/ খুলনায় ডিপোতেও জ্বালানি তেলেরসংকট

খুলনায় ডিপোতেও জ্বালানি তেলেরসংকট

সরবরাহে অচলাবস্থা চলছে
বাড়ছে জনভোগান্তি

স্টাফ রিপোর্টার : খুলনায় জ্বালানি তেলের সংকট এখন আর শুধু ফিলিং স্টেশনকেন্দ্রিক নয়; বরং সংকটের চিত্র স্পষ্ট হয়ে উঠেছে ডিপোগুলোর সামনেও। ডিপো থেকে পাম্প পর্যন্ত সরবরাহ শৃঙ্খলের প্রতিটি স্তরে অস্বাভাবিক চাপ, দীর্ঘ অপেক্ষা এবং অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়ায় পুরো জ্বালানি ব্যবস্থাপনায় অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে পরিবহন, কৃষি ও সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনে।

নগরীর মেঘনা ডিপো এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে রয়েছে শতাধিক ট্যাংকলরি। অনেক চালক ভোররাত থেকেই লাইনে দাঁড়িয়ে থাকলেও ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষার পরও পাচ্ছেন না তেল উত্তোলনের সিরিয়াল। একই চিত্র দেখা গেছে পাশের পদ্মা ও যমুনা ডিপোতেও। লাইনে থাকা চালকদের মধ্যে বিরক্তি ও হতাশা স্পষ্ট।
ট্যাংকলরি চালক মাহতাব শেখ বলেন, ভোর ৫টা থেকে লাইনে আছি, কিন্তু এখনো সিরিয়াল পাইনি। আগের মতো দ্রুত তেল তুলতে পারছি না। এতে একদিকে সময় নষ্ট হচ্ছে, অন্যদিকে খরচ বাড়ছে। অন্য একজন চালক ইস্রাফিল জানান, দিনে একাধিক ট্রিপ দেওয়ার সুযোগ এখন আর নেই, ফলে তাদের আয় কমে যাচ্ছে।

চালকদের অভিযোগ, সরবরাহ কমে যাওয়ায় ডিপো থেকে তেল উত্তোলনে দীর্ঘসূত্রতা তৈরি হয়েছে। এতে পরিবহন ব্যয় যেমন বাড়ছে, তেমনি নির্ধারিত সময়ে ফিলিং স্টেশনগুলোতে তেল পৌঁছানো যাচ্ছে না। ফলে শহরের বিভিন্ন পাম্পে দেখা দিচ্ছে তীব্র সংকট। অনেক পাম্পেই দুপুরের আগেই তেল ফুরিয়ে যাচ্ছে, আর যেগুলোতে তেল আছে, সেগুলোর সামনে দীর্ঘ লাইন দেখা যাচ্ছে। কেসিসি পেট্রোলিয়ামসহ বিভিন্ন পাম্পে গিয়ে দেখা যায়, ভোর থেকে দাঁড়িয়ে থাকা চালকরা দুপুর গড়ালেও তেল পাচ্ছেন না। অনেকেই ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, দুই-তিন ঘণ্টা অপেক্ষার পর সর্বোচ্চ ২০০ টাকার তেল দেওয়া হচ্ছে যা কার্যত এক ধরনের নিয়ন্ত্রিত বঞ্চনা। এতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন পরিবহন শ্রমিকরা, যাদের দৈনিক আয়ের ওপর সরাসরি আঘাত পড়ছে।

ফিলিং স্টেশন মালিকরা বলছেন, চাহিদার তুলনায় তারা অনেক কম তেল পাচ্ছেন। এক পাম্প মালিক জানান, আমাদের দৈনিক চাহিদা যেখানে ১০ হাজার লিটার, সেখানে পাচ্ছি ৪ থেকে ৫ হাজার লিটার। এতে গ্রাহকদের চাহিদা মেটানো অসম্ভব হয়ে পড়ছে। তিনি আরও বলেন, সরবরাহ স্বাভাবিক না হলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হবে।নগরীর একাধিক ফিলিং স্টেশন ঘুরে দেখা গেছে, তেলের জন্য কয়েক কিলোমিটার দীর্ঘ সারি, ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা, এবং শেষে সীমিত পরিমাণ জ্বালানি—যা দিয়ে একজন চালকের দিনই চলে না।

ডিপো কর্তৃপক্ষের দাবি, বর্তমানে রেশনিং পদ্ধতিতে তেল সরবরাহ করা হচ্ছে। গত বছরের মার্চ থেকে জুন পর্যন্ত চার মাসে যে পরিমাণ তেল উত্তোলন হয়েছিল, তার গড় হিসাব ধরে বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে। তাদের মতে, সীমিত সরবরাহের কারণে এই পদ্ধতি অনুসরণ করা ছাড়া বিকল্প নেই।
তবে সংশ্লিষ্টদের একটি বড় অংশ এই ব্যাখ্যায় সন্তুষ্ট নন। তাদের মতে, বর্তমান বাস্তবতায় চাহিদা অনেক বেড়েছে, কিন্তু সরবরাহ সেই হারে বাড়েনি। ফলে রেশনিং পদ্ধতি কার্যত সংকটকে আরও প্রকট করে তুলছে।

প্রত্যন্ত অঞ্চলে পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক। যেখানে ফিলিং স্টেশন নেই, সেখানে এজেন্টদের মাধ্যমে জ্বালানি সরবরাহ করা হয়। কিন্তু এসব এজেন্টরা প্রয়োজনীয় তেল পাচ্ছেন না বলে অভিযোগ করছেন। এতে কৃষিকাজ, সেচ কার্যক্রম এবং নৌযান চলাচল মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। বিশেষ করে বোরো মৌসুমে ডিজেলের সংকট কৃষকদের জন্য বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করেছে।

এদিকে, সংকটের সুযোগে বাজারে অনিয়মের অভিযোগও সামনে আসছে। স্থানীয় সূত্রগুলো বলছে, কিছু অসাধু ব্যবসায়ী তেল মজুদ করে বাসাবাড়িতে সংরক্ষণ করছেন। আবার কিছু ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট চক্রের কাছে অতিরিক্ত তেল সরবরাহের অভিযোগও উঠেছে, যা কৃত্রিম সংকট তৈরির আশঙ্কা বাড়াচ্ছে।

ডিপো এলাকায় নিরাপত্তা জোরদারের কথা বলা হলেও বাস্তবে সেই ব্যবস্থা পুরোপুরি কার্যকর নয় বলে অভিযোগ রয়েছে। দেশব্যাপী ডিপোগুলোতে বিজিবি মোতায়েনের কথা থাকলেও সংশ্লিষ্ট এলাকায় তাদের উপস্থিতি তেমন দেখা যায়নি। তবে সেনাবাহিনীর টহল দল মাঝে মধ্যে ঘুরে যাচ্ছে এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় পুলিশ মোতায়েন রয়েছে।

খুলনার অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট (এডিএম) নুরুল হাই মোহাম্মাদ আনাস জানিয়েছেন, এখন পর্যন্ত সুনির্দিষ্ট কোনো লিখিত অভিযোগ পাওয়া যায়নি। তবে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটদের মাঠে রাখা হয়েছে এবং পেট্রোল পাম্পগুলোতে নিয়মিত তদারকি চালানো হচ্ছে। তিনি বলেন, কোথাও অনিয়ম পাওয়া গেলে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
জ্বালানি খাত সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই সংকটের পেছনে মূলত তিনটি কারণ কাজ করছে সরবরাহ ব্যবস্থার দুর্বলতা, রেশনিং নীতির সীমাবদ্ধতা এবং সম্ভাব্য অনিয়ম। তাদের মতে, দ্রুত সরবরাহ বৃদ্ধি, ডিপো ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং কঠোর নজরদারি ছাড়া এই সংকট নিরসন সম্ভব নয়।