সংকটময় পরিস্থিতির মধ্যেই খুলনা বিভাগীয়
পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিচালকের যোগদান

এইচ এম আলাউদ্দিন ঃ অনুমোদিত পদের সংখ্যা যেখানে ৫৮টি সেখানে কর্মরত আছেন মাত্র ২১জন। অর্থাৎ ৫৮টির মধ্যে ৩৭টি পদই শূন্য। ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার জন্য নেই নির্বাহী ম্যাজিষ্ট্রেটও। হিসাব রক্ষণ কর্মকর্তার পদটিও শূন্য। জুনিয়র কেমিষ্টের তিনটি পদের মধ্যে সবগুলোই শূন্য। শূন্য রয়েছে পরিদর্শক, সিনিয়র টেকনিশিয়ান, ড্রাফটসম্যান, সাঁটলিপিকার, উচ্চমান সহকারী, অফিস সহকারীও। এমনকি পরিচালকের জন্যও কোন অফিস সহকারী নেই। এ চিত্র পরিবেশ অধিদপ্তরের খুলনা বিভাগীয় কার্যালয়ের।
আর এমন এক সংকটময় পরিস্থিতির মধ্যদিয়েই এ অফিসের পরিচালক হিসেবে যোগদান করলেন খুলনা জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের স্থানীয় সরকার বিভাগের সদ্য বিদায়ী উপ-পরিচালক মো: ইকবাল হোসেন। অবশ্য তিনিও পরিবেশ অধিদপ্তরের এ কার্যালয়ে এক সময় নির্বাহী ম্যাজিষ্ট্রেট হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এখন নতুন করে অফিস প্রধান হিসেবে যোগদান করে কিভাবে সাজাবেন এ অফিসকে জানতে চাইলে মো: ইকবাল হোসেন বলেন, জনবল সংকট দূর করার ব্যাপারে তিনি যেমন চেষ্টা করবেন তেমনি সকল স্টেক হোল্ডারকে ডেকে বৈঠক করে পরিবেশ রক্ষায় সকলের সহযোগিতা চাইবেন। এরপরও কেউ না শুনলে নির্বাহী ম্যাজিষ্ট্রেটের পদটি পূরণ করার মধ্যদিয়ে ভ্রাম্যমান আদালত পরিচালনার মাধ্যমে সকল ক্ষেত্রে পরিবেশ আইন বাস্তবায়ন করা হবে।
এদিকে, বিগত এক মাসেরও অধিক সময় ধরে পরিবেশ অধিদপ্তরের খুলনা বিভাগীয় কার্যালয়ে তথ্য অধিকার আইনে আবেদন করে শুধুমাত্র ইটভাটা আর জনবল বিষয়ক তথ্য ছাড়া আর কিছুই পাওয়া যায়নি। বিভাগের ইটভাটার যে তথ্য দেয়া হয়েছে তাতেও দেখা যায়, এক হাজার ৫৫টি ইটভাটার মধ্যে বর্তমান আইন অনুযায়ী ৭৮১টি অবৈধ। শুধুমাত্র ২৭৪টি ইটভাটা চলছে বৈধ লাইসেন্স নিয়ে।
অবৈধ ইটভাটা সম্পর্কে পরিবেশ অধিদপ্তরের সদ্য যোগদানকারী পরিচালক মো: ইকবাল হোসেন বলেন, যেহেতু ইটভাটার সাথে উন্নয়ন সম্পর্কযুক্ত সে কারণে অনেক সময় আইন থাকলেও বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয় না। তবে আগে যেসব ইটভাটার লাইসেন্স দেয়া হয়েছিল বর্তমান আইন অনুযায়ী সেগুলো এখন আর নবায়ন করা হচ্ছে না। এজন্য মানুষের মধ্যে আগে সচেতনতা বাড়িয়ে তারপর পর্যায়ক্রমে অবৈধ ইটভাটার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে। বিশেষ করে সরকারি সকল কাজে যাতে ইটের পরিবর্তে ব্লকের ব্যবহার নিশ্চিত করা হয় সেজন্য যেমন জেলা প্রশাসকদের সাথে বৈঠক করে সরকারি দপ্তরগুলোকে বিষয়টি জানানো হবে তেমনি সাধারণ মানুষও যাতে ইটের পরিবর্তে ব্লকের ব্যবহার করতে উদ্বুদ্ধ হয় সেজন্য তাদের মধ্যে সচেতনতা বাড়ানোর চেষ্টা করা হবে।
ইটভাটার কারণে পরিবেশের ওপর ব্যাপক প্রভাব পড়ে উল্লেখ করে পরিবেশ অধিদপ্তরের খুলনা বিভাগীয় কার্যালয়ের উপ-পরিচালক(মনি এন্ড এন) ও তথ্য প্রদানকারী কর্মকর্তা মো: এমদাদুল হক বলেন, তাদের দীর্ঘদিনের পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, একটি ইটভাটায় এক মৌসুমে ১০ লাখ ঘনফুট মাটির প্রয়োজন হয় আর কয়লা পোড়ানো হয় কমপক্ষে এক হাজার মেট্টিক টন। অর্থাৎ একটি ইটভাটায় প্রতি মৌসুমে অন্তত তিন দশমিক ৩৩ একর তথা ১০ বিঘা জমির মাটি লাগে। মাটি আর কয়লা পোড়ানোর ফলে বাতাশ দূষিত হয়। যেটি মানুষের শ^াসকষ্ট, ফুসফুসে সমস্যা, কাশিসহ নানা প্রকার জটিল রোগের সৃষ্টি করে। এজন্য তিনিও ইটের পরিবর্তে ব্লকের ব্যবহার নিশ্চিত করার আহবান জানান।
বিভাগীয় পরিবেশ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী খুলনা জেলায় ১৪৬টি ইটভাটার মধ্যে ৪৬টি অবৈধ, বাগেরহাটের ৩৩টির মধ্যে দু’টি, ঝিনাইদহের ৯৯টির মধ্যে ৮৯টি, যশোরের ১৭৮টির মধ্যে ১২৬টি, কুষ্টিয়ার ১৮৬টির মধ্যে ১৫৪টি, মাগুরার ৯৬টির মধ্যে ৮৮টি, নড়াইলের ৬৬টির মধ্যে ৬১টি এবং সাতক্ষীরার ১০২টির মধ্যে ৬৬টিই অবৈধ। এছাড়া চুয়াডাঙ্গার ৮৬টি এবং মেহেরপুরের ৬৩টি ইটভাটার মধ্যে সবগুলোই অবৈধ বলে দেখা যায় বিভাগীয় পরিবেশ অধিদপ্তরের তালিকায়।
ইটভাটার অবৈধ তালিকার বহর দীর্ঘ হলেও সে তুলনায় অভিযানের চিত্র খুব একটা লক্ষণীয় নয়। ২০১৯ সালের জানুয়ারি থেকে এ পর্যন্ত পরিবেশ অধিদপ্তরের বিভাগীয় কার্যালয়ের পক্ষ থেকে খুলনা জেলায় ১২টি অভিযান চালিয়ে ১১ লাখ টাকা জরিমানা আদায় করা হয়েছে বলে উপপরিচালক মো: এমদাদুল হক জানিয়েছেন। এছাড়া তার দেয়া তথ্য মতে, বাগেরহাটে বিগত তিন বছরে দু’টি, ঝিনাইদহে ৩৭টি, যশোরে ৫১টি, কুষ্টিয়ায় একটি, মাগুরায় প্রায় ৫০টি, নড়াইলে ৫১টি এবং সাতক্ষীরায় পাঁচটি অভিযানসহ কয়েকটি মামলা দায়ের করা হয়।
তবে গত ১৪ মার্চ ওই কার্যালয়ে তথ্য অধিকার আইনে তথ্য চেয়ে আবেদন করে ৭ এপ্রিল আংশিক তথ্য পাওয়া যায়। ওই দপ্তর থেকে জানানো হয়, তাদের কাছে নেই বৈধ ও অবৈধ গরুর খামার এবং পলিথিন কারখানার তালিকা। এছাড়া ২০০৯ সাল থেকে এ পর্যন্ত ওই দপ্তরে কত টাকা রাজস্ব আদায় হয়েছে সেটিও জানানো হয়নি। বরং বলা হয়, পরিবেশ অধিদপ্তর, ঢাকার অনুমতি ছাড়া রাজস্ব আয়ের হিসাব দেয়া সম্ভব নয়। এমনকি বৈধ ও অবৈধ গরুর খামারের তালিকা ও পলিথিন কারখানার তালিকা সংশ্লিষ্ট জেলা কার্যালয় থেকে নেয়ারও পরামর্শ দেয়া হয়। যার আলোকে গত ৬ এপ্রিল পরিবেশ অধিদপ্তরের খুলনা জেলা কার্যালয়ে আবেদন করা হলেও এ পর্যন্ত দেয়া হয়নি কোন তথ্য।