সচেতনতা ও দায়িত্বশীল আচরণেই
গড়ে উঠবে নিরাপদ সড়ক ব্যবস্থা
স্টাফ রিপোর্টার: বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) চেয়ারম্যান আবু মমতাজ সাদ উদ্দিন আহমেদ বলেছেন, সড়ক দুর্ঘটনা রোধে শুধু বিআরটিএ নয়- সরকার, মালিক-শ্রমিক, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, গণমাধ্যম ও সাধারণ নাগরিক—সবার সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। সচেতনতা ও দায়িত্বশীল আচরণই পারে দুর্ঘটনা কমাতে এবং একটি নিরাপদ সড়ক ব্যবস্থা গড়ে তুলতে।
তিনি বলেন, “যারা দেশের অর্থনীতিকে সমৃদ্ধ করবে, তারা আজ সড়কে প্রাণ হারাচ্ছে- এটি মেনে নেওয়া যায় না। নিরাপদ সড়ক নিশ্চিতে সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে।”
গতকাল বৃহস্পতিবার বিকেলে খুলনার জেলা প্রশাসকের সম্মেলনকক্ষে বিআরটিএ ট্রাস্টি বোর্ডের উদ্যোগে খুলনা, সাতক্ষীরা ও বাগেরহাট জেলায় সংঘটিত সড়ক দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্তদের মাঝে চেক বিতরণ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
অনুষ্ঠানে খুলনা জেলার ২৩ জন, সাতক্ষীরা জেলার ১৩ জন ও বাগেরহাট জেলার ১০ জনসহ মোট ৪৬ জন ক্ষতিগ্রস্তের মাঝে এক কোটি ৯৬ লাখ টাকার চেক বিতরণ করা হয়।
খুলনা জেলা প্রশাসক আ. স. ম. জামশেদ খোন্দকারের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বিআরটিএ’র পরিচালক (অডিট ও আইন) রুবায়াৎ-ই-আশিক, অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট নূরুল হাই মোহাম্মদ আনাছ, খুলনা বিআরটিএর পরিচালক (ইঞ্জি.) মো. জিয়াউর রহমান, মোটর শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি জাহিদ হাসান খান, বাস-মিনিবাস মালিক সমিতির সভাপতি রবিউল করিম, ট্রাক শ্রমিক-মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক শেখ ওয়াহিদুল ইসলাম, দৈনিক কালের কণ্ঠের ব্যুরো প্রধান এইচ এম আলাউদ্দিন এবং সড়ক দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত মো. আসলাম হোসেন গাজী বক্তব্য দেন। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন বিআরটিএ’র উপপরিচালক তানভীর আহমেদ। খুলনা জেলা প্রশাসন ও বিআরটিএ যৌথভাবে এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে চেয়ারম্যান আরও বলেন, সড়ক দুর্ঘটনা প্রতিরোধে প্রতিরোধমূলক (প্রিভেন্টিভ) ও নিরাপত্তামূলক (সিকিউরিটি)- দুই দিকেই জোর দেওয়া হচ্ছে। পেশাদার চালকদের জন্য ৬০ ঘণ্টার বাধ্যতামূলক প্রশিক্ষণ চালু হয়েছে। গত ছয় মাসে মোবাইল কোর্ট পরিচালনার মাধ্যমে বিপুলসংখ্যক অবৈধ ও ফিটনেসবিহীন যানবাহনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
তিনি জানান, দীর্ঘদিন স্ক্র্যাপিং নীতিমালা না থাকায় অচল ও ঝুঁকিপূর্ণ যানবাহন অপসারণে জটিলতা ছিল। সম্প্রতি সরকার স্ক্র্যাপিং পলিসি অনুমোদন করায় পুরোনো যানবাহন অপসারণ ও নতুন যানবাহন প্রতিস্থাপন সহজ হবে।
তিনি বলেন, কেবল যানবাহনের সংখ্যা কমানোই সমাধান নয়; প্রয়োজন অনুযায়ী নিরাপদ ও আধুনিক যানবাহন নিশ্চিত করতে হবে। একক মালিকদের সহজ শর্তে ঋণ সহায়তার ব্যবস্থার ওপরও গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
চালকদের উদ্দেশে চেয়ারম্যান বলেন, নিয়ম অনুযায়ী একটানা পাঁচ ঘণ্টার বেশি এবং দিনে আট ঘণ্টার বেশি গাড়ি চালানো উচিত নয়। বাস্তবে অনেক চালক ১৪ থেকে ১৬ ঘণ্টা গাড়ি চালান, যা দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ায়। এ বিষয়ে চালক ও মালিক উভয় পক্ষকে সচেতন হওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
তিনি আরও বলেন, মোট সড়ক দুর্ঘটনার প্রায় ৭০ শতাংশ মোটরসাইকেল সংশ্লিষ্ট। এ প্রেক্ষাপটে প্রস্তাব করা হয়েছে—মোটরসাইকেল বিক্রির সময় বিক্রেতাকে বাধ্যতামূলকভাবে দুটি বিএসটিআই অনুমোদিত হেলমেট সরবরাহ করতে হবে। হেলমেট ছাড়া চলাচলের ক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি অনুসরণের আহ্বান জানান তিনি।
বিআরটিএ চেয়ারম্যান বলেন, দেশ বর্তমানে ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড পর্যায়ে রয়েছে। কিন্তু ৫ থেকে ২৯ বছর বয়সী তরুণদের মধ্যে সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুহার উদ্বেগজনক। এ প্রবণতা অব্যাহত থাকলে দেশের অর্থনৈতিক সম্ভাবনা ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তাই সড়ক নিরাপত্তাকে জাতীয় ইস্যু হিসেবে বিবেচনা করে সম্মিলিতভাবে কাজ করার আহ্বান জানান তিনি।
তিনি সংবিধানের ২১ অনুচ্ছেদের উল্লেখ করে বলেন, আইন মানা, শৃঙ্খলা রক্ষা, জনসেবায় অংশগ্রহণ এবং রাষ্ট্রীয় সম্পদ সংরক্ষণ—প্রত্যেক নাগরিকের সাংবিধানিক দায়িত্ব। একই সঙ্গে সরকারি কর্মচারীদের জনগণের সেবায় নিয়োজিত থাকার বাধ্যবাধকতার কথাও তুলে ধরেন।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে পরিচালক (ইঞ্জি.) মো. জিয়াউর রহমান জানান, খুলনা সার্কেলে মোট ৪৬টি ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের মাঝে আর্থিক সহায়তা বিতরণ করা হয়েছে। এর আগে যশোর, ঝিনাইদহ, মাগুরা ও সিলেটসহ বিভিন্ন জেলায় এ কার্যক্রম সম্পন্ন হয়েছে। খুলনার পর সাতক্ষীরা ও বাগেরহাট এবং পরে বরিশাল, পটুয়াখালী ও ঝালকাঠিতে এ কার্যক্রম পরিচালিত হবে।