/ খুলনা বিভাগে হাম এর প্রাদুর্ভাব উদ্বেগজনক, ঝুঁকিপূর্ণ জেলা কুষ্টিয়া

খুলনা বিভাগে হাম এর প্রাদুর্ভাব উদ্বেগজনক, ঝুঁকিপূর্ণ জেলা কুষ্টিয়া

২৪ ঘণ্টায় আরও এক জনের মৃত্যু, নতুন
শনাক্ত ৫৬, আজ থেকে জরুরি টিকাদান

স্টাফ রিপোর্টার : খুলনা বিভাগজুড়ে হামের প্রাদুর্ভাব ক্রমেই উদ্বেগজনক রূপ নিচ্ছে। প্রতিদিন বাড়ছে সন্দেহভাজন রোগীর সংখ্যা। সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় আরও ৫৬ জন নতুন রোগী শনাক্ত হওয়ায় মোট সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৯৯ জনে। একই সময়ে একজনের মৃত্যু হওয়ায় মৃতের সংখ্যা বেড়ে হয়েছে ২ এ। যা জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের নতুন করে শঙ্কিত করে তুলেছে।


দেশে হামের সংক্রমণ বৃদ্ধি পাওয়ায় সরকারের উদ্যোগে আজ রবিবার সকাল ৯টা থেকে প্রথম ধাপে ১৮টি জেলার ৩০টি উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ উপজেলায় জরুরি হাম-রুবেলা টিকাদান ক্যাম্পেইন শুরু হচ্ছে। এই কর্মসূচির আওতায় ৬ মাস থেকে ৫ বছরের কম বয়সী (৪ বছর ১১ মাস ২৯ দিন পর্যন্ত) সকল শিশুকে ১ ডোজ হাম-রুবেলা টিকা প্রদান করা হবে। পরবর্তীতে দেশের অবশিষ্ট জেলা ও সিটি করপোরেশন এলাকাতেও পর্যায়ক্রমে এই টিকাদান কার্যক্রম সম্প্রসারণ করা হবে। খুলনা বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক ডা. মুজিবুর রহমান এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।


গতকাল শনিবার দেওয়া স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, শুক্রবার যেখানে মোট সন্দেহভাজন রোগী ছিল ২৪৩ জন, সেখানে একদিনের ব্যবধানে শনিবার ৫৬ জন যুক্ত হয়েছে। নতুন শনাক্তের সংখ্যাও ৪৩ থেকে বেড়ে ৫৬ এ পৌঁছেছে যা সংক্রমণের ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতাকে স্পষ্ট করছে।


জেলাভিত্তিক চিত্রে সবচেয়ে ঝুঁকিতে রয়েছে কুষ্টিয়া। জেলাটিতে মোট সন্দেহভাজন রোগীর সংখ্যা ১০৩ জন, যা বিভাগের সর্বোচ্চ। গত ২৪ ঘণ্টায় এখানে নতুন করে ১২ জন শনাক্ত হয়েছে এবং মোট বৃদ্ধি হয়েছে ১৮ জন। বিভাগের সর্বশেষ মৃত্যুর ঘটনাও এই জেলাতেই ঘটেছে।
কুষ্টিয়া মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, শুক্রবার দিবাগত রাত ১২টায় চিকিৎসাধীন অবস্থায় আইজা নামে সাড়ে ৫ মাস বয়সী এক কন্যাশিশুর মৃত্যু হয়। শিশুটি শহরের রেনউইক মোড় এলাকার বাসিন্দা। হাসপাতালের উপ-পরিচালক ডা. এইচ এম আনোয়ারুল ইসলাম জানান, চারদিন ধরে চিকিৎসাধীন থাকার পর শিশুটির মৃত্যু হয়। এ নিয়ে জেলায় হামের উপসর্গে মৃতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৩ জনে, যদিও সব ক্ষেত্রে নমুনা সংগ্রহ সম্ভব হয়নি।


হাসপাতালে রোগীর চাপ বাড়তে থাকায় হামের রোগীদের জন্য আলাদা কর্নার খোলা হলেও শয্যা সংকট দেখা দিয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে সাধারণ শিশু ওয়ার্ডেই চিকিৎসা দিতে হচ্ছে। জেলা সিভিল সার্জন অফিস সূত্রে জানা গেছে, এ পর্যন্ত তিন শতাধিক শিশু হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে, যার মধ্যে ৭৫ জন ইতোমধ্যে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছে।


কুষ্টিয়ার পাশাপাশি আরও কয়েকটি জেলায় সংক্রমণ দ্রুত বাড়ছে। যশোরে মোট ৫৯ জনের মধ্যে নতুন ৫ জন, খুলনা সিটি করপোরেশন এলাকায় মোট ৫৩ জনের মধ্যে নতুন ৬ জন, ঝিনাইদহে ১৮ জনের মধ্যে নতুন ১২ জন শনাক্ত হয়েছে। এছাড়া নড়াইলে নতুন ৭ জনসহ মোট ১২ জন এবং সাতক্ষীরাতে ১৬ জনের মধ্যে নতুন ১৩ জন রোগী পাওয়া গেছে।


অন্যদিকে কিছু জেলায় সংক্রমণ তুলনামূলক কম থাকলেও নতুন রোগী শনাক্ত হচ্ছে। মাগুরায় মোট ১৭ জনের মধ্যে নতুন ৫ জন, চুয়াডাঙ্গায় মোট ৬ জনের মধ্যে নতুন ৩ জন, বাগেরহাটে মোট ৬ জনের মধ্যে নতুন ২ জন, মেহেরপুরে মোট ৪ জনের মধ্যে নতুন ২ জন এবং খুলনা জেলায় মোট ৫ জন সন্দেহভাজন রোগী রয়েছে।


তথ্য বিশ্লেষণে স্পষ্ট, সংক্রমণ ধীরে ধীরে বিস্তৃত হচ্ছে এবং নতুন নতুন জেলায় ছড়িয়ে পড়ছে। যদিও মৃত্যুর সংখ্যা এখনো সীমিত, তবুও নমুনা সংগ্রহে সীমাবদ্ধতা এবং দ্রুত সংক্রমণ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে।


খুলনা বিভাগের স্বাস্থ্য পরিচালক ডা. মুজিবুর রহমান বলেন, হাম অত্যন্ত সংক্রামক একটি রোগ, যা বিশেষ করে শিশুদের মধ্যে দ্রুত ছড়ায়। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় টিকাদান কর্মসূচি জোরদার, দ্রুত রোগী শনাক্তকরণ এবং জনসচেতনতা বাড়ানো জরুরি।


সব মিলিয়ে খুলনা বিভাগে হামের এই বিস্তার এখন স্পষ্ট একটি সতর্ক সংকেত। বিশেষ করে কুষ্টিয়া, যশোর ও খুলনা সিটি করপোরেশন এলাকায় পরিস্থিতি বেশি ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে। দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে এই প্রাদুর্ভাব আরও বড় আকার ধারণ করতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।