# জার্মান সরকারের আর্থিক সহায়তা
# প্রকল্পের মেয়াদ ২০২৭ সাল পর্যন্ত
# পানি সমস্যা সমাধানে এ উদ্যোগ

এইচ এম আলাউদ্দিন ঃ বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ এবং ভূগর্ভের পানি পুন:ভরণ নিশ্চিত করাসহ নগরবাসীর পানি সমাস্যার সমাধানে জার্মান সরকারের সহযোগিতায় খুলনা সিটি কর্পোরেশনের নেওয়া পুকুর সংরক্ষণ কর্মসূচির প্রস্তাবটি প্রায় চূড়ান্ত পর্যায়ে। ওই প্রস্তাবটি উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব(ডিপিপি) আকারে এক সপ্তাহের মধ্যেই ঢাকায় পাঠানো হবে বলে কেসিসির প্রধান পরিকল্পনা কর্মকর্তা আবির-উল-জব্বার জানিয়েছেন। প্রায় পাঁচশ’ কোটি টাকার ওই প্রকল্পের আওতায় নগরীর ১৪টি ওয়ার্ডের ২৩টি পুকুর সংরক্ষণ ছাড়াও কয়েকটি খাল ও ড্রেন উন্নয়নের পরিকল্পনা রয়েছে। এজন্য পুকুরগুলোর তালিকাও ইতোমধ্যে চূড়ান্ত হয়েছে। তবে প্রাথমিক পর্যায়ে ৩২টি পুকুরের তালিকা করা হলেও খুলনা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ বা কেডিএ, বিভাগীয় গণগ্রন্থাগারসহ কয়েকটি সরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে অনাপত্তিপত্র না পাওয়ায় তালিকা থেকে নয়টি পুকুর বাদ দিয়ে ২৩টি রাখা হয়েছে। এছাড়া চূড়ান্ত পর্যায়ে করা ২৩টি পুকুরের মধ্যেও জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকেও পাঁচটি পুকুরের অনাপত্তিপত্র(এনওসি) দেওয়া হয়নি বলে জানিয়েছেন কেসিসির ওই কর্মকর্তা। জার্মান ও বাংলাদেশ সরকারের যৌথ অর্থায়নে গৃহীত এ প্রকল্পটি চলবে ২০২৭ সাল পর্যন্ত।
কেসিসির সূত্রটি বলছে, প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হলে পুকুরের আশপাশের জনসাধারণের ভূ-গর্ভের পানি সমস্যা কিছুটা হলেও দূর হবে বলে আশা করা যাচ্ছে। বিশেষ করে প্রতি বছর জানুয়ারি থেকে মে-জুন মাস পর্যন্ত ভূ-গর্ভের পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ার যে প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে তা’ থেকে নগরবাসি হয়তো কিছুটা মুক্তি পাবে।
কেসিসির প্রধান পরিকল্পনা কর্মকর্তা জানান, নগরীর ওই ২৩টি পুকুর সংরক্ষণ পরিকল্পনায় রয়েছে পুকুরের চারপাশে রিটার্নিং ওয়াল ও ঘাট নির্মাণ, চারপাশে ওয়াকওয়ে করা ও বসার জায়গা তৈরি করা। সর্বোপরি পুকুরগুলোর চারপাশে গাছপালা রোপনের মধ্যদিয়ে দৃষ্টিনন্দন করা হবে। পুকুরগুলোতে প্রতি বছর বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ করার পাশাপাশি শুকনো মৌসুমে যাতে পানি নষ্ট না হয় সেজন্য পানি পরিবর্তনও করার ব্যবস্থা থাকবে। সেইসাথে নগরবাসী এসব পুকুরে তাদের সন্তানদের সাঁতার শেখাতে পারবে।
জার্মান সরকারের সহযোগিতা নিয়ে যে ২৩টি পুকুর সংরক্ষণের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে সেগুলো হচ্ছে কেসিসির তিন নম্বর ওয়ার্ডের মহেশ^রপাশা কবরখানা পুকুর, নয় নম্বর ওয়ার্ডের বাস্তুহারা পার্ক পুকুর ও বাস্তুহারা কলোনাী পুকুর, ছয় নম্বর ওয়ার্ডের বিএল কলেজ পুকুর, ১০ ও ১২ নম্বর ওয়ার্ডের মুজগুন্নি ১৮ নম্বর রোডের তারের পুকুর ও ওয়ান্ডার ল্যান্ড পার্ক পুকুর, ১২ নম্বর ওয়ার্ডের তিন নম্বর ক্যাম্প পুকুর, সাত নম্বর ক্যাম্প পুকুর ও খালিশপুর হাউজিং বাজার পুকুর, ১৩ নম্বর ওয়ার্ডের খালিশপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয়(চরের হাট) পুকুর, ১৬ নম্বর ওয়ার্ডের পিজিএম কলোনী পুকুর, ১৭ নম্বর ওয়ার্ডের হরিজন কলোনী পুকুর, সোলার পার্ক পুকুর, মহেশ ট্যাংক পুকুর ও বয়রা হাই স্কুল পুকুর, ১৮ নম্বর ওয়ার্ডের সোনাডাঙ্গা বাস ষ্ট্যান্ড পুকুর ও তা’লীমুল মিল্লাত রহমাতিয়া ফাজিল(ডিগ্রী) মাদ্রাসা পুকুর, ২৫ নম্বর ওয়ার্ডের বানরগাতী বটতলা মন্দির পুকুর ও লায়ন্স স্কুল এন্ড কলেজ পুকুর, ২৯ নম্বর ওয়ার্ডের মিউনিসিপ্যাল ট্যাংক রোড পুকুর ও খুলনা আলিয়া কামিল মাদ্রাসা পুকুর, ৩০ নম্বর ওয়ার্ডের তালতলা হাসপাতাল পুকুর এবং ৩১ নম্বর হাজী মালেক জান্নাতুল বাকি কবরখানা পুকুর।
অবশ্য ২৩টি পুকুর সংরক্ষণ ছাড়াও দৌলতপুরে শহর রক্ষা বাঁধ, মহেশ^রপাশা শ্মশান বাঁধ, রূপসা রিভার ফ্রন্ট পার্ক সংরক্ষণ, নবীনগর ড্রেন নির্মাণ, সোনাডাঙ্গা মজিদ সরনির ড্রেন উন্নয়ন, এম এ বারী সড়ক ড্রেন উন্নয়ন, সোনাডাঙ্গা বাইপাস ড্রেন উন্নয়ন, বাস্তুহারা খাল সংস্কার, বাস্তুহারা ড্রেন উন্নয়ন, দেয়ানা চৌধুরী খাল উন্নয়ন, লবনচরা স্লুইস গেট উন্নয়ন, আলুতলা স্লুইস গেট উন্নয়ন এবং নিরালা খাল সংস্কারের কার্যক্রমও এ প্রকল্পের মধ্যে রয়েছে। সব মিলিয়ে ৪৯৬ কোটি ৭১ লাখ টাকার এ প্রকল্পটি চলমান থাকবে ২০২৭ সাল পর্যন্ত।
যদিও জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের পাঁচটি খালের অনাপত্তিপত্র(এনওসি) এখনও পাওয়া যায়নি বলে কেসিসির প্রধান পরিকল্পনা কর্মকর্তা জানিয়েছেন। তার পরেও আর এক সপ্তাহের মধ্যে তাদের প্রস্তাবটি ডিপিপি আকারে মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে। আশা করা হচ্ছে, এর মধ্যেই এনওসি পাওয়া যাবে। তবে ২৩টি পুকুরের মধ্যে কেসিসির মালিকানাধীনই রয়েছে ১১টি। বাকীগুলোর মধ্যে কয়েকটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পুকুর ছাড়া ব্যক্তি মালিকানাধীন কোন পুকুর নেওয়া হয়নি।
তবে ব্যক্তি মালিকানাধীন পুকুর নিতে হলে অধিগ্রহণ করতে হবে উল্লেখ করে কেসিসির সূত্রটি বলছে, এজন্য সরকারের অর্থায়নে পৃথক একটি প্রকল্প প্রস্তাব দেয়া হয়েছিল। আড়াই হাজার কোটি টাকার ওই প্রকল্পের উদ্যোগ নেয়া হলেও সেটি বাস্তবায়নের শেষ পর্যায়ে গিয়ে বাঁধাপ্রাপ্ত হয়। বিশেষ করে ওই প্রকল্পটি যখন স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় অনুমোদন দিয়ে মন্ত্রীর কাছে পৌঁছে তখন আরও এক হাজার কোটি টাকা কমিয়ে অর্থাৎ দেড় হাজার কোটি টাকার মধ্যে প্রকল্পটির প্রস্তাব দেয়ার জন্য বলা হয়। যেটি নিয়ে গত সোমবার কেসিসির মেয়র আলহাজ¦ তালুকদার আব্দুল খালেকের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত বৈঠকে বিস্তারিত আলোচনা হয়। অর্থাৎ এখন আবার নতুন করে প্রস্তাবনা পাঠাতে আরও সময়ের প্রয়োজন হবে।
খুলনা নাগরিক ফোরামের সদস্য সচিব এড. সেলিনা আক্তার পিয়া বলেন, খুলনা সিটি কর্পোরেশনের এ প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হলে নগরবাসীর পানি সমস্যা কিছুটা হলেও দূর হবে। তবে এটি দ্রুত বাস্তবায়ন জরুরি বলেও তিনি মনে করেন। বিশেষ করে যেসব সরকারি প্রতিষ্ঠানের সাথে কেসিসির সমন্বয়হীনতা রয়েছে তা’ দূর করে বৃহত্তর স্বার্থে এ প্রকল্প বাস্তবায়ন করা জরুরি বলেও তিনি মনে করেন।
বৃহত্তর খুলনা উন্নয়ন সংগ্রাম সমন্বয় কমিটির সভাপতি শেখ আশরাফ উজ জামান বলেন, নগরবাসীর পানি সমস্যা সমাধানে কেসিসির এমন উদ্যোগ সাধুবাদ পাওয়ার যোগ্য। তবে যেসব সরকারি প্রতিষ্ঠান এখনও এ উদ্যোগে সাড়া দেয়নি তাদের উচিত সকল প্রকার আমলাতান্ত্রিক জটিলতা দূর করে এ ধরনের ভালো উদ্যোগের সাথে সামিল হওয়া। যেসব প্রতিষ্ঠান এখনও এনওসি দেয়নি তাদেরও উচিত এনওসি দিয়ে নগরবাসির পানি সমস্যা সমাধানে এগিয়ে আসা। সেই সাথে ভূ-গর্ভের পানি পুন:ভরণের জন্য যেসব বাধা আছে সেগুলো দূর করতেও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে উদ্যোগী হওয়া উচিত বলেও তিনি মনে করেন।