/ খুলনার কৃষিতে নতুন আশার আলো, লবণাক্ত জমিতে তরমুজের সবুজ বিপ্লব

খুলনার কৃষিতে নতুন আশার আলো, লবণাক্ত জমিতে তরমুজের সবুজ বিপ্লব

এম মুর্শেদ : উপকূলীয় লবণাক্ত মাটির সীমাবদ্ধতাকে পেছনে ফেলে খুলনা অঞ্চলের কৃষিতে এখন নতুন সম্ভাবনার নাম তরমুজ চাষ। এক সময় যেখানে আমন ধান কাটার পর বিশাল জমি পতিত পড়ে থাকত, সেখানে এখন সবুজ লতাপাতায় ভরে উঠছে মাঠ, গড়ে উঠছে লাভজনক এক নতুন কৃষি অর্থনীতি।


কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (ডিএই) সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে খুলনা অঞ্চলে ১৩ হাজার ৮১০ হেক্টর জমিতে তরমুজের আবাদ হয়েছে। উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে প্রায় ৬৯ লাখ টন, যার সম্ভাব্য বাজারমূল্য দাঁড়াতে পারে ১ হাজার ৪০০ কোটিরও বেশি। এতে কৃষকদের নিট লাভ হতে পারে প্রায় ৪১৪ কোটি ৩০ লাখ টাকা।


যদিও শুরুতে ১৮ হাজার ৫৫ হেক্টর জমিতে আবাদ লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল, প্রতিকূল আবহাওয়া ও প্রাকৃতিক কারণের কারণে তা পুরোপুরি অর্জন সম্ভব হয়নি। তবে সংশ্লিষ্টরা উৎপাদন ও লাভ নিয়ে আশাবাদী।


এক দশক আগেও খুলনার উপকূলীয় এলাকায় তরমুজ চাষ খুব একটা পরিচিত ছিল না। লবণাক্ততার কারণে কৃষকরা মূলত চিংড়ি চাষের ওপর নির্ভরশীল ছিলেন। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে সেই চিত্র বদলাতে শুরু করেছে। বর্তমানে তরমুজ চাষ ধান বা তিলের মতো প্রচলিত ফসলের তুলনায় বেশি লাভজনক হওয়ায় কৃষকরা দ্রুত এ ফসলে ঝুঁকছেন।


বটিয়াঘাটা,দাকোপ ও কয়রা উপজেলার বিভিন্ন মাঠ ঘুরে দেখা গেছে, কৃষকরা বীজতলা তৈরি, রোপণ, সেচ ও পরিচর্যায় ব্যস্ত সময় পার করছেন। মাঠজুড়ে ছড়িয়ে থাকা সবুজ লতাপাতা যেন নতুন সম্ভাবনার প্রতিচ্ছবি।


স্থানীয় কৃষক আজহার শেখ জানান, ধার করা অর্থ দিয়ে তিনি ২৫ বিঘা জমিতে তরমুজ চাষ করেছেন। তার ভাষায়, খরচ একটু বেশি হলেও বাজারদর ভালো থাকলে লাভের সম্ভাবনা রয়েছে। ফলন ভালো হলে ঋণ শোধ করে কিছু সঞ্চয়ও করতে পারব।


হাকিম ও কাশেমের মতো অনেক কৃষক এবার তাদের চাষের পরিমাণ বাড়িয়েছেন। তাদের মতে, তরমুজ এখন একটি নির্ভরযোগ্য আয়ের উৎসে পরিণত হয়েছে।


বটিয়াঘাটা উপজেলায় এ বছর ২,৪২০ হেক্টর জমিতে তরমুজ চাষ হয়েছে। এখানে সম্ভাব্য উৎপাদন ধরা হয়েছে প্রায় ৮৫ হাজার মেট্রিক টন, যার আনুমানিক বাজারমূল্য ৩০০ কোটি টাকা।


সুখদাড়া গ্রামের কৃষক দীপক বিশ্বাস ও প্রান্ত মণ্ডল ১০ বিঘা জমিতে তরমুজ চাষ করেছেন। গত বছর কৃষক মাঠ স্কুল থেকে আধুনিক চাষাবাদ পদ্ধতির প্রশিক্ষণ নেওয়ার পর এ বছর তারা ভালো ফলনের ব্যাপারে আশাবাদী। স্থানীয় উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা মো. মোস্তাফিজুর রহমান জানান, বড় ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগ না হলে এ মৌসুমে ফলন ভালো হবে।


কৃষি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, কৃষকরা ড্রাগন, আস্থা, পাকিজা, মালিক-১ এবং থাই রেড কিংসহ উচ্চফলনশীল বিভিন্ন জাতের তরমুজ চাষ করছেন। অনুকূল আবহাওয়া থাকলে প্রতি হেক্টরে ৫০ থেকে ৬০ টন পর্যন্ত ফলন পাওয়া সম্ভব।


প্রতি হেক্টরে চাষের খরচ প্রায় ১ লাখ ৫০ হাজার থেকে ২ লাখ টাকা হলেও বাজারমূল্য ভালো থাকায় লাভের সম্ভাবনা অনেক বেশি। ফলে নতুন নতুন কৃষক এই চাষে আগ্রহী হচ্ছেন।


দাকোপ উপজেলায় এবার প্রথমবারের মতো অনেক কৃষক পতিত জমিতে তরমুজ চাষ শুরু করেছেন। তুলনামূলক কম শ্রমে বেশি লাভের আশায় তারা এই ফসলের দিকে ঝুঁকছেন।


কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বলছেন, খুলনা ইতোমধ্যে দেশের অন্যতম প্রধান তরমুজ উৎপাদনকারী অঞ্চলে পরিণত হয়েছে। গত বছর অতিবৃষ্টি ও দুর্যোগে ক্ষতি হলেও এবার পরিস্থিতি অনুকূলে থাকায় ঘুরে দাঁড়ানোর সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।


খুলনা অঞ্চলের অতিরিক্ত পরিচালক মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, তরমুজ এ অঞ্চলের কৃষকদের জন্য অত্যন্ত লাভজনক ফসল হিসেবে প্রমাণিত হচ্ছে। মাঠ পর্যায়ে সহায়তা অব্যাহত থাকলে এবার বাম্পার ফলনের আশা করছি।


তরমুজ চাষের এই বিস্তার শুধু কৃষকদের আয় বাড়াচ্ছে না, বরং স্থানীয় অর্থনীতিতেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলছে। বীজতলা তৈরি, পরিচর্যা, পরিবহন ও বিপণনের মতো বিভিন্ন ধাপে তৈরি হচ্ছে নতুন কর্মসংস্থান।


বিশেষজ্ঞদের মতে, সঠিক পরিকল্পনা, কার্যকর বাজার ব্যবস্থাপনা এবং সরকারি সহায়তা অব্যাহত থাকলে খুলনার উপকূলীয় অঞ্চল ভবিষ্যতে দেশের তরমুজ উৎপাদনের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হতে পারে।


সব মিলিয়ে, লবণাক্ততার সীমাবদ্ধতা অতিক্রম করে তরমুজ চাষ এখন খুলনার কৃষকদের জন্য এক নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিয়েছে যা শুধু কৃষি নয়, পুরো অঞ্চলের অর্থনীতিকে বদলে দেওয়ার সক্ষমতা রাখে।