বিইআরসির সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন নেই
মুদি দোকানেও বিক্রি হচ্ছে গ্যাস

এইচ এম আলাউদ্দিন ঃ লিকুফাইড পেট্রোলিয়াম গ্যাস বা এলপিজি’র খুচরা পর্যায়ে মূল্য নির্ধারণ করে দিয়েছে বাংলাদেশ এনার্জি লেগুরেটরী কমিশন(বিইআরসি)। বেসসরকারি পর্যায়ের প্রতিটি এলপিজি সিলিন্ডারের মূল্য নির্ধারিত হয়েছে ৯০৬ টাকা। কিন্তু ওই সিদ্ধান্তকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে বেসরকারি গ্যাস কোম্পানীগুলো ইচ্ছামত দাম নিচ্ছে। খুলনার বাজারে প্রতিটি সিলিন্ডার বিক্রি হচ্ছে ৯৪০ থেকে ৯৮০ টাকা পর্যন্ত। বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন বা বিপিসি চাহিদা অনুযায়ী গ্যাসের সরবরাহ না করতে পারায় বেসরকারি গ্যাস কোম্পানীগুলোর সিন্ডিকেটের কারণে গ্যাসের বাজার নিয়ন্ত্রণের বাইরে বলেও উল্লেখ করছেন কেউ কেউ। এক কথায় খুলনাঞ্চলের গ্যাসের বাজার এখন বেসরকারি কোম্পানীগুলোর নিয়ন্ত্রণে। দ্রব্যমূল্যের উর্দ্ধগতি আর করোনা মহামারী-লকডাউনের কারণে মানুষের যখন অর্থনৈতিক দুরবস্থা চলছে ঠিক তখনই অতি প্রয়োজনীয় জ্বালানী গ্যাসের দাম যেন নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে। তবে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ কমিটি বলছে, গ্রাহকদের পক্ষ থেকে অভিযোগ পেলেই অভিযান চালানো হবে।
এদিকে, আইনের ফাঁক ফোঁকরের কারণে বিষ্ফোরকের লাইসেন্সবিহীন দোকানেও অহরহ গ্যাস বিক্রি হচ্ছে। অর্থাৎ অনভিজ্ঞ দোকানীরা গ্যাস বিক্রির ফলে সিলিন্ডারের ওয়াসার লিক হয়ে অনেক সময় আগুন দুর্ঘটনার শিকার হচ্ছেন অনেকে। সম্প্রতি নগরীর কেডিএ এভিনিউ-এর একটি বাসায় গ্যাস সিলিন্ডার দুর্ঘটনায় এক নারীর মৃত্যু হয়েছে। এর আগে নগরীর নিরালা, সোনাডাঙ্গা, হাফিজ নগর, শেখপাড়ায় গ্যাস সিলিন্ডার দুর্ঘটনায় অনেকের মৃত্যু ও অঙ্গহানি হয়।
গত মাসের(এপ্রিল) শেষে বিইআরসি গ্যাসের নতুন মূল্য নির্ধারণ করে অনলাইনে সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে ঘোষণা দেয়। নতুন মূল্য অনুযায়ী ১২ কেজি ওজনের প্রতিটি সিলিন্ডারের দাম নির্ধারিত হয় ৯০৬ টাকা। চলতি মে মাসে এ মূল্য কার্যকর হওয়ার কথা থাকলেও খুলনার বাজার নিয়ন্ত্রণ করছে বেসরকারি কোম্পানীগুলোর সিন্ডিকেট। বিশেষ করে বিপিসির গ্যাসের সরবরাহ কম থাকায় বেসরকারি কোম্পানীগুলোর প্রতিটি সিলিন্ডার বেশি দামে কিনতে বাধ্য হচ্ছেন গ্রাহকরা।
জাতীয় সম্পদ রক্ষা আন্দোলনের অন্যতম সংগঠক, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংগ্রাম কমিটির আহ্বায়ক, ৯০-এর গন অভ্যূত্থানের অন্যতম ছাত্রনেতা, এক সময়ের খুলনার রাজপথের পরিচিত মুখ সরদার রুহিন হোসেন প্রিন্স বলেন, বাস্তব কারনে আজ অনেক ঘরে সিলিন্ডার গ্যাস অনিবার্য হয়ে উঠেছে। করোনাকালে, সাধারণ মানুষ এমনিতেই বিপর্যস্ত। এ অবস্থায় গ্যাসের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখাটা অত্যন্ত জরুরি। কিন্তু বিইআরসি’র সে সিদ্ধান্ত মাঠ পর্যায়ে বাস্তবায়ন না হওয়া অত্যন্ত দু:খজনক। তিনি নির্ধারিত মূল্যে গ্যাস বিক্রি নিশ্চিত করার জন্য সংশ্লিষ্টদের প্রতি আহবান জানান। একইসাথে তিনি সরকারি গ্যাস সিলিন্ডারের উৎপাদন বাড়ানোর ওপরও জোর দেন। পাশাপাশি দেশের স্থল ও সমুদ্র ভাগের গ্যাস আনুসন্ধানে অবহেলা না করে দ্রুত গ্যাস ক্ষেত্র অনুসন্ধান ও উত্তোলনে ব্যবস্থা নেয়ার দাবি জানান।
তবে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক শিকদার শাহীনুর আলম বলেন, গ্রাহকদের পক্ষ থেকে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পেলেই অভিযান চালিয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে। তাছাড়া লাইসেন্সবিহীন দোকানে গ্যাস বিক্রি সম্পর্কে তিনি বলেন, এ ক্ষেত্রে এক শ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী আইনের ফাঁক ফোঁকর দিয়ে বেরিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। যেহেতু সর্বোচ্চ আটটি গ্যাস সিলিন্ডার বিনা লাইসেন্সেও রাখার সুযোগ রয়েছে সেহেতু কিছু দোকানে আটটির কম সিলিন্ডার রেখে এ অবৈধ ব্যবসা করে যাচ্ছেন। এটিকে তিনি নৈতিকতা বিরোধী কাজ বলেও উল্লেখ করেন।
বিষ্ফোরক অধিদপ্তরের সূত্র মতে, কোন দোকানে গ্যাস বিক্রি করতে হলে তাকে ট্রেড লাইসেন্স ও ফায়ার সার্ভিসের লাইসেন্সসহ বিষ্ফোরক অধিদপ্তরের লাইসেন্স নিতে হবে। এজন্য দোকানও হতে হবে গ্যাস সিলিন্ডার রাখার জন্য উপযুক্ত মানের। কিন্তু বেসরকারি গ্যাস কোম্পানীগুলোর পরিবেশকদের কাছ থেকে নিয়ে মুদি দোকান, পান সিগারেটের দোকান, তুষকাঠের দোকান, ওষুধের দোকান এমনকি লন্ড্রির দোকানেও গ্যাস বিক্রি হচ্ছে।
এ প্রসঙ্গে ব্যবসায়ীদের একটি সূত্র বলছে, কোম্পানীর পরিবেশকরা তাদের ওপর অর্পিত কোটা পূরণ করতেই লাইসেন্সবিহীন দোকানে গ্যাস বিক্রি করছেন। অথচ বিষ্ফোরকের লাইসেন্সধারী দোকান তথা ডিলারদের কাছেই তাদের গ্যাস বিক্রির কথা।
খুলনা এল,পি গ্যাস ব্যবসায়ী মালিক সমিতির সভাপতি শেখ মো: তোবারেক হোসেন তপু বলেন, লাইসেন্সবিহীন দোকানের তালিকা করে খুলনার জনপ্রতিনিধি, সিভিল প্রশাসন ও পুলিশ প্রশাসনের কাছে অভিযোগ দেয়া হয়েছে। কিন্তু ঝুঁকিপূর্ণভাবেই অহরহ গ্যাস বিক্রি হচ্ছে লাইসেন্সবিহীন দোকানগুলোতে। যেটি নিয়ন্ত্রণের জন্য সরকরারের বিভিন্ন সংস্থা রয়েছে। গ্যাসের মূল্য সম্পর্কে তিনি বলেন, এজন্য বিপিসির গ্যাস সরবরাহ না থাকাই দায়ী। বিপিসির যে হারে গ্যাস সরবরাহ হয় তার সিংহভাগই চলে যায় শসস্ত্র বাহিনী ও বিভিন্ন সরকারি দপ্তরে। যা বাকী থাকে তা ব্যবসয়ীদের মাধ্যমে গ্রাহকদের কাছে যায় খুবই কম।
এটি অবশ্য শিকারও করেন মেঘনা পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশনের এজিএম এসএম আব্দুল্লাহ। তিনি বলেন, বিপিসি থেকে যে গ্যাস সরবরাহ করা হয় তার সিংহভাগই দিতে হয় সশস্ত্র বাহিনী ও ভিআইপিদের। এরপর খুব অল্পকিছু দেয়া সম্ভব হয় ডিলারদের। সে ক্ষেত্রে প্রতি ৩/৪ মাস পর হয়তো কোন কোন ডিলারকে মাত্র ২০টি করে সিলিন্ডার দেয়া সম্ভব হয়। বিপিসির প্রতি সিলিন্ডার গ্যাসের মূল্য ৫৭৫ টাকা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ব্যবসায়ীরা হয়তো বাজারে ওই গ্যাস সাড়ে ছয়শ’ টাকায় বিক্রি করতে পারেন। অর্থাৎ বিপিসির গ্যাস বাজারে বেশি সরবরাহ করা গেলে বেসরকারি কোম্পানীগুলোর গ্যাস উচ্চমূল্য দিয়ে কেনার প্রয়োজন হতো না। তবে পদ্মা সেতু হলে খুলনাঞ্চলে বিপিসির গ্যাসের যোগান বেশি দেয়া সম্ভব হবে বলেও তিনি জানান।
অপরদিকে, দীর্ঘদিনেও সিলিন্ডার পরিবর্তন না করায় জরাজীর্ণ সিলিন্ডারে বিক্রি হচ্ছে বিপিসির গ্যাস। দূর থেকে দেখলেই বোঝা যাবে কোনটি বিপিসির এলপিজি সিলিন্ডার। এজন্য গ্যাসের যোগানের পাশাপাশি গ্রাহকদের পক্ষ থেকে বিপিসির সিলিন্ডার উৎপাদন বা আমদানীর ওপরও জোর দেয়া হয়েছে। এ প্রসঙ্গে পদ্মা, মেঘনা ও যমুনা কোম্পানীর একটি সূত্র বলছে, বাংলাদেশ পেট্রেিিলয়াম কর্পোরেশন এশবার ৫০ হাজার সিলিন্ডার বাজারে ছাড়ে। কিন্তু বাজার থেকে সেগুলো কিনে নিয়ে বেসরাকরি কোম্পানীগুলো গলাকেটে রং করে সিলিন্ডারগুলো পরিবর্তন করে ফেলে। এরপর থেকে আর বিপিসি সিলিন্ডার বাজারে ছাড়ছে না। যদিও এ প্রসঙ্গে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন ব্যবসায়ী বলেন, যখন সিলিন্ডারের দাম বেশি ছিল তখন এমনটি হলেও এখন আর তেমনটি হওয়ার সুযোগ নেই। কেননা এখন বিপিসির চেয়ে বেসরকারি কোম্পানীগুলোর সিলিন্ডারের দাম আরও কম।