খুলনা-৫ আসনের
সংসদ সদস্য

নারায়ণ চন্দ্র চন্দ

* গৌরবের পদ্মা সেতু, আর বাকী ৫ দিন

এইচ এম আলাউদ্দিন ঃ খুলনা-৫ আসনের সংসদ সদস্য নারায়ণ চন্দ্র চন্দ বলেছেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ইশতেহার অনুযায়ী ২০৪১ সালের মধ্যে দেশকে উন্নত রাষ্ট্রে পরিণত করা হবে। আর প্রধানমন্ত্রীর ওই ইশতেহার বাস্তবায়নে পদ্মা সেতু রাখবে বলিষ্ঠ ভূমিকা। পদ্মা সেতু এ অঞ্চলের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নেও রাখবে ভূমিকা। বাড়বে শিল্প প্রতিষ্ঠান, চাঙ্গা হবে মোংলাসহ অন্যান্য সমুদ্র ও স্থল বন্দরগুলো। এছাড়া পদ্মা সেতু খুলনাঞ্চলের শিক্ষা বিস্তারেও রাখবে ভূমিকা। দেশের অন্যান্য স্থান থেকে মেধাবী শিক্ষার্থীরা খুলনায় এসে উচ্চ শিক্ষার সুযোগ পাবে। সব মিলিয়ে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা বা এসডিসি বাস্তবায়নে পদ্মা সেতু রাখবে যথেষ্ঠ ভূমিকা।
স্বপ্নের, গৌরবের আর আত্ম মর্যাদার পদ্মা সেতু উদ্বোধনের আর বাকী পাঁচদিন। ২৫ জুন পর্দা উঠবে পদ্মা সেতুর। পদ্মা নদী পাড়ি দিতে আর সময়ের প্রয়োজন হবে না ঘন্টার পর ঘন্টা। মাত্র পাঁচ মিনিটেই পার হওয়া যাবে সাড়ে ছয় কিলোমিটারের এই পদ্মা নদী। এমন এক আনন্দঘন মুহূর্তে দেশের দক্ষিণাঞ্চলের একজন জনপ্রতিনিধি হিসেবে এবং সাবেক মন্ত্রী হিসেবে আপনার মূল্যায়নটা কেমন জানতে চাইলে নারায়ন চন্দ্র চন্দ বলেন, দক্ষিণাঞ্চল ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মানুষের স্বপ্ন ছিল এই পদ্মা সেতু। যেটি আগামী ২৫ জুন উদ্বোধন হতে যাচ্ছে। এই পদ্মা সেতু নির্মাণের জন্য এককভাবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনারই কৃতিত্ব। তার দৃঢ় প্রত্যয়েই আজ বাস্তবে রূপ নিয়েছে পদ্মা সেতু। এক কথায় প্রধানমন্ত্রীর উদ্যোগ এবং সর্বশেষ তিনিই এর বাস্তবায়ন করেছেন। এজন্য তিনি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ধন্যবাদ জানানোর পাশাপাশি তার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।
পদ্মা সেতুর আগের যাত্রী দুর্ভোগের কথা তুলে ধরে সাবেক এই মন্ত্রী বলেন, দীর্ঘদিন ধরে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মানুষের রাজধানী ঢাকা বা অন্য এলাকার সাথে যোগাযোগে যে প্রতিবন্ধকতা ছিল তা’ বলে শেষ করা যাবে না। ঘন্টার পর ঘন্টা এমনকি দিনের পর দিন ঘাটে অপেক্ষার প্রহর গুনতে হতো যাত্রীদের। অপেক্ষা করতে গিয়ে অনেক রোগীও মৃত্যুবরণ করেছে। মাছ ও কাঁচামাল পচে নষ্ট হয়েছে। এছাড়া ঘটেছে বিভিন্ন দুর্ঘটনা। স্পীডবোট বা লঞ্চ দুর্ঘটনার শিকার হয়েও অনেকে মারা গেছে। লঞ্চে উঠতে গিয়ে কেউ কেউ নিখোঁজ ও মৃত্যুবরণ করেছে। সবচেয়ে বড় ভোগান্তি হয় এদেশের মুসলিম সম্প্রদায়ের বড় দু’টি ঈদে ঘরমুখো মানুষের। নারী-শিশুদের নিয়ে অনেককেই দিনের পর দিন পদ্মা পাড়ি দিতে গিয়ে অপেক্ষায় থাকতে হয়েছে। যে দুর্ভোগের অবসান হবে পদ্মা সেতু উদ্বোধনের মধ্যদিয়ে।
পদ্মা সেতু হলে দেশের অর্থনীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন আসবে উল্লেখ করে নারায়ন চন্দ্র চন্দ বলেন, জিডিপিতে প্রবৃদ্ধির হার বাড়বে। কৃষিজাত পণ্য এ অঞ্চল থেকে রাজধানী ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেটসহ অন্যান্য অঞ্চলে পাঠানো যাবে কম সময়ের মধ্যে। অনেকে সবজি বিক্রি করে দিনে দিনে ফিরে আসতে পারবে খুলনায়। যেটি অর্থনীতিতে যোগ করবে নতুন মাত্রা।
পদ্মা সেতু এ অঞ্চলে কর্মসংস্থানের ব্যাপক সুযোগ সৃষ্টি করবে উল্লেখ করে খুলনা-৫ আসনের সংসদ সদস্য বলেন, নতুন নতুন শিল্প কল কারখানা যেমন তৈরি হবে তেমনি এসব শিল্প প্রতিষ্ঠানে ব্যাপক কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে। মোংলা ও পায়রা সমুদ্র বন্দরের গুরুত্বও বাড়বে পদ্মা সেতু চালু হলে। মংলা থেকে সরাসরি পণ্য সামগ্রী ঢাকায় নেয়া সম্ভব হলে চট্টগ্রামের চেয়ে সময় অনেক কম লাগবে। সে ক্ষেত্রে ব্যবসায়ীরা বিশেষ করে আমদানী-রপ্তানীকারকদের কাছে মোংলা ও পায়রা বন্দরের কদর বাড়বে। সেই সাথে বেনাপোল ও ভোমরা স্থল বন্দর থেকে আমদানীকৃত পণ্য সামগ্রীও ঢাকা ও অন্যান্য অঞ্চলে সরাসরি পরিবহনের সুযোগ সৃষ্টি হবে। সর্বোপরি কৃষি, শিল্প ও বাণিজ্যে ব্যাপক পরিবর্তন আসবে।
যাতায়াতের ক্ষেত্রে পদ্মা সেতু নতুন দিগন্তের উম্মোচন করবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এখন পর্যন্ত সাতক্ষীরা, পাইকগাছা ও কয়রার যানবাহন যশোর হয়ে আরিচা ঘাট পার হয়ে ঢাকায় যেতো। কিন্তু এখন আর তার প্রয়োজন হবে না। ডুমুরিয়ার ওপর দিয়ে খুলনার খানজাহান আলী(রহ:) রূপসা সেতু পার হয়ে গোপালগঞ্জের ওপর দিয়ে পদ্মা সেতু দিয়ে ঢাকায় যেতে পারবে কম সময়ে। এর ফলে ডুমুরিয়াসহ অনেক উপজেলা অর্থনৈতিকভাবে আরও সমৃদ্ধশালী হবে। পদ্মা সেতু চালু হওয়ার খবরে ইতোমধ্যেই ডুমুরিয়ায় অনেক পরিবহনের অফিস হয়েছে। অর্থাৎ পদ্মা সেতুর ফলে খুলনা, বাগেরহাট ও সাতক্ষীরার অর্থনৈতিক অবস্থার অনেক পরিবর্তন হবে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
খুলনাঞ্চলের শিক্ষা বিস্তারেও পদ্মা সেতু রাখবে যথেষ্ঠ ভূমিকা এমনটি উল্লেখ করে তিনি বলেন, এক সময় ঢাকা ও রাজশাহী বিশ^বিদ্যালয় ছাড়া আর কোন বড় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ছিল না। এজন্য খুলনাঞ্চলের শিক্ষার্থীদের স্টিমারে করে যেমন ঢাকায় যেতে হতো তেমনি ট্রেনে করে যেতে হতো রাজশাহীতে। অথচ এখন খুলনায় খুলনা বিশ^বিদ্যালয়, খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ^বিদ্যালয়, কৃষি বিদ্যালয় যেমন হয়েছে তেমনি রয়েছে একাধিক প্রাইভেট বিশ^বিদ্যালয়ও। এছাড়া শেখ হাসিনা মেডিকেল বিশ^বিদ্যালয়ের কার্যক্রমও ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে। এজন্য পদ্মা সেতু ছিল দেশের অন্যান্য স্থানের শিক্ষার্থীদের জন্য প্রধান বাঁধা। অনেকে ইচ্ছা থাকা সত্বেও এসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যেমন আসতে চাইতো না তেমনি এ অঞ্চলের শিক্ষার্থীদের ঢাকা বা অন্যান্য বিশ^বিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ হলেও তারা যেতে চাইতো না। কিন্তু এখন পদ্মা সেতুর ফলে গোটা দেশ একটি যোগাযোগ নেটওয়ার্কের আওতায় আসতে যাচ্ছে। যেটি এ অঞ্চলের শিক্ষা বিস্তারে রাখবে বলিষ্ঠ ভূমিকা।
এক কথায় রাজধানী থেকে বিচ্ছিন্ন একটি দ্বীপকে যে নেত্রী একত্রিত করে দিলেন তার নাম শেখ হাসিনা। সরাসরি যোগাযোগ স্থাপনের এ সুযোগ সৃষ্টির জন্য তিনি প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন, যার হাতে পদ্মা সেতু হয়েছে তার হাতেই বিমান হবে বলেও তার বিশ^াস। সুতরাং বাগেরহাটের ফয়লায় খানজাহান আলী(রহ:) বিমান বন্দরের কাজ দ্রুত এগিয়ে নেয়ার মধ্যদিয়ে মোংলা বন্দরকে আরও গতিশীল করা, ইপিজেড ও অর্থনৈতিক অঞ্চলকে আরও সচল করা, দেশী-বিদেশী বিনিয়োগকারীদের উৎসাহিত করা এবং পর্যটকদের আকৃষ্ট করার ব্যবস্থা করা হবে বলেও তিনি আশা করছেন।
পদ্মা রেল সেতুর কাজ সম্পন্ন হলে ঢাকার সাথে সরাসরি খুলনার সাথে রেল যোগাযোগের আহবান জানিয়ে নারায়ন চন্দ্র চন্দ বলেন, সড়ক পথের চেয়ে রেল যোগাযোগ আরও সহজ হবে অনেকের জন্য। বিশেষ করে রোগী ও পণ্য পরিবহনের ক্ষেত্রে রেল একটি অন্যতম মাধ্যম। এজন্য তিনি রেলের শেষ স্টপেজ খুলনা করার দাবি জানান। পাশাপাশি গোটা দক্ষিণাঞ্চলকে একটি রেল নেটওয়ার্কের আওতায় আনার পরিকল্পনা গ্রহণের দাবি জানিয়ে তিনি বলেন, যেহেতু খুলনা-মোংলা রেল লাইন হচ্ছে সেহেতু খুলনা থেকে সাতক্ষীরার মুন্সিগঞ্জ পর্যন্ত নতুন রেল লাইন করা হলে পর্যটনের ক্ষেত্র আরও সম্প্রসারিত হবে। এজন্য তিনি সমন্বিত পরিকল্পনা ও উদ্যোগ গ্রহণের আহবান জানান।
পদ্মা সেতু হলে শিল্প নগরী খুলনা তার অতীত ঐতিহ্য ফিরে পাবে উল্লেখ করে এই সংসদ সদস্য বলেন, এর ফলে বন্ধ হয়ে যাওয়া মিল কল কারখানাগুলো যেনম চালু হবে তেমনি নতুন নতুন শিল্প প্রতিষ্ঠানও গড়ে উঠবে। এজন্য তিনি এখনই মহাপরিকল্পনা গ্রহণ করে বন্ধ মিল চালু করার পদক্ষেপ নেয়ার দাবি জানান। এ ব্যাপারে তিনি প্রশ্ন তুলে বলেন, যেখানে ব্যক্তি মালিকানাধীন মিলগুলো লাভজনক হচ্ছে, নতুন নতুন মিল তৈরি হচ্ছে সেখানে রাষ্ট্রায়ত্ত মিল কেন লোকসানের অজুহাতে বন্ধ হবে। এগুলো খতিয়ে দেখে ব্যবস্থা নেয়া দরকার বলেও তিনি মনে করেন। প্রয়োজন হলে অধিক পুরাতন মেশিনারিজগুলো আধুনিকায়নের মধ্যদিয়ে মিলগুলো চালু রাখা দরকার বলেও তিনি উল্লেখ করেন। পদ্মা সেতু চালুর পাশাপাশি এ কাজগুলো দ্রুত ও আন্তরিকতার সাথে করা উচিত বলেও তিনি মনে করেন।
পদ্মা সেতু চালুর পাশাপাশি সংযোগ সড়কগুলো সম্প্রসারণ করার আহবান জানিয়ে তিনি বলেন, এখনই এ ব্যাপারে পদক্ষেপ নেয়া দরকার। যেসব রাস্তা দুই লেনের আছে সেগুলোকে চার লেন বা ছয় লেনে করার মধ্যদিয়ে পদ্মা সেতুর সাথে সাথে এ অঞ্চলে যে যানবাহনের চাপ সৃষ্টি হবে সেগুলো নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব বলেও তিনি উল্লেখ করেন। পাশাপাশি যেসব বাঁকের কারনে প্রতিনিয়ত সড়ক দুর্ঘটনা হয় সেগুলো সোজা করার মধ্যদিয়ে দুর্ঘটনা রোধে কার্যকরী পদক্ষেপ নেয়া সম্ভব বলেও জানান তিনি। এ ব্যাপারে তিনি সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রী বরাবর ডি.ও(ডেমি অফিসিয়াল) লেটার দিয়েছেন। যে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়া হলে বদলে যাবে খুলনাঞ্চলের সড়ক যোগাযোগের দৃশ্যপট।