এইচ এম আলাউদ্দিন ঃ ক্রমেই দীর্ঘ হচ্ছে মৃত্যুর মিছিল। আবারো একদিনে খুলনা বিভাগে রেকর্ড ভাঙলো মৃত্যুতে। একই অবস্থায় খুলনা জেলায়ও। বিভাগে দেড় হাজার ছুঁই ছুঁই প্রায় মৃত্যর সংখ্যা। বিগত ২৪ ঘন্টায় এ যাবতকালের সকল রেকর্ড ভেঙে ৭১ জনের মৃত্যু হয়েছে এ বিভাগে। শুধুমাত্র সাতক্ষীরা ছাড়া বিভাগের সব জেলায়ই মৃত্যুর ঘটনা ঘটে বিগত ২৪ ঘন্টায়। এর মধ্যে সর্বোচ্চ সংখ্যক মৃত্যু হয় খুলনা জেলায় অর্থাৎ ২৩জন। এ নিয়ে খুলনায় ৩৯২জন এবং বিভাগে এক হাজার ৪৮৭জনের মৃত্যু হয় করোনায়। এ হিসাব বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক দপ্তরের।
বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক ডা: রাশেদা সুলতানা জানান, বিগত ২৪ ঘণ্টায় বিভাগের মধ্যে সর্বোচ্চ ২৩ জনের মৃত্যু হয়েছে খুলনা জেলায়। বাকিদের মধ্যে কুষ্টিয়ায় ১৪ জন, যশোরে ৯ জন, ঝিনাইদহে ১০ জন, চুয়াডাঙ্গা ছয়জন, মেহেরপুরে পাঁচজন, বাগেরহাটে দু’জন, নড়াইল ও মাগুরায় একজন করে রয়েছে।
বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালকের দপ্তরের সূত্র মতে, খুলনা বিভাগের মধ্যে প্রথম করোনা রোগী শনাক্ত হয় গত বছর ১৯ মার্চ চুয়াডাঙ্গায়। সেই থেকে শুরু করে গতকাল শুক্রবার সকাল আটটা পর্যন্ত বিভাগের ১০ জেলায় মোট শনাক্তের সংখ্যা ৬৯ হাজার ১৮৭ জন। আক্রান্ত্র হয়ে মারা গেছেন এক হাজার ৪৮৭ জন আর সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন ৪৪ হাজার ৭২৭ জন।
বিভাগীয় স্বাস্থ্য অধিদফতরের জেলাভিত্তিক করোনা সংক্রান্ত তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, গত ২৪ ঘণ্টায় বিভাগে খুলনা জেলায় করোনা শনাক্ত হয়েছে ২৯৬ জনের। এ পর্যন্ত জেলায় করোনা শনাক্ত হয়েছে ১৮ হাজার ১৯৪ জনের। মারা গেছেন ৩৯২ জন এবং সুস্থ হয়েছেন ১২ হাজার ২৯১ জন।
খুলনায় প্রথম করোনা রোগী শনাক্ত হয়েছিল গত বছর ১৩ এপ্রিল। নগরীর সোনাডাঙ্গা মডেল থানাধীন করিম নগর এলাকার একজনের প্রথম শনাক্ত হয় খুলনা মেডিকেল কলেজের আরটি পিসিআর ল্যাবে। এর আগে খুলনায় প্রথম শনাক্ত হয় নগরীর হেলাতলা এলাকার একজনের। যেটি পরীক্ষা করা হয় ঢাকার আইইডিসিআর থেকে। খুলনায় করোনায় আক্রান্ত হয়ে প্রথম মৃত্যু হয় জেলার রূপসা উপজেলার রাজাপুর এলাকার এক ব্যক্তির। যাকে হাসপাতালে আনার পথেই জেলখানা ঘাটের ওপারে মৃত্যু হয়। পরে তার নমুনা পরীক্ষার পর করোনা শনাক্ত হয়।
বাগেরহাটে নতুন করে করোনা শনাক্ত হয় ১৩৫ জনের। এ নিয়ে জেলায় মোট করোনা শনাক্ত হয়েছে চার হাজার ৪০৯ জনের। আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন ৯৮ জন এবং সুস্থ হয়েছেন তিন হাজার ৩৭ জন।
সাতক্ষীরায় বিগত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে শনাক্ত হয় ১৩৬ জনের। এ নিয়ে ওই জেলায় মোট করোনা শনাক্ত হয়েছে চার হাজার ১৮৬ জনের এবং মারা গেছেন ৭৬ জন। সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন দু’হাজার ৯৬৮ জন।
গত ২৪ ঘণ্টায় যশোরে নতুন করে শনাক্ত হয় ৩৮৮ জনের। এ নিয়ে জেলায় মোট করোনা শনাক্ত হয় ১৪ হাজার ৯১৩ জনের। মোট মারা গেছেন ২০২ জন এবং সুস্থ হয়েছেন নয় হাজার ৯৫ জন।
২৪ ঘণ্টায় নড়াইলে নতুন করে শনাক্ত হয় ৬১ জনের। এ নিয়ে জেলায় মোট করোনা শনাক্ত হয়েছে ৩ হাজার ৩১১ জনের। মোট মারা গেছেন ৫৮ জন এবং সুস্থ হয়েছেন ২ হাজার ৩২৬ জন।
মাগুরায় ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে ৫৭ জনের করোনা শনাক্ত হয়েছে। এ জেলায় মোট করোনা শনাক্ত হয়েছে এক হাজার ৯৭৯ জনের। মোট মারা গেছেন ৩৫ জন এবং সুস্থ হয়েছেন এক হাজার ৩৪৯ জন।
ঝিনাইদহে ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে শনাক্ত হয়েছে ১৬২ জনের। এ নিয়ে জেলায় মোট করোনা শনাক্ত হয়েছে পাঁচ হাজার ৪৮২ জনের। মোট মারা গেছেন ১২৮ জন এবং সুস্থ হয়েছেন তিন হাজার ৩৬৮ জন।
২৪ ঘণ্টায় কুষ্টিয়ায় নতুন করে শনাক্ত হয়েছে ২২০ জনের। এ নিয়ে জেলায় মোট করোনা শনাক্ত হয় নয় হাজার ৮৮৩ জনের। মোট মারা গেছেন ৩১০ জন এবং সুস্থ হয়েছেন ছয় হাজার ৩৬৭ জন।
চুয়াডাঙ্গায় ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে শনাক্ত হয়েছে ১৩৩ জনের। এ নিয়ে জেলায় মোট করোনা শনাক্ত হয় চার হাজার ৩৯৯ জনের। মোট মারা গেছেন ১১৫ জন এবং সুস্থ হয়েছেন দু’হাজার ৩৯২ জন।
মেহেরপুরে নতুন করে শনাক্ত হয়েছে ৬৮ জন। এ নিয়ে জেলায় মোট শনাক্ত হয়েছে দু’হাজার ৪৩১ জন। আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন ৭৩ জন এবং সুস্থ হয়েছেন এক হাজার ৫৬৪ জন।
চার হাসপাতালে মৃত্যু ২৪ জন ঃ গতকাল সকাল পর্যন্ত খুলনার সরকারি-বেসরকারি চারটি হাসপাতালে সর্বমোট ২৪ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে একজনের মৃত্যু হয় খুমেক হাসপাতালের জরুরি বিভাগে। বাকী ২৩জনের মৃত্যু হয় করোনা ইউনিটে।
খুমেক হাসপাতালের করোনা ইউনিটের মুখপাত্র ডা: সুহাস রঞ্জন হালদার বলেন, গতকাল সকাল সোয়া ছয়টা পর্যন্ত বিগত ২৪ ঘন্টায় সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় সাতজনের মৃত্যু হয়। এরা হলেন, রূপসার বাবুল মোল্লা(৫০), যশোরের জুলেখা(৫৭), খুলনার হোসনেয়ারা(৫৫), সোনাডাঙ্গার আবুল কালাম আজাদ(৪৬), বাগেরহাটের মুমুদ মন্ডল(৭৮), নড়াইলের পুষ্প রানী(৬৫) ও নগরীর দৌলতপুরের রোকেয়া(৬০)।
এছাড়া রাত ২টায় খুমেক হাসপাতালের জরুরি বিভাগে মৃত্যু হয় সাংবাদিক মোস্তফা কামালের। করোনা শনাক্ত হওয়ার একদিন পর বৃহস্পতিবার দিবাগত রাতে তাকে খালিশপুরের বাসা থেকে প্রথমে গাজী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে এবং পরে খুমেক হাসপাতালের জরুরি বিভাগে নেয়া হলে কর্মরত চিকিৎসক তাকে মৃত বলে ঘোষণা করেন।
খুলনা জেনারেল হাসপাতালের মুখপাত্র ডা: কাজী আবু রাশেদ বলেন, বিগত ২৪ ঘন্টায় ওই হাসপাতালে পাঁচজনের মৃত্যু হয়েছে। এরা হলেন, নগরীর বানিয়াখামারের মমতাজ(৩৫), রূপসার মোজাফফর শেখ(৬০), নগরীর মিয়াপাড়ার শামীম আরা(৬০), রূপসার হানিফ মোড়ল(৬৫) ও নড়াইলের রমেসা(৭৫)।
শহীদ শেখ আবু নাসের বিশেষায়িত হাসপাতালের করোনা ইউনিটে গত ২৪ ঘন্টায় একজনের মৃত্যু হয়েছে। তার নাম ইউনুস আলী(৭০) এবং তিনি বাগেরহাটের মোড়েলগঞ্জের খেজুরবুনিয়ার বাসিন্দা।
বেসরকারি প্রতিষ্ঠান গাজী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে বিগত ২৪ ঘন্টায় নয় জনের মৃত্যু হয়েছে বলে সেখানকার ব্যবস্থাপনা পরিচালক ডা: গাজী মিজানুর রহমান জানিয়েছেন। এরা হলেন, ডুমুরিয়ার বিষ্ণু মন্ডল, যশোরের অভয়নগরের কুলসুম বেগম(৭০) ও ফাতেমা(৭৫), ঝিকরগাছার আনওয়ারা(৪৫), রূপসার মর্জিনা বেগম(৬৫), দিঘলিয়ার আব্দুল হাকিম(৪৫), ডুমুরিয়ার আবেদা(৬৫), খুলনা সদরের রুবিনা(৫০), খালিশপুরের সেলিম শিকদার(৫৮) এবং সোনাডাঙ্গার মোস্তফা(৪০)।
খুলনা মেডিকেলে শনাক্তের হার ৫৪ শতাংশ ঃ খুলনা মেডিকেল কলেজের আরটি পিসিআর ল্যাবে গতকাল শুক্রবার শনাক্তের হার ছিল ৫৪ শতাংশ। খুমেক’র উপাধ্যক্ষ ডা: মো: মেহেদী নেওয়াজ বলেন, গতকাল এ ল্যাবে মোট ১৮৮টি নমুনা পরীক্ষার পর ১০২ জনের শনাক্ত হয়। এর মধ্যে খুলনার ৯৫জন, বাগেরহাটের তিনজন, সাতক্ষীরার একজন, নড়াইলের একজন এবং গোপালগঞ্জের দু’জন রয়েছেন।