/ খাদ্য নিরাপদ ও ঝুঁকিমুক্ত করতে সর্বাত্মক উদ্যোগ জরুরি

খাদ্য নিরাপদ ও ঝুঁকিমুক্ত করতে সর্বাত্মক উদ্যোগ জরুরি

খাদ্য নিরাপদ হবে- এটি একটি প্রতিষ্ঠিত সত্য কথা। খাদ্য হলেই সেটি মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য নিরাপদ থাকবে এটাই স্বাভাবিক। যদি তা’ না হয় তাহলে সেটিকে খাবার বলা যাবে না। যেসব আহার্য বা ভোজ্য সামগ্রী গ্রহণ করলে জীবদেহের বৃদ্ধি, পুষ্টি, ক্ষয়পূরণ, রোগ প্রতিরোধ এবং তাপশক্তি বা কর্মক্ষমতা উৎপন্ন হয়, তাকে খাদ্য বলে। খাদ্য সাধারণত শর্করা, আমিষ, স্নেহ, ভিটামিন, খনিজ লবণ ও জল-এই ছয়টি উপাদান দ্বারা গঠিত। খাদ্যের মূল বৈশিষ্ট্য ও কার্যাবলীর মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো খাদ্য শরীরকে কাজ করার শক্তি দেয়, বৃদ্ধি ও ক্ষয়পূরণ: শরীরের গঠন বা মেরামতের কাজ করে। খাদ্য রোগ প্রতিরোধক হিসেবে শরীরকে সুস্থ রাখতে কাজ করে। সহজ কথায়, বেঁচে থাকার জন্য প্রয়োজনীয় পুষ্টিকর উপাদানই হলো খাদ্য। খাদ্যের এই আভিধানিক অর্থের বাইরে যদি আমরা বাস্তবতার দিকে নজর দেই তাহলে আমরা দেখতে পাবো দেশে খাবারের প্লেটে ঝুঁকির তালিকাটি প্রতিনিয়তই লম্বা হচ্ছে। গবেষণায় মুরগির মাংসে ভারী ধাতুর উপস্থিতির তথ্য এসেছে, খাবারে ধরা পড়ছে মাইক্রোপ্লাস্টিক। এর আগেও সয়াবিন তেল, ডিমসহ নানা খাদ্যে ক্ষতিকর উপাদান পাওয়া যাওয়ার খবর মিলেছে। ভেজাল ও অনিরাপদ খাবারের এ বাস্তবতা শুধু অসুস্থতাই বাড়াচ্ছে না; জনগণের চিকিৎসা ব্যয়, কর্মক্ষমতা হ্রাস এবং সামাজিক ক্ষতির চাপও বাড়াচ্ছে। এমন বাস্তবতায় গতকাল দেশব্যাপী পালিত হয়েছে জাতীয় নিরাপদ খাদ্য দিবস। এবারের শ্লোগান ‘নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করি, সুস্থ সবল জীবন গড়ি’।
বাজারে ভেজাল খাবারই বেশী। ভেজালে সয়লাব বাজার, হাট ঘাট, নগর বন্দর শহর গ্রাম গঞ্জ যেখানেই খাবারের সন্ধানে যাওয়া যাবে সেখানেই অনিরাপদ খাবারের ঝুঁকি রয়েছে। নিরাপদ বা ঝুঁকিমুক্ত খাবার এখন পাওয়াই দুষ্কর। ভেজাল যেন এক ধরণের বাস্তবতা। এই বাস্তবতার বাইরে চিন্তা করা অনেকটাই অর্থহীন। কারণ প্রায়ই দেখা যায়, পানযোগ্য পানিতে ভেজাল, তেলে ভেজাল, চালে ভেজাল, আটায় ভেজাল, মসলায় ভেজাল, ফলে ভেজাল, সবজিতে ভেজাল, মুরগীতে ভেজাল, মাংসে ভেজাল, মাছে ভেজাল, মধুতে ভেজাল, দুধে ভেজাল, মিষ্টিতে ভেজাল, ঘীয়ে ভেজাল। ভেজালবিহীন বা ঝুঁকি নেই এমন খাদ্য পণ্য বাজারে খুঁজে পাওয়া খুবই ভাগ্যের ব্যাপার।
অসচেতন মানুষ বাধ্য হয়েই এবং অনেকটা জেনে বুঝেই অনিরাপদ বা ঝুঁকিপূর্ণ খাদ্য গ্রহণ করতে বাধ্য হচ্ছে। কারণ যেখানে সর্বত্র অনিরাপদ সেখানে নিরাপদ খাবারের সন্ধান বাতুলতা মাত্র। কিন্তু এমন অবস্থা মেনে নেয়া যায় না। এই অবস্থার পরিবর্তন দরকার। বাংলাদেশের প্রতিটি পরিবারেই কমবেশী রোগাক্রান্ত বা অসুস্থ্য সদস্য রয়েছে। এর অন্যতম কারণ হলো ভেজাল বা অনিরাপদ খাদ্য গ্রহণ। এই অনিরাপদ খাবার গ্রহণের ফলে মানুষের স্বাস্থ্য খাতে ব্যয় দিন দিন বেড়েই যাচ্ছে। বাংলাদেশে সরকারী পর্যায় হতেই দেশবাসীকে নিরাপদ এবং ভেজালমুক্ত খাবার প্রাপ্তি নিশ্চিত করতে একটি প্রতিষ্ঠান রয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির নাম ‘বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ (বিএফএসএ)’। দেশের মানুষের খাদ্যকে নিরাপদ করার লক্ষ্যে ২০১৫ সালে গঠন করা এই প্রতিষ্ঠানটির কাজ হলো- দেশী-বিদেশী সব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সমন্বয় এবং নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে আমদানি, রফতানি ও দেশে উৎপাদিত খাদ্য নিরাপদ করা। তবে প্রতিষ্ঠার ১১ বছরেও সেই উদ্দেশ্য কার্যকরভাবে পূরণ করতে পারেনি বিএফএসএ। বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান জাকারিয়া (অতিরিক্ত সচিব) সাংবাদিকদের বলেন, ‘এখানে একটি সমস্যা হলো কর্তৃপক্ষ নতুন। আগে দেশে নিরাপদ খাদ্য ব্যবস্থাপনা বিষয়ে তেমন ব্যবস্থাও ছিল না। ফলে অনেক কিছু আমাদের শিখতে হচ্ছে কাজ করার মাধ্যমে। আমরা ২০২০ সালে নিজস্ব জনবল পেয়েছি। সেজন্য মাত্র পাঁচ বছরে দক্ষতা উন্নয়ন করা সম্ভব না। দেশে নিরাপদ খাদ্যসম্পর্কিত কোনো পাঠ্যও নেই। কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে বছর দুয়েক ধরে এ বিষয়ে পড়ানো হচ্ছে। সারা দেশে এ বিষয়ে এক্সপার্টিজ কত আছে তা নিয়েও অনেক প্রশ্ন আছে।
আমরা দেখতে পাচ্ছি নানা দুর্বলতায় এই প্রতিষ্ঠানটি অনেকটাই খুড়িয়ে খুড়িয়ে চলছে। দেশবাসীকে ভেজালের করাল গ্রাস হতে মুক্ত করতে এই প্রতিষ্ঠানটির সক্ষমতা এখনো আসেনি। নতুন প্রতিষ্ঠানটি নানা সমস্যায় আক্রান্ত। আমরা চাই সরকারের প্রতিষ্ঠানটি দেশকে ভেজালমুক্ত খাদ্য উপহার দিতে কার্যকরভাবে ভ‚মিকা রাখুক। এজন্য অবশ্য প্রতিষ্ঠানটি সমস্যাসমূহ দূর করতে হবে। শুধু একটি কর্তৃপক্ষের পক্ষে বিপুল জনসংখ্যার দেশকে রাতারাতি ভেজালমুক্ত করা সম্ভব নয়। এজন্য দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন। আমরা চাই বিদ্যমান আইনের মাধ্যমে পর্যায়ক্রমে তাবৎ খাদ্য দ্রব্য নিরাপদ করার উদ্যোগ নেয়া হোক।