# অক্সিজেনের মজুদ ও বেড বাড়ানো হচ্ছে
# ‘রোগী বাড়লে হাসপাতালে জায়গা হবে না’

ঢাকা ব্যুরো থেকে ॥ করোনায় গত এক সপ্তাহে দেশে রোগী শনাক্ত ২৬.৬৭% ও মৃত্যু ৬.৯৬% বেড়েছে বলে গত জানিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। মানুষের স্বাস্থ্যবিধি না মানা, মাস্ক পরতে না চাওয়া ও সামাজিক দূরত্ব না মেনে বেপরোয়াভাবে ঘুরে বেড়ানোর কারণে সংক্রমণ আরো বাড়বে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক। পরিস্থিতি মোকাবেলায় হাসপাতালে বেড বাড়ানো হচ্ছে ও অক্সিজেন সংকট পূরণে সরকার কাজ করছে বলে জানান তিনি। গত শনিবার কোভিড-১৯ সংক্রমণের ঊর্ধ্বগতি প্রতিরোধ, অক্সিজেন সংকট, হাসপাতালের সুযোগ-সুবিধা ও শয্যা সংখ্যা বৃদ্ধি শীর্ষক এক মতবিনিময় সভায় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর সঙ্গে বাংলাদেশ প্রাইভেট মেডিকেল কলেজ এসোসিয়েশনের সদস্যভুক্ত প্রতিষ্ঠানের জুম মিটিংয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রী এসব কথা বলেন। স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, ‘স্বাস্থ্যবিধি না মেনে ঈদের সময় গরুর হাটে, মার্কেটে যাওয়া, গ্রামে যাওয়ার কারণে নিশ্চয়ই সংক্রমণ বেড়েছে, যার ফল আমরা আগামীতে দেখতে পারবো। ডেল্টা ভ্যারিয়েন্টের কারণে এবার সংক্রমণ বেশি। ডেল্টা ভ্যারিয়েন্ট ভারত থেকে এসেছে। ভারতেও গ্রামে সংক্রমণ ছড়িয়েছিলো। ভারতে সংক্রমণের হার কমে আসতে তিন মাস সময় লেগেছে। আমাদের দেশেও সংক্রমণ কমতে তিন মাস লাগবে বলে ধারণা করা হচ্ছে’।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক বলেন, ‘কোভিডের তৃতীয় ঢেউয়ে রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। সংক্রমণের হার ৬-৭ গুণ বেড়েছে। মৃত্যুর সংখ্যা দশগুণ বেড়েছে। এটা অ্যালার্মিং। বেড অকুপেন্সি ১০ গুণ বেড়েছে। কোভিড রোগীদের জন্য ঢাকা শহরে ৫০০০ সহ সারাদেশে ১৫০০০ বেড আছে। ঢাকা শহরে দিন দিন খালি বেড কমে যাচ্ছে। আইসিইউয়ের চাহিদাও অনেক বেশি’।
হাসপাতালে বেড কমে আসায় প্রাইভেট হাসপাতালগুলোকে আইসিইউ ও অন্যান্য বেড দুই হাজার বাড়ানোর অনুরোধ জানালে বাংলাদেশ প্রাইভেট মেডিকেল কলেজ এসোসিয়েশনের পক্ষে সভাপতি মুবিন খান স্বাস্থ্যমন্ত্রীকে অন্তত ২০০০ নতুন কোভিড ডেডিকেটেড বেড বৃদ্ধি করার আশ্বাস দেন। পরিস্থিতি মোকাবেলায় বিএসএমএমইউতে আরো এক হাজার বেড বাড়ানো হবে বলে জানান স্বাস্থ ্যমন্ত্রী। অনুষ্ঠানে বেসরকারি হাসপাতাল মালিকেরা অক্সিজেন সংকটের কথা জানান মন্ত্রীকে।
এ বিষয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক এবিএম খুরশিদ আলম বলেন, এখন থেকে প্রতি সপ্তাহে দুই দফায় ভারত থেকে ৪০০ টন অক্সিজেন আনা যাবে। এ হিসেবে মাসে ১৬০০ টন অক্সিজেন দেশে আসবে। তখন আর অক্সিজেনের সংকট থাকবে না।
এদিকে, দেশে সাধারণ সময়ে ৬০-৭০ টন অক্সিজেন প্রয়োজন। এখন ২৭০ টন অক্সিজেন প্রয়োজন হচ্ছে বলে জানান স্বাস্থ্যমন্ত্রী। ৪৩টি অক্সিজেন জেনারেটর অর্ডার করা হয়েছে। আগস্টের মধ্যে দেশের ৪০টি হাসপাতালে ৪০টি অক্সিজেন জেনারেটর বসবে। জাহিদ মালেক বলেন, ‘সরকারি হাসপাতালে যত রোগী ভর্তি হচ্ছে তার মধ্যে নন-ভ্যাকসিনেটেড রোগী ৯০%। এর মধ্যে ৭৫% গ্রামের। আমরা বয়স্ক লোকদের ভ্যাকসিন দিতে পারলে মৃত্যু কমবে’। গ্রামাঞ্চলে কোভিড রোগীদের শনাক্ত করার উদ্যোগ হিসেবে জেলা-উপজেলা থেকে ইউনিয়ন পর্যায়ে পর্যন্ত কমিটি গঠন করে দেয়া হয়েছে বলেও জানান স্বাস্থ্যমন্ত্রী। উপজেলা পর্যায়ে সেবা দিতে ৪ হাজার চিকিৎসক, ৪ হাজার নার্স, ৫০০ টেকনোলজিস্ট নিয়োগের কাজও এগিয়ে চলেছে বলে জানান স্বাস্থ্যমন্ত্রী।
এছাড়া স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, করোনাভাইরাস মহামারিতে সম্মুখযোদ্ধা হিসেবে দায়িত্ব পালনকারী চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মী, সেনাবাহিনী, পুলিশ ও শিক্ষক এদেরকে আগে টিকা দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। এছাড়া তাদের পরিবারের আঠারো বছরের ঊর্ধ্বে যেসব সদস্য আছে তাদেরও টিকাদান কার্যক্রমের আওতায় আনা হবে। জাহিদ মালেক বলেন, ‘অর্থাৎ ডাক্তার, নার্স এবং যারা সবসময় সংক্রমণের মধ্যে থাকে তাদের পরিবারের ১৮ বছরের ঊর্ধ্বে সদস্যদের টিকা দেওয়ার সিদ্ধান্ত দেওয়া হয়েছে। এ ব্যাপারে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে অনুমতি নিয়েছি আমরা। এখন থেকে এটা কার্যকর। সুরক্ষা অ্যাপে এটা দিয়ে দিচ্ছি, সেই অনুযায়ী কাজ হবে।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক দেশবাসীকে সরকারঘোষিত লকডাউন মেনে চলার অনুরোধ জানিয়ে বলেছেন, আমরা চাই রোগীর সংখ্যা যেন না বাড়ে, রোগীর সংখ্যা কমাতে হলে সংক্রমণের সংখ্যা কমাতে হবে। সংক্রমণ কমাতে হলে সরকার যে লকডাউন ঘোষণা করেছে, লকডাউন মেনে চলার জন্য প্রধানমন্ত্রী যে আহ্বান জানিয়েছেন তা মেনে চলতে হবে। তিনি বলেন, সংক্রমণ দশ জায়গা থেকে বাড়ছে, হাসপাতালে রোগীর চাপ বাড়ছে। এভাবে সংক্রমণ অব্যাহত থাকলে হাসপাতালে জায়গা হবে না। গতকাল রোববার বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) বঙ্গমাতা ফজিলাতুননেছা মুজিব কনভেনশন সেন্টারে করোনা ফিল্ড হাসপাতাল তৈরির কাজের অগ্রগতি পরিদর্শন শেষে গণমাধ্যমকর্মীদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এসব কথা বলেন।
জাহিদ মালেক বলেন, করোনা সংক্রমণ অব্যাহত থাকলে বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো দেশের অর্থনীতিতে বিরূপ প্রভাব পড়বে, যা আমরা চাই না। এজন্য স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার বিকল্প নেই। তিনি বলেন, বর্তমানে ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়ছে। একদিকে করোনা ও নন-করোনা রোগীর চিকিৎসা অন্যদিকে ডেঙ্গুর প্রকোপ বৃদ্ধিতে চিকিৎসার প্রয়োজন হচ্ছে।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, ডেঙ্গু রোগীর চিকিৎসার জন্য পৃথক কয়েকটি হাসপাতাল প্রস্তুত করা হচ্ছে। এর মধ্যে স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ (মিটফোর্ড) হাসপাতাল, মিরপুরের লালকুঠি হাসপাতাল, সরকারি রেলওয়ে হাসপাতাল এবং টঙ্গীর আহসানউল্লাহ হাসপাতালসহ কয়েকটি হাসপাতালে শুধু ডেঙ্গুর চিকিৎসা হবে বলে তিনি জানান। পরিদর্শনকালে বিএসএমএমইউ উপাচার্য অধ্যাপক ডা. শারফুদ্দিন আহমেদ এবং স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল বাশার মোহাম্মদ খুরশীদ আলম উপস্থিত ছিলেন।