/ আজও পূরণ হয়নি শূন্যতা

আজও পূরণ হয়নি শূন্যতা

স্মৃতির পাতায় আলহাজ্ব লিয়াকত আলী

এইচ এম আলাউদ্দি : দশ বছর পেরিয়ে গেছে। সময়ের ক্যালেন্ডারে বদলেছে অসংখ্য মাস, ঋতুর পালাবদল দেখেছে খুলনার বাতাস। কিন্তু একটি শূন্যতা আজও পূরণ হয়নি-খুলনার গণমাধ্যমে, প্রেসক্লাবে, পূর্বাঞ্চলের প্রতিটি পাতায়, প্রতিটি শব্দে। সেই শূন্যতা- আলহাজ্ব লিয়াকত আলীর অনুপস্থিতি।

২০১৫ সালের ২৮ নভেম্বর রাতের একটি খবর বজ্রপাতের মতো আছড়ে পড়েছিল পূর্বাঞ্চল অফিসে। কেন যেনো মেনে নেওয়াটা সবার জন্য ছিল অনেকটাই কঠিন। আকস্মিক এ খবরে কর্মস্থলের সবাই যেন হতচকিত হয়ে পড়েছিলেন। যে যার মতো আরও নিশ্চিত হওয়ার চেষ্টায় মোবাইলগুলো ব্যস্ত করে ফেললেন। শেষ পর্যন্ত নিশ্চিত হওয়া গেলো দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের উন্নয়নের স্বপ্নদ্রষ্টা, খুলনা প্রেসক্লাবের সাবেক সভাপতি, বিভাগীয় প্রেসক্লাব ফেডারেশনের চেয়ারপার্সন এবং বৃহত্তর খুলনা উন্নয়ন সংগ্রাম সমন্বয় কমিটির সাবেক সভাপতি, দৈনিক পূর্বাঞ্চলের প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক আলহাজ্ব লিয়াকত আলী আর নেই।

২০১৫ থেকে ২০২৫। দীর্ঘ ১০ বছর অতিবাহিত। কিন্তু এতোদিনেও আলহাজ্ব লিয়াকত আলীর অভাব পূরণ হয়নি। বিশেষ করে খুলনা প্রেসক্লাব বা মিডিয়াপাড়ায় তার অভাব আজ অনেকেই উপলব্ধি করছেন।

আকাশে কিছু তারা কখনোই নিভে না-তারা চলে যায়, কিন্তু আলো রেখে যায় বাতাসে ভেসে থাকা ধূলিকণার মতো। তাদের আলোর রেখা পথ দেখায় নতুন যাত্রীকে, নতুন পথিককে। আলহাজ্ব লিয়াকত আলী ছিলেন তেমনই এক দীপ্তিমান নক্ষত্র; তাঁর আলো ছড়িয়েছিল খুলনা মহানগরীর প্রতিটি রাস্তা, প্রতিটি মানুষের মুখে, প্রতিটি সত্য উচ্চারণে।

তিনি ছিলেন একজন সম্পাদক-কিন্তু শুধুই তো সম্পাদক নন। যেন কোনো মাটির ঢেলা থেকে উঠে আসা মানুষদের স্বপ্নের কারিগর। দক্ষিণের মানুষের আনন্দ-বেদনার দর্পণে তাঁর নাম ঝরে পড়ত বারবার, সংবাদপত্রের কালো অক্ষর হয়ে, সত্যের নিঃশব্দ প্রতিধ্বনি হয়ে।

গোপালগঞ্জের মুকসুদপুরের এক সাধারণ ঘরের সন্তান লিয়াকত আলী। শৈশবের নরম রোদ, গ্রাম্য উঠোন, পথের ধুলো- সব মিলিয়ে যে মন তৈরি হয়, তাতে বিনয়ের পাশাপাশি জমে ওঠে দৃঢ়তা। আর খুলনার বাতাসে এসে সেই মন আরও তীক্ষ্ম হয়, আরও জাগ্রত হয়। তিনি জানতেন-জীবন শুধু নিজের জন্য নয়, মানুষের জন্য। তাই তাঁর চোখে ছিল মানুষের কষ্ট, মানুষের স্বপ্ন। এজন্যই অনেক সুযোগ থাকার পরও সেই চোখই তাঁকে টেনে নিল সাংবাদিকতার অগ্নিপথে।

দৈনিক পূর্বাঞ্চল তাঁর কাছে শুধু পত্রিকা ছিল না-এটি ছিল মানুষের ভাষা, মানুষের শ্বাস-প্রশ্বাস। যেন খুলনার মাটির গন্ধ ছাপা হতো প্রতিদিনের পাতায়, নদীর ঢেউ গুণগুণ করত শিরোনামে, মানুষের কান্না-হাসি শব্দ হয়ে উঠত প্রতিবেদনে। তিনি প্রায়ই বলতেন পূর্বাঞ্চল নিছক একটি পত্রিকা নয়, এটি গণমানুষের মনের কথা বলবে, এটি একটি কমিউনিটি নিউজপেপার। যেটি দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মানুষের চাহিদার কথা বলবে, এ অঞ্চলের উন্নয়ন-অগ্রগতির কথা বলবে। অর্থাৎ একটি আঞ্চলিক সংবাদপত্র বলতে যেটি বোঝায় তেমন করেই পত্রিকাটিকে সাজিয়েছিলেন তিনি। যেটি শুধু পত্রিকা নয়, আঞ্চলিক উন্নয়ন-অগ্রগতির কথা লিখবে এটিই ছিল তাঁর স্বপ্ন।

লিয়াকত আলী ছিলেন সেই কারিগর, যিনি সংবাদপত্রকে শুধু সংবাদ নয়, একটি সময়, একটি ভূগোল এবং একটি সমাজের প্রতিচ্ছবি করে তুলেছিলেন। তিনি কলম ধরতেন না শুধু লেখার জন্য, তিনি কলম ধরতেন মানুষকে বাঁচানোর জন্য। কী অভাব দক্ষিণ-পশ্চিম জনপদের সেটি স্থান পাবে পূর্বাঞ্চলের প্রচ্ছদে, নিউজে, প্রতিবেদনে। তাইতো তিনি পূর্বাঞ্চল, প্রেসক্লাব বা মিডিয়াপাড়ার গন্ডি পেরিয়ে যুক্ত হয়েছিলেন খুলনার উন্নয়ন আন্দোলনে। একাধিকবার শীর্ষ পদে দায়িত্ব পালন করেছেন বৃহত্তর খুলনা উন্নয়ন সংগ্রাম সমন্বয় কমিটিতে। দেশের পর্যটন শিল্পকে বিকশিত করতে সুন্দরবনকে বিশ্ব ঐতিহ্যে রূপ দিতে রাজপথে দেশে-বিদেশে আন্দোলনও করেছেন। খুলনা থেকে নলিয়ান পর্যন্ত চার লেনের সড়ক করার মধ্যদিয়ে পর্যটকদের সুন্দরবন দর্শনের স্বপ্নও ছিল আলহাজ্ব লিয়াকত আলীর।

লিয়াকত আলী ছিলেন সেই মানুষ, যিনি জানতেন- “সত্য কখনো কাগজের পাতায় সীমাবদ্ধ থাকে না; সত্য মানুষের মাঝে বেঁচে থাকে।” তাই তাঁর চোখে যখন অন্যায় দেখত, তাঁর শব্দ হয়ে উঠত বজ্রস্বরে; আবার যখন মানুষের দুঃখ দেখত, তাঁর বাক্য হয়ে উঠত সান্ত্বনার ছায়া। তিনি ছিলেন সাংবাদিকতার সেই বিরল মানুষ, যাদের শব্দে থাকে সাহসের তাপ, আর হৃদয়ে থাকে সমুদ্রের গভীরতা।

মানুষের জন্য নির্মিত ছিল তাঁর প্রতিটি শ্বাস। একজন মানুষ কত সহজে মানুষের মত মানুষ হয়ে উঠতে পারেন- লিয়াকত আলী তার প্রমাণ। সামাজিক কাজ, মানবিক সহায়তা, তরুণ সাংবাদিকদের হাত ধরে এগিয়ে নেওয়া-এসব তাঁর কাছে দায়িত্ব নয়, ভালোবাসা ছিল।
খুলনার সাংবাদিক সমাজ আজও তাঁকে স্মরণ করে শুধু সম্পাদক হিসেবে নয়, বরং একজন অভিভাবক, একজন পরামর্শদাতা, একজন দৃষ্টান্তহীন মানুষ হিসেবে।

২৮ নভেম্বর ২০১৫। রাত নেমেছিল, কিন্তু খুলনার আকাশে আরেক অন্ধকার যোগ হয়েছিল সেদিন। সংবাদ এলো- দক্ষিণের আলোকবর্তিকা নিভে গেছে। যেন শহরের প্রতিটি গাছে, প্রতিটি নদীতে, প্রতিটি সংবাদকক্ষে একসঙ্গে নেমে এসেছিল রংহীন নীরবতা। পূর্বাঞ্চলের বার্তা কক্ষ যেন থেমে গিয়েছিল, কম্পিউটারের কী-বোর্ড যেন হঠাৎ স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু মানুষ জানে- কিংবদন্তিরা কখনো চলে যায় না। তাদের নাম বেঁচে থাকে মাটির গন্ধে, বাতাসের শব্দে, মানুষের স্মৃতিতে।

ঢাকায় আকস্মিক এ মৃত্যুর খবর পেয়ে মুহূর্তের মধ্যেই পূর্বাঞ্চল কার্যালয়ে ছুটে এসেছিলেন গণমাধ্যমকর্মীরা। সবকিছু যেন এলোমেলো হয়ে গেলো। অসুস্থ সহধর্মিনী, আমাদের মাতৃসম বেগম ফেরদৌসী আলী পরদিন ফিরলেন লাশ নিয়ে। সে এক হৃদয়বিদারক দৃশ্য। ২৯ নভেম্বর পূর্বাঞ্চল কার্যালয়ের সামনের ইকবাল নগর মসজিদ লেনে মানুষের ঢল নেমেছিল। সবার চোখে যেন অভিভাবক হারানোর বেদনা, নিরব কান্না।

আলহাজ্ব লিয়াকত আলী ছিলেন দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সংবাদযোদ্ধা, সত্যের পাহারাদার, শব্দের সাধক। তিনি ছিলেন কর্মের প্রজ্জ্বলিত প্রদীপ, সাহসের অগ্নিশিখা, মানুষের ভরসার বাতিঘর। আজ তাঁর অনুপস্থিতি সত্যিই যেন শুধুই শূন্যতা।

একথা বলতে দ্বিধা নেই বা অস্বীকার করারও কিছু নেই যে, দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল, বিশেষ করে খুলনা বিভাগের সাংবাদিকতার এক দীর্ঘ এবং গৌরবময় ইতিহাস বহন করে। এই ইতিহাসে এক উজ্জ্বল অধ্যায় গড়েছিলেন আলহাজ্ব লিয়াকত আলী। যিনি শুধু দৈনিক পূর্বাঞ্চলের সম্পাদকই ছিলেন না, ছিলেন সাংবাদিক সমাজের অত্যন্ত শ্রদ্ধেয় ব্যক্তি। তাঁর নিষ্ঠা, সাহস ও জনকল্যাণমূলক চিন্তা আজও খুলনার সাংবাদিকতা পেশার জন্য অনুপ্রেরণার উৎস।

কে এই ক্ষণজন্মা পুরুষ ঃ আলহাজ্ব লিয়াকত আলীর জন্ম হয়েছিল ১৯৪৮ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর, গোপালগঞ্জ জেলার মুকসুদপুরে। তাঁর পিতা ছিলেন আইনুল হক মিনা এবং মাতা রাবেয়া বেগম। তিনি ছেলেবেলায় খুলনায় বসবাস এবং শিক্ষালাভ করেন। তার স্কুল-মাদরাসার জীবন তার চরিত্র নির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। ছাত্রজীবনে তিনি ছাত্ররাজনীতি এবং সংগঠনে সক্রিয় ছিলেন, যা পরবর্তী সাংবাদিকতা ও সামাজিক কর্মকান্ডে প্রতিফলিত হয়।

আলহাজ্ব লিয়াকত আলীর যোগ্য উত্তরসূরী একমাত্র পুত্র মোহাম্মদ আলীর হাত ধরে আজ পূর্বাঞ্চল এগিয়ে চলেছে। প্রত্যাশা একটাই পিতার রেখে যাওয়া পূর্বাঞ্চল শুধু একটি পত্রিকাই নয়, এটি খুলনার গণমানুষের মুখপত্র। সেই প্রত্যাশা পূরণে প্রয়োজন মানুষের ভালোবাসা, পাঠকদের অকুণ্ঠ সমর্থন।

লেখক : খুলনা ব্যুরো প্রধান, দৈনিক কালের কণ্ঠ