ওজোপাডিকোতে নতুন নিয়ম

এইচ এম আলাউদ্দিন ঃ প্রধান কর্তা থেকে শুরু করে মালি পর্যন্ত অন্যান্য কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য একটি নির্দিষ্ট বেতন কাঠামো থাকলেও পদ্মার এপারের একুশ জেলা নিয়ে গঠিত ওয়েষ্ট জোন পাওয়ার ডিষ্ট্রিবিউশন কোম্পানীর গাড়ি চালকদের জন্য নেই কোন বেতন কাঠামো। সংশ্লিষ্ট দপ্তর প্রধানের নামেই অগ্রীম প্রদান করা হয় গাড়ী চালকদের মজুরী। সাম্প্রতিক দু’টি দপ্তরাদেশ থেকে এমন চিত্রই ফুটে উঠেছে। এটিকে অনেকে মধ্যযুগীয় তথাকথি ‘দাস’ প্রথা বলেও উল্লেখ করেছেন।
তবে ওজোপাডিকোর বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক(ভারপ্রাপ্ত) বলছেন, আগে গাড়ি চালকদের দিয়ে কাজ করানো হলেও পয়সা দেয়া হতো না। কিন্তু এখন একটি শৃংখলার মধ্যে এনে বিশেষ করে ‘তেলচুরি’র হাত থেকে কোম্পানীকে রক্ষা করা হয়েছে।
এদিকে, বিগত প্রায় আড়াই মাস হতে চললেও ওজোপাডিকোর ব্যবস্থাপনা পরিচালক পদের নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়নি। যে কারণে বর্তমান ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালকের আস্থাভাজন নন এমন কর্মকর্তাদেরও বিভিন্ন স্থানে বদলী করা হচ্ছে বলেও অভিযোগও উঠেছে। সব মিলিয়ে দ্রুত এমডি নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে ওজোপাডিকোকে জনগনের প্রতিষ্ঠানে পরিণত করারও দাবি উঠেছে খুলনার নাগরিকদের পক্ষ থেকে।
ওজোপাডিকোর উপ-মহাব্যবস্থাপক (এইচআর এন্ড এডমিন) মো: আলমগীর কবীর স্বাক্ষরিত সাম্প্রতিক দু’টি দপ্তরাদেশে দেখা যায়, একটিতে ১৪টি এবং অপরটিতে ৩৫টি দপ্তরে সংশ্লিষ্ট দপ্তর প্রধানকে অগ্রীম গ্রহণের শর্তে গাড়ী চালনার কাজ করার অনুমতি দেয়া হয়েছে। দপ্তরাদেশে বলা হয়, ওজোপাডিকোতে নতুনভাবে গাড়ীচালক নিয়োগপ্রাপ্ত না হওয়া পর্যন্ত এক একটি দপ্তরে একজন করে গাড়ীচালকের শূণ্য পদের বিপরীতে একজন গাড়ীচালকের কাজ করার জন্য অগ্রিম প্রদানের অনুমতি দেয়া হলো। দপ্তরগুলো হচ্ছে, বিদ্যুৎ বিতরণ ব্যবস্থা সম্প্রসারণ ও আপগ্রেডেশন প্রকল্প, একই প্রকল্পের ঝিনাদহের বিভাগ-২, ফরিদপুরের বিভাগ-৩ ও বরিশালের বিভাগ-৪, স্মার্ট প্রি-পেমেন্ট মিটারিং প্রকল্প, একই প্রকল্পের বিতরণ বিভাগ-১, বিতরণ বিভাগ-২, বিতরণ বিভাগ-৩ ও বিতরণ বিভাগ-৪, বিদ্যুৎ বিতরণ ব্যবস্থার সম্প্রসারণ ও পরিবর্ধন প্রকল্প এবং একই প্রকল্পের খুলনা, ঝিনাইদহ, ফরিদপুর ও বরিশাল এই চারটি বিভাগ।
এছাড়া অপর একটি দপ্তরাদেশে খুলনাসহ ওজোপাডিকোর বিভিন্ন এলাকার ৩৫টি দপ্তরে ৩৫ জন গাড়ীচালককে দিয়ে গাড়ি চালানোর জন্য সংশ্লিষ্ট দপ্তর প্রধানের নামে একই নিয়মে কাজের অনুমতি দেয়া হয়। এগুলোর মধ্যে খুলনা সদর দপ্তরে মোট সাতজন, ওজোপাডিকো ট্রেনিং ইনস্টিটিউট, খুলনা পরিচালন ও সংরক্ষণ সার্কেল, মোংলা বিদ্যুৎ সরবরাহ, মাদারীপুর বিক্রয় ও বিতরণ বিভাগ, রাজবাড়ী বিদ্যুৎ সরবরাহ, শরিয়তপুর বিদ্যুৎ সরবরাহ, গোপালগঞ্জ বিদ্যুৎ সরবরাহ, ফরিদপুরের আঞ্চলিক হিসাব দপ্তর(আহিদ), ভাঙ্গা বিদ্যুৎ সরবরাহ, গোয়ালন্দ বিদ্যুৎ সরবরাহ, পাংশা বিদ্যুৎ সরবরাহ, কুষ্টিয়ার পরিচালন ও সংরক্ষণ সার্কেল, মাধুখালী বিদ্যুৎ সরবরাহ, সদরপুর বিদ্যুৎ সরবরাহ, কুষ্টিয়ার বিক্রয় ও বিতরণ বিভাগ-১, ঝিনাইদহের বিক্রয় ও বিতরণ বিভাগ, চুয়াডাঙ্গার বিক্রয় ও বিতরণ বিভাগ, মেহেরপুর বিদ্যুৎ সরবরাহ, শৈলকুপা বিদ্যুৎ সরবরাহ, বরিালের বিক্রয় ও বিতরণ বিভাগ-১, নলসিটি বিদ্যুৎ সরবরাহ, কাঠালিয়া বিদ্যুৎ সরবরাহ, পটুয়াখালী পরিচালন ও সংক্ষণ সার্কেল, বোরহান উদ্দিন বিদ্যুৎ সরবরাহ এবং আলমডাঙ্গা বিদ্যুৎ সবরাহে একজন করে গাড়ীচালককে দিয়ে কাজ করানোর অনুমতি দেয়া হয়েছে। ওই আদেশেও সংশ্লিষ্ট দপ্তর প্রধানদের নামে টাকা যাবে এবং তাদেরকে নিজেদেরকে কোন গাড়ীচালককে রাখা হবে কি না সেই একক ক্ষমতা দেয়া হয়েছে।
ওই দপ্তরাদেশের শর্তাবলীর ‘ঘ’ ধারায় বলা হয়েছে, দৈনিক মজুরি ভিত্তিতে বিল প্রদান করতে হবে, কোন অবস্থাতেই কাউকে নিয়োগ প্রদান করা যাবে না। এছাড়া ‘ঙ’ ধারায় বলা হয়েছে, তাকে কোন প্রকার নিয়োগপত্র বা দাপ্তরিক চিঠি প্রদান করা যাবে না। আবার ‘’ ধারায় বলা হয়েছে গাড়ী না থাকা অবস্থায় এ অনুমোদনের ভিত্তিতে অর্থ গ্রহণ অথবা ব্যয় নির্বাহ করা যাবে না। এমন কিছু শর্ত জুড়ে দিয়ে গাড়ীচালকদের দিয়ে কাজ করানোর ফলে তাদের যেমন চাকরীর নিশ্চয়তা নেই তেমনি তাদের ভবিষ্যৎ অন্ধকার বলেও অনেকে মন্তব্য করেন।
খুলনার বিক্রয় ও বিতরণ বিভাগ-৪এ কর্মরত এমন একজন গাড়ীচালক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, যেভাবে তাদেরকে দিয়ে গাড়ি চালানো হচ্ছে এটি কোন নিয়মের মধ্যে পড়ে না। অনেকটা বাড়ির কাজের লোকের মতো তাদেরকে রাখা হয়েছে। আজ ভালো লাগছেতো রাখা হচ্ছে, ভালো না লাগলে বলা হবে কাল থেকে আর আসার দরকার নেই। অর্থাৎ চাকরীর যেমন কোন নিশ্চয়তা নেই নেই কোন স্বীকৃতিও। তার পরেও যেহেতু তারা দীর্ঘদিন ধরে ওজোপাডিকোর সাথে আছেন সে কারণে লেগে আছেন যদি কখনও চাকরী স্থায়ী হয় এই ভরসায়।
অপর এক ভুক্তভোগী গাড়ীচালক বলেন, এতে সংশিষ্ট দপ্তর প্রধানরা নিজেদের ক্ষমতার অপব্যবহার করতে পারেন বলে আশংকা করা হচ্ছে। সেই সাথে আজ একজনকে রাখা হলেও কাল আর একজনকে যেমন রাখা হতে পারে তেমনি অনেক দপ্তর প্রধান গাড়ীচালকদের মজুরীও কম দিতে পারেন। যদিও তাদের জন্য প্রতিদিন ৬শ’ টাকা করে বরাদ্দ রাখা হয়েছে।
বর্তমান ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক রতন কুমার দেবনাথ এ ব্যাপারে বলেন, প্রতিটি দপ্তরেই গাড়ীচালকের নাম লেখা থাকবে, তাদের হাজিরা খাতা থাকবে এবং কত টাকা মজুরী দেয়া হচ্ছে সেটিও লিপিবদ্ধ থাকবে। সুতরাং এমন কোন আশংকা নেই।
ওজোপাডিকোর একজন কর্মচারী বলেন, বর্তমানে ওজোপাডিকোতে অনেকটা আক্রোশমূলক কর্মকান্ড চলছে। যারা আগের এমডির আস্থাভাজন হিসেবে চিহ্নিত ছিলেন তাদেরকে বদলী করা হয়েছে। কিন্তু অনেকের ধারণা ছিল দীর্ঘদিনের অনিয়ম-দুর্নীতি দূর করে ওজোপাডিকোকে একটি স্বচ্ছ ও জবাবদিহির জায়গায় নেয়া হবে। তার কিছুই হয়নি। বরং বিদায়ী ববস্থাপনা পরিচালকের গাড়ীচালককে খুলনার বিক্রয় ও বিতরণ বিভাগ-৩এ বদলী করে তাকে দিয়ে এখন অফিসের অভিযোগ গ্রহণকারী হিসেবে কাজ করানো হচ্ছে। এভাবে অনেকটা হ-য-ব-র-ল অবস্থা চলছে ওজোপাডিকোতে। এ অবস্থার অবসান না হলে গ্রাহকসেবা বিঘিœত হতে পারে বলেও ওই কর্মচারীর আশংকা।
ওজোপাডিকোর উপ-মহাব্যবস্থাপক (এইচআর এন্ড এডমিন) মো: আলমগীর কবীর বলেন, বোর্ড যেভাবে অনুমোদন দিয়েছে সেভাবেই গাড়ীচালকদের দিয়ে কাজ করানো হচ্ছে। এখানে গাড়ীচালকদের আরও মূল্যায়ন করা হয়েছে। মজুরী নিশ্চিত করা হয়েছে।
ভারপ্রাপ্ত পরিচালক রতন কুমার দেবনাথ বলেন, ওজোপাডিকোর বিভিন্ন দপ্তরে গাড়ীচালকদের অভাব ছিল। আবার অনেক জায়গায় দেখা যেতো তারা কাজ করতো, কিন্তু পয়সা পেতো না। যে কারণে তেল বিক্রি করে তারা কোম্পানীর ক্ষতি করতো। এজন্য বেতন দিয়ে রাখার অনুমতি দেয়া হয়েছে। তবে কাকে নেয়া হবে সেটি সংশ্লিষ্ট দপ্তর প্রধানের বিষয়। প্রতিদিন ৬শ’ টাকা করে সংশ্লিষ্ট দপ্তর প্রধানকে দেয়া হচ্ছে ত’ দিয়ে তিনি যাকে ইচ্ছা চালক হিসেবে রাখতে পারবেন।
অপরদিকে, কথিত ‘দাস’ প্রথা থেকে ফিরে এসে ওজোপাডিকোকে জনবান্ধব প্রতিষ্ঠানে পরিণত করার আহবান জানিয়েছেন খুলনার নাগরিক নেতৃবৃন্দ।
খুলনা নাগরিক সমাজের সদস্য সচিব এড. মো: বাবুল হাওলাদার বলেন, যারা কর্মকর্তাদের বহন করে কাজের সুবিধা করে দিচ্ছে সেইসব চালকদের এভাবে অবমূল্যায়ন করা ¯্রফে একটি ছেলেখেলা। এটি অমানবিক ও মধ্যযুগীয় বর্বরতার শামিল বলেও তিনি উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, মধ্যযুগেও দাসদের খেতে, পরতে, থাকতে দেয়া হতো। কিন্তু ওজোপাডিকোর এসব গাড়ীচালকদের বেলায় কিছুই নেই। দৈনিক মজুরি ভিত্তিতে জোন খাটানো যায়, কিন্তু গাড়ীচালকদের রাখা যায় না বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
বৃহত্তর খুলনা উন্নয়ন সংগ্রাম সমন্বয় কমিটির সভাপতি শেখ আশরাফ উজ জামান বলেন, গরীবের পেটে লাথি মারার অধিকার কারও নেই। তাছাড়া চলতি দায়িত্বে থেকে একজন কর্মকর্তা বদলী, নিয়োগের মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজ করতে পারেন না। তার কাজ হবে শুধুমাত্র রুটিন কাজগুলো করা। ভারপ্রাপ্ত হিসেবে দায়িত্বে থাকা অবস্থায় এ ধরনের কাজ চাকরীবিধি লংঘন বলেও তিনি উল্লেখ করেন।