# খুলনা বিএমএ সভাপতি ডা: শেখ বাহারুল আলম
# গৌরবের পদ্মা সেতু, আর বাকি ২১ দিন

এইচ এম আলাউদ্দিন ঃ স্বপ্নের পদ্মা সেতুর উদ্বোধনের মাহেন্দ্রক্ষণকে সামনে রেখে দৈনিক পূর্বাঞ্চলকে দেয়া একান্ত সাক্ষাতকারে বাংলাদেশ মেডিকেল এসোসিয়েশন-বিএমএ খুলনা শাখার সভাপতি ও কেন্দ্রীয় সহ-সভাপতি ডা: শেখ বাহারুল আলম বলেছেন, পদ্মা সেতুর মধ্যদিয়ে দেশবাসীর বিশেষ করে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মানুষের যে স্বপ্ন বাস্তবায়িত হতে চলেছে টোল প্রথার কারণে সেটি যেন দু:স্বপ্নে পরিণত না হয়। একইসাথে তিনি এ সেতু দিয়ে মূমূর্ষু রোগী বহনকারী তথা এ্যাম্বুলেন্সের জন্য টোল ফ্রি এবং এজন্য পৃথক এক্সপ্রেস লাইন করারও দাবি জানান। তিনি বলেন, যেসব রোগী খুলনা থেকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় নিতে হয় তাদেরকে আগে ঘন্টার পর ঘন্টা বসে থাকতে হতো। অনেক সময় অপেক্ষার প্রহর গুণতে গুণতে রোগীর মৃত্যুও হতো। কিন্তু স্বপ্নের পদ্মাসেতু নির্মাণের পরও শুধুমাত্র টোল প্রথার কারণে এবং এক্সপ্রেস লাইন না থাকায় এ্যাম্বুলেন্সগুলোকে যানজটে পড়তে হলে সেটিও হবে স্বপ্নের পদ্মাসেতুর জন্য একটি দু:স্বপ্ন। সুতরাং এ ব্যাপারে তিনি প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করেন।
পদ্মাসেতু সম্পর্কে ডা: শেখ বাহারুল আলম বলেন, দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মানুষের রাজধানীর সাথে যোগাযোগের জন্য একটি স্বাপ্নিক বিষয় হচ্ছে পদ্মাসেতু। তিনি রাষ্ট্রের তথা রাষ্ট্রের নির্বাহী প্রধান হিসেবে প্রধানমন্ত্রীর এ অবদানকে অভিনন্দন জানান। সেই সাথে প্রান্তিক মানুষের কথা বিবেচনা করে এর টোল নির্ধারণ করা উচিত বলেও মনে করেন। তা না হলে বিত্তবানদের দৌরাত্ম বাড়বে বলেও তিনি আশংকা করেন।
পদ্মা সেতু নিয়ে দেশী-বিদেশী ষড়যন্ত্রের কথা উল্লেখ করে ডা: শেখ বাহারুল আলম বলেন, শুরুতে এর অর্থায়নের কথা ছিল বিশ^্যাংকের। কিন্তু বিশ^ব্যাংকের আধিপত্যের স্তর এমন পর্যায়ে গেলো যে, রাষ্ট্রের স্বাধীনতা সার্বভৌমত্ব প্রশ্নের মুখে পড়ে। শেষ পর্যন্ত বিশ^ব্যাংক অর্থায়ন থেকে সরে যাওয়ার পরও এটি বাস্তবায়ন করায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এখানে সত্যিই প্রশংসিত হয়েছেন। যদিও পদ্মাসেতু নির্মাণে ব্যয় অনেকটা বেড়েছে। এদিকেও প্রধানমন্ত্রীর নজর দেয়া উচিত ছিল বলে তিনি মনে করেন। সুতরাং বিশ^ব্যাংককে চ্যালেঞ্জ করে পদ্মাসেতু নির্মাণ যেমন মানুষকে দারুণভাবে উজ্জীবিত করেছে তেমনি এর ব্যয়ও মানুষকে শংকার মধ্যে ফেলেছে। তবে বিশ^ব্যাংককে চ্যালেঞ্জ করে এ সেতু নির্মাণ অবশ্যই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দৃঢ়চেতা মনোভাবের বহি:প্রকাশ। যেটি প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্ব, কতৃত্ব ও সাহসের পরিচয় দিয়েছে।
পদ্মা সেতু যাতায়াতের ক্ষেত্রে অবশ্যই এ অঞ্চলের মানুষের প্রত্যাশা পূরণে যথেষ্ঠ ভূমিকা রাখবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, জীবনের তাগিদে, প্রয়োজনের তাগিদে, রাষ্ট্রীয় তথা প্রশাসনিক কাজে, ব্যবসা-বাণিজ্যের কাজে, শিক্ষার কাজে বা যে কোন কারণেই হোক যাদের রাজধানীতে যেতে হবে তাদের জন্য যথেষ্ঠ ভূমিকা রাখবে। কেননা এখন পর্যন্ত পদ্মা পাড়ি দিতে যে ধরনের বিড়ম্বনার শিকার হতে হচ্ছে তা থেকে মুক্ত হওয়া যাবে। বিশেষ করে স্পীডবোটের সিন্ডিকেট থেকেও রক্ষা পাওয়া যাবে।
পদ্মা সেতু নির্মাণ যেমন প্রধানমন্ত্রীর কৃতিত্বের ব্যাপার তেমনি কিছু মেগা প্রকল্পের ঋণ পরিশোধের ক্ষেত্রেও আগামী দিনে যাতে চ্যালেঞ্জের মুখে না পড়তে হয় সেদিকেও নজর দেয়া উচিত বলে তিনি মনে করেন। কেননা ইতোমধ্যে অর্থনীতিবিদ আবুল বারাকাত এমন আশংকা করেছেন যে, ২০৩০ সালের পর যে ঋণের চাপ আসবে সেটি যেন সাধারণ মানুষের জন্য বোঝা না হয়ে যায়। এক কথায় কোন উন্নয়ন যেন মানুষের বোঝা না হয় বা রাষ্ট্রকে দেউলিয়া করে না তোলে সেদিকে নজর রাখা উচিত বলেও তিনি মনে করেন।
তবে যেহেতু প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিচক্ষণ, সেহেতু তিনি এসব বিষয় বিবেচনা করবেন বলেও তিনি আশা করছেন। একইসাথে বর্তমানে যারা রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে আছেন তাদের কাছে যেমন এমন প্রত্যাশা তেমনি আগামীতে যারা রাষ্ট্র পরিচালনা করবেন তাদেরকেও এসব বিষয় মাথায় রেখে পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে বলেও তিনি মনে করেন।
পদ্মা সেতু চালু হলে মংলা ও পায়রা বন্দর এবং বেনাপোল ও ভোমরা বন্দরের কার্যক্রম আরও গতিশীল হবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এসব বন্দর যেহেতু আমদানী নির্ভর সেহেতু ভারতের সাথে আমাদের যে বাণিজ্য ঘাটতি রয়েছে সেটি কাটিয়ে ওঠায়ও সহায়ক হবে। তবে এসব বন্দর যেন ভারতের জন্য ট্রানজিট হিসেবে ব্যবহার হলেও সেজন্য যথাযথ প্রাপ্য বাংলাদেশ পায় সেদিকেও নজর রাখার দাবি জানান এই চিকিৎসক নেতা।
এদিকে, পদ্মা সেতুর পাশাপাশি খুলনাঞ্চলের অন্যান্য অবকাঠামোগত উন্নয়ন বিশেষ করে পাঁচ তারকা হোটেলসহ আবাসন ব্যবস্থার উন্নয়ন, ফয়লার বিমান বন্দরের কার্যক্রম জোরদার করে বিদেশী বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করা, সুন্দরবন কেন্দ্রিক পর্যটন শিল্পকে এগিয়ে নেয়া, বন্ধ শিল্প প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা, সড়কগুলো সম্প্রসারণ করার পরিকল্পনা গ্রহণেরও আহবান জানান তিনি।
সর্বোপরি প্রধানমন্ত্রী দেশী-বিদেশী সকল ষড়যন্ত্রকে উপেক্ষা করে শেষ পর্যন্ত যে পদ্মা সেতুর মত একটি বৃহৎ সেতু নির্মাণ করতে পেরেছেন সেজন্য তিনি তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, বিগত ৫০ বছর ধরে আমাদের দেশ অর্থনীতি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য তথা সকল ক্ষেত্রেই আধিপত্ত বলয়ের মধ্যদিয়ে প্রবর্তিত হচ্ছে। যে আধিপত্তবাদ থেকে রক্ষা পায়নি স্বপ্নের পদ্মাসেতুও। কিন্তু সেটিও শেষ পর্যন্ত প্রত্যাখ্যান করা সম্ভব হয়েছে। সর্বশেষ পদ্মা সেতু নির্মাণের মধ্যদিয়ে রাজধানীর সাথে এ অঞ্চলের যোগাযোগের যে যোগসূত্র স্থাপন করে দিয়েছে সেটি পরাশক্তির ষড়যন্ত্র ম্লান করে দিয়েছে। সুতরাং রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় আসীনরা এবং বিরোধ শক্তি সকলকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে শক্তিশালী রাষ্ট্র গঠনের মাধ্যমে দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব রক্ষা করতে হবে বলেও তিনি মনে করেন। এ ধরনের প্রকল্প বাস্তবায়নে যেন আর কোন ষড়যন্ত্র না হয় সেদিকেও তিনি নজর দেয়ার আহবান জানান।