাসপাতালে রোগীর সাথে একজনের বেশি দর্শনার্থী না থাকার বিষয়টির ওপর তিনি জোর দেন। এজন্য ইতোমধ্যে দর্শনার্থী কার্ড প্রথা চালু হয়েছে। যেটি একটি ইতিবাচক দিক বলেও তিনি উল্লেখ করেন। তবে এটিকে কার্যকরী করতে রোগীর দর্শনার্থীদের আরও সচেষ্ট হওয়া উচিত। রোগীর সেবা নিশ্চিত করতে হলে দর্শনার্থী কমানো প্রয়োজন বলেও তিনি মনে করেন। এজন্যও সবার সার্বিক সহযোগিতা চান তিনি।
হাসপাতালের বহি:বিভাগে শৃংখলা আছে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, এটি অবশ্য একটি কঠিন সমস্যা। সেখানে চিকিৎসকদের যথা সময়ে আগমন নিয়ে অনেকের বিরুদ্ধে অভিযোগ আছে। যেটি কিছুটা কমে গিয়েছিল ডিজিটাল হাজিরার জন্য ফিংগার প্রিন্ট মেশিন স্থাপনের পর। কিন্তু গত বছর করোনা ছড়িয়ে পড়ার পর থেকে মেশিন বন্ধ রাখা হয়। এতে আবারো অনেকের হাজিরা যথাসময়ে হচ্ছে কি না সেটি দেখা যাচ্ছে না। তবে এ ব্যাপারেও তিনি স্বাস্থ্যসেবা কমিটির সাথে আলোচনা করে যথা সময়ে উপস্থিতি নিশ্চিত করার পাশাপাশি বহিরাগত কথিত দালাল নির্মূলের চেষ্টা করবেন বলে প্রতিশ্রুতি দেন।
সর্বোপরি রোগীদের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে প্রতি সপ্তাহে সংশ্লিষ্টদের নিয়ে পরিকল্পনা গ্রহণ ও সে অনুযায়ী কার্যক্রম গ্রহণ করা হবে বলেও তিনি জানান। তবে এজন্য তিনি ধর্মীয় মূল্যবোধ জাগ্রত করার পাশাপাশি নৈতিকতাবোধ হওয়ার আহবান জানান।
সর্বোপরি ওষুধ কোম্পানীর প্রতিনিধিদের শৃংখলার মধ্যে আনার ব্যাপারে তিনি বলেন, মেডিকেল প্রতিনিধিদের দ্বারা প্রায়ই রোগী নাজেহালের খবর শোনা যায়। বিশেষ করে কোন রোগী ডাক্তারের কক্ষ থেকে বের হওয়ার সাথে সাথেই প্রেসক্রিপশনের ছবি তোলা হয়। এছাড়া যে কোন সময় যে কোন চিকিৎসকের কক্ষে বা বহি:বিভাগ, আন্ত:বিভাগে তারা প্রবেশ করছেন। এতে অনেক সময় রোগীর সেবাদান ব্যাহত হয়। আন্ত:বিভাগ থেকে রোগীর ছাড়পত্র লেখার সময়ও ইন্টার্নী চিকিৎসক ও ওয়ার্ডের দায়িত্বপ্রাপ্ত চিকিৎসকদের ভিজিট করা হয়। এসব ব্যাপারে সপ্তাহের একটি নির্দিষ্ট দিন ও নির্দিষ্ট সময়ে ভিজিটের জন্য নির্ধারন করে দেয়া হবে বলেও তিনি জানান।
হাসপাতালের তৃণমূলের সেবার বিষয়টি নির্ভর করছে অনেকটা আউটসোর্সিং কর্মচারীদের ওপর। অথচ তারা রয়েছে নানা সংকটে। কথায় কথায় চাকরী চলে যাওয়া, কারণ ব্যাখ্যা না করেই বেতন থেকে অর্থ কেটে নেয়া, অর্থের বিনিময়ে চাকরী দেয়া এসব নানা বিষয়ে নতুন পরিচালকের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে তিনি বলেন, সব বিষয়ে সকলের সহযোগিতা নিয়ে তিনি হাসপাতালের কার্যক্রমকে এগিয়ে নিতে চান। সে ক্ষেত্রে কারও প্রতি কোন প্রকার জুলুম করা হবে না বওে তিনি উল্লেখ করেন।
উল্লেখ্য, ডা: মো: রবিউল হাসান গত ১৯ মে খুমেক হাসপাতালের পরিচালক হিসেবে যোগদান করেন। এর আগে তার স্থলে দায়িত্ব পালন করেন ডা: এটিএম মঞ্জুর মোর্শেদ এবং ডা: মুন্সী মো: রেজা সেকেন্দার। ডা: এটিএম মঞ্জুর মোর্শেদ ছিলেন এ হাসপাতালের প্রথম পরিচালক। এর আগে হাসপাতালের প্রধান কর্তার পদটি ছিল তত্ত্বাবধায়ক। ডা: এটিএম মঞ্জুর মোর্শেদ ২০১৮ সালে তত্ত্বাবধায়ক হিসেবে যোগদান করলেও তার চেষ্টায় পরিচালক পদ সৃষ্টি হয়। এরপর তাকে বদলী করা হয়েছিল পাবনা মানষিক হাসপাতালে। ওই সময় সেখানে পরিচালক হিসেবে পদায়ন করা হয় ডা: মুন্সী মো: রেজা সেকান্দারকে। পরে ডা: সেকান্দারকে খুলনার শহীদ শেখ আবু নাসের বিশেষায়িত হাসপাতালে বদলী করে ডা: এটিএম মঞ্জুর মোর্শেদকে আবারো পদায়ন করা হয়। তিনি গত ২৮ এপ্রিল অবসরে গেলে ভারপ্রাপ্ত পরিচালক হিসেবে হাসপাতালের উপ-পরিচালক ডা: বিধান চন্দ্র ঘোষ কিছুদিন দায়িত্ব পালন করেন। সর্বশেষ স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপনের আলোকে ঝিনাইদহ ইনষ্টিটিউট অব হেলথ টেকনোলজির অধ্যক্ষ ডা: মো: রবিউল হাসানকে খুমেক হাসপাতালের পরিচালক হিসেবে বদলী করা হলে তিনি এখানে যোগদান করেন।