গোপনে প্রাইভেট হাসপাতালে চিকিৎসা
দিয়ে গলাকাটা অর্থ নেয়ার অভিযোগ

এইচ এম আলাউদ্দিন ঃ কমে আসছে করোনা রোগীর সংখ্যা। খুলনার সরকারি-বেসরকারি পাঁচটি হাসপাতালে ৫৬২টি বেডের বিপরীতে গতকাল রোববার সকাল পর্যন্ত রোগী ছিলেন ৩৩০জন। অর্থাৎ পাঁচ হাসপাতালে সীট ফাঁকা ছিল ২৩২টি। এর মধ্যে সরকারি তিনটি হাসপাতালে ৩২৫টি বেডের বিপরীতে রোগী ছিলেন ১৮৬জন। অর্থাৎ তিনটি সরকারি হাসপাতালেও ১৩৯টি বেড ফাঁকা ছিল।
এদিকে, করোনা রোগীর সংখ্যা কমলেও থেমে নেই কিছু প্রাইভেট হাসপাতালের বাণিজ্য। অনুমোদন না থাকলেও কোন কোন বেসরকারি হাসপাতালে করোনা আক্রান্ত ও করোনা সন্দেহের রোগী ভর্তি করে নেয়া হচ্ছে গলাকাটা অর্থ। যদিও খুলনায় সরকারিভাবে মাত্র দু’টি হাসপাতালে করোনা রোগী ভর্তির সরকারি অনুমোদন আছে। এর একটি গাজী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল অপরটি সিটি মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল। বাকী যেসব প্রতিষ্ঠানে করোনার রোগী ভর্তি করা হবে সেগুলোর কোন হিসাব সরকারি দপ্তরে জমা হবে না। যেটি করোনা রোগীর হিসাব নিয়ে পরে জটিলতা সৃষ্টি করতে পারে বলেও খুলনার সিভিল জানিয়েছেন। এছাড়া অনুমোদনহীন হাসপাতালে করোনা রোগী ভর্তি করা হলে করোনার জীবাণু ছড়িয়ে পড়ারও আশংকা রয়েছে।
খুলনার সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালগুলো থেকে দেয়া তথ্য অনুযায়ী গতকাল সকাল পর্যন্ত খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের করোনা ইউনিটে ২শ’ বেডের বিপরীতে ১১০জন, খুলনা জেনারেল হাসপাতালে ৮০টি বেডের বিপরীতে ৩৫জন এবং শহীদ শেখ আবু নাসের বিশেষায়িত হাসপাতালে ৪৫টি বেডের বিপরীতে ৪১জন রোগী ভর্তি ছিলেন। গতকাল সকাল পর্যন্ত বিগত ২৪ ঘন্টায় ওই তিনটি হাসপাতালে মৃত্যু হয় আটজনের।
এছাড়া বেসরকারি প্রতিষ্ঠান নগরীর গাজী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ১৫০টি বেডের বিপরীতে গতকাল সকাল পর্যন্ত রোগী ভর্তি ছিলেন ৭৬জন এবং সিটি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ৮৭টি বেডের বিপরীতে ৬৮জন রোগী ছিলেন।
ওই হাসপাতালের মধ্যে শুধুমাত্র গাজী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে গতকাল সকাল পর্যন্ত তিনজনের মৃত্যু হয় বলে জানানো হলেও সিটি মেডিকেলে কোন মৃত্যু হয়নি বলে সেখানকার ম্যানেজার এডমিন ও এইচআর মে: হামিদুল ইসলাম খান জানিয়েছেন।
এর আগে এ বছরের প্রথম দিকে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মাত্র ৭০টি বেড নিয়ে করোনা ইউনিটের যাত্রা হয়েছিল। পরে বেড বাড়িয়ে করা হয় একশ’। এরপর ১৩০ ও ১৫০ সর্বশেষ ২শ’ বেড নিয়ে চলছে হাসপাতালটি। এছাড়া খুমেক হাসপাতালে রোগীর স্থান দিতে না পারায় গত ২০ জুন ৭০ বেড নিয়ে যাত্রা হয় খুলনা জেনারেল হাসপাতালের করোনা ইউনিট। ২৫০ বেডের ওই হাসপাতালের সব ভর্তি রোগীদের ছাড়পত্র দিয়ে শুধুমাত্র করোনা রোগীদের ভর্তি উপযোগী করা হয়। কয়েকদিন পর অবশ্য করোনার বেড বাড়িয়ে করা হয় ৮০টি। সেই থেকে এভাবেই চলে আসছে। কিন্তু রোগীর সংখ্যা থাকছে অনেক কম। চলতি মাসের বিগত ২৫ দিনের হিসাবে দেখা যায় খুলনা জেনারেল হাসপাতালে গড়ে প্রতিদিন ৬২জন রোগী ভর্তি ছিলেন। এর মধ্যে প্রথম ১৫ দিন প্রতিদিন গড় রোগীর সংখ্যা ছিল ৭৩জন এবং পরের ১০ দিন সংখ্যা আরও কমে এসে দাঁড়ায় ৪৮ জনে। আর গত দু’দিন এ সংখ্যা আরও নেমে এসে ৩৪ বা ৩৫জনে দাঁড়িয়েছে।
এ ব্যাপারে অবশ্য হাসপাতালটি শুরুর সময় খুলনার সিভিল সার্জন ডা: নিয়াজ মোহাম্মদ বলেছিলেন, যেহেতু সাময়িক সময়ের জন্য এটিকে কোভিড হাসপাতাল করা হয়েছে সেহেতু রোগীর সংখ্যা কমলে বিশেষ করে ভর্তি রোগীর সংখ্যা ২০ জনের নিচে নেমে আসলেই করোনা রোগী ভর্তি করা বন্ধ করে দিয়ে আগের ন্যায় সাধারণ রোগীদের চিকিৎসা দেয়া হবে।
অবশ্য খুলনা জেনারেল হাসপাতালে করোনা রোগীদের চিকিৎসা দিতে গিয়ে একদিকে যেমন ভর্তি দেড় শতাধিক রোগীকে সেবা বঞ্চিত করা হয়েছে তেমনি প্রতিদিন বহি:বিভাগেও কমপক্ষে পাঁচ শতাধিক রোগীর সেবা বঞ্চিত হচ্ছে। কিন্তু করোনা রোগীর চাপ যে হারে বেড়ে যাচ্ছিল এর কোন বিকল্পও ছিল না বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। সরকারি হাসপাতালে বেড সংখ্যা বাড়ানোর পাশাপাশি বেসরকারি হাসপাতালগুলিতেও করোনা ইউনিট খোলার ওপর জোর দিয়েছিল করোনা বিষয়ক কমিটি। যে কারণে গত ১৭ জুলাই থেকে খুলনা সিটি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ৮৭ বেডের করোনা ইউনিট খোলা হয় এবং খুমেক হাসপাতালের করোনা ইউনিটে আরও ৫০টি বেড বাড়িয়ে মোট ২শ’ বেড করা হয়।
এভাবে সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে নানা উদ্যোগ থাকার পরও থেমে নেই কিছু বেসরকারি হাসপাতাল। এখনও কোন কোন প্রাইভেট হাসপাতালে গোপনে রোগী ভর্তি করে নেয়া হচ্ছে মোটা অংকের অর্থ। অনেক প্রাইভেট হাসপাতালে স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলোর পক্ষ থেকে রোগীদের অক্সিজেন সেবা দেয়া হলেও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ আবারো রোগীর কাছ থেকে অক্সিজেনের বিল নিচ্ছে এমন অভিযোগও রয়েছে। আর প্রতি ঘন্টায় অক্সিজেনের বিল নেয়া হয় কমপক্ষে পাঁচ থেকে ছয়শ’ টাকা। সম্প্রতি খুমেক হাসপাতালের সামনের একটি বেসরকারি হাসপাতালে করোনা সন্দেহের এক রোগীকে ভর্তি করে চিকিৎসা দেয়া হলেও তাকে অক্সিজেন সাপোর্ট দেয় একটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন। কিন্তু ১২দিনে তার বিল করা হয় এক লাখ ১২ হাজার টাকা। এর আগেও নগরীর কেডিএ এভিনিউর একটি বেসরকারি হাসপাতালে দু’জন করোনা পজিটিভ রোগী ভর্তি করে চিকিৎসা দেয়ার তিনদিন পর বিল করা হয় প্রায় ৬০ হাজার টাকা। এভাবেই একদিকে মানুষ করোনায় আক্রান্ত হচ্ছে অপরদিকে এক শ্রেণির অর্থলোভী হাতিয়ে নিচ্ছেন মোটা অংকের অর্থ।
এ ব্যাপারে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের করোনা প্রতিরোধ ও চিকিৎসা বিষয়ক কমিটির সমন্বয়কারী এবং খুলনা বিএমএ’র সাধারণ সম্পাদক ডা: মো: মেহেদী নেওয়াজ বলেন, অনুমোদন ছাড়া করোনা রোগী ভর্তি করা ও চিকিৎসা দেয়া একটি অপরাধমূলক কাজ। সরকারের অনুমোদন ছাড়া এটি করা যাবে না। খুলনার বেসরকারি হাসপাতালের মধ্যে গাজী মেডিকেল ও সিটি মেডিকেলের অনুমোদন আছে। আদ দ্বীন আকিজ মেডিকেল আবেদন করেছে, হয়তো করোনার প্রকোপ না কমলে সেটিকেও অনুমোদন দেয়া হবে। এর বাইরে যারা করোনা রোগী ভর্তি করছে তারা ঠিক করছে না। বরং এতে আরও করোনা ছড়িয়ে পড়তে পারে। তারা যতটা না সেবা দিচ্ছে তার চেয়ে বেশি ছড়াচ্ছে। কেননা তাদের প্রশিক্ষিত জনবল নেই সুযোগ সুবিধাও নেই। বিষয়টি তদন্ত করে এ সপ্তাহের মধ্যেই ব্যবস্থা নেয়া উচিত বলে তিনি সিভিল সার্জন ও স্বাস্থ্য পরিচালক দপ্তরের প্রতি আহবান জানান।
খুলনার বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক ডা: জসিম উদ্দিন হাওলাদার বলেন, অনুমোদনবিহীন কোন প্রাইভেট হাসপাতাল করোনার রোগীদের চিকিৎসা দিলে তাদের বিরুদ্ধে অবশ্যই ব্যবস্থা নেয়া হবে। কেননা করোনা রোগীদের সেবার জন্য একটি কমিটি আছে। কমিটির মাধ্যমেই সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করা হয়। কিন্তু এ ধরনের যত্রতত্র চিকিৎসা দেয়া হলে সেটি বিশৃংখল পরিবেশ সৃষ্টি করবে। এ ব্যাপারে অবশ্যই ব্যবস্থা নেয়া হবে বলেও তিনি জানান।