এম মুর্শেদ: তিন বছর পর আবারো খুলনায় চালু হতে যাচ্ছে নগর পরিবহন (টাউন সার্ভিস), যা স্থানীয়ভাবে মুড়ির টিন নামে পরিচিত। দীর্ঘদিনের জনদাবি, সামাজিক সংগঠনগুলোর আন্দোলন এবং প্রশাসনিক তৎপরতার ফলেই এ উদ্যোগ বাস্তবায়নের পথে। প্রাথমিকভাবে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্পোরেশনের (বিআরটিসি) দুটি বাস দিয়ে অক্টোবর মাসেই এ সেবা চালু করবে বলে নিশ্চিত করেছেন খুলনা বিভাগীয় কমিশনার মোঃ ফিরোজ আহমেদ।
খুলনার নি¤œ ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষ, বিশেষ করে স্কুল-কলেজ-মাদ্রাসার শিক্ষার্থী, শ্রমজীবী ও কর্মজীবীরা বহু বছর ধরেই স্বল্পমূল্যে নিরাপদ ও কার্যকর গণপরিবহন সুবিধার দাবি জানিয়ে আসছিলেন। বর্তমানে নগরীর যাতায়াতব্যবস্থা প্রায় পুরোপুরি নির্ভর করছে ইজিবাইক, মাহেন্দ্রা ও সিএনজি অটোরিকশার ওপর। এসব পরিবহনের ভাড়া তুলনামূলক বেশি, আবার যানজট ও নিরাপত্তাহীনতার কারণে সাধারণ মানুষ ভোগান্তিতে পড়ছে। এ অবস্থায় নগর পরিবহন চালু হলে স্বল্প আয়ের মানুষের জন্য তা হবে আশীর্বাদস্বরূপ।
গত কয়েক বছরে খুলনার নগর পরিবহন কার্যত বন্ধ থাকায় শহরের দরিদ্র ও মধ্যবিত্ত মানুষ দৈনন্দিন যাতায়াতে সমস্যার মুখে পড়েছে। ২০২২ সালের ১ আগস্ট রূপসা থেকে ফুলতলা পর্যন্ত টাউন সার্ভিস পুনরায় চালু করা হয়েছিল, তবে ইজিবাইক, মাহেন্দ্রা, সিএনজি অটোরিকশা চালকদের অসহযোগিতা, যাত্রী সংকট, অব্যবস্থাপনা এবং অন্যান্য পরিবহন মাধ্যমের প্রতিযোগিতার কারণে তা দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। এর ফলে বাসগুলো অন্যান্য রুটে সরিয়ে নেওয়া হয়।
২০২৪ সালের নভেম্বরে দৈনিক পূর্বাঞ্চলে প্রকাশিত সময়ের দাবি: নগর পরিবহন উন্নত যাত্রীসেবা নিয়ে আবার ফিরে আসুক শিরোনামের প্রতিবেদনে নতুন করে আলোচনায় আসে নগর পরিবহন পুনরায় চালুর বিষয়টি। এ ছাড়া খুলনা মেট্রোপলিটন সড়ক নিরাপত্তা কমিটির বৈঠকেও বিষয়টি আলোচিত হয়।
নগরবাসীর দাবী ও সামাজিক সংগঠনগুলোর অনুরোধের প্রেক্ষিতে ১৬ সেপ্টেম্বর খুলনা বিভাগীয় কমিশনারের সম্মেলন কক্ষে একটি অংশীজন সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্পোরেশন (বিআরটিসি) বরাদ্দকৃত দুইটি বাসের রুট চূড়ান্ত করা হয়। এছাড়া বিবিধ বিষয়ও আলোচিত হয়।
সভায় সরকারি বিভিন্ন দপ্তরের উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তাসহ নাগরিক সমাজ, পরিবহন মালিক-শ্রমিক, সাংবাদিক, শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও ব্যবসায়ীরা উপস্থিত ছিলেন। উপস্থিত ছিলেন রেঞ্জ ডিআইজি খুলনা রেঞ্জ, খুলনা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান, খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশের পুলিশ কমিশনার, খুলনার জেলা প্রশাসক, খুলনা সিটি কর্পোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা, সড়ক ও জনপথ (সওজ) ও এলজিইডির অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী, খুলনা প্রেস ক্লাবের সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক, সরকারি কলেজ ও মাদ্রাসার শিক্ষক প্রতিনিধি, বিআরটিসি খুলনা বাস ডিপোর ইউনিট প্রধান, খুলনা জেলা বাস-মিনিবাস-মাইক্রোবাস মালিক সমিতি, ট্রাক মালিক সমিতিসহ অন্যান্য পরিবহন খাতের প্রতিনিধি।তবে থ্রি হুইলার মালিক ইউনিয়নের সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক সভায় উপস্থিত ছিলেন না। সভায় নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা ও নিরাপদ সড়ক চাই খুলনা মহানগর শাখার নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন। সিনিয়র সহকারী কমিশনার সুমাইয়া সুলতানা এ্যানি সভার সমন্বয় করেন।
সূত্র জানায়, ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা অর্জনের পর খুলনা শহরে ৬০টি বাস নিয়ে নগর পরিবহন সেবা চালু হয়, যা শহরের মানুষকে সাশ্রয়ী ও কার্যকর গণপরিবহন সুবিধা প্রদান করত। তবে সময়ের সাথে সাথে অবহেলা, পরিকল্পনার অভাব এবং আধুনিকীকরণের ঘাটতিতে সেই সেবা এক সময় ধ্বংস হয়ে যায়। ২০১৭ সাল নাগাদ নগর পরিবহনের ৫৫টি বাস চলাচলের অযোগ্য হয়ে পড়ে। পরের বছরই সম্প‚র্ণ পরিবহন সেবা বন্ধ হয়ে যায়, যা শহরের বাসিন্দাদের জন্য ছিল এক বিশাল ধাক্কা। ২০১৯ সালে খুলনা মোটরবাস মালিক সমিতি উদ্যোগ নেয় এবং ৪টি বাস চালু করে। কিন্তু ইজিবাইক, মাহেন্দ্রা, ও সিএনজি চালকদের প্রভাব এবং যাত্রী সংকটের কারণে এই পরিবহন সেবা স্থায়ী হতে পারেনি। করোনা মহামারির আগেই এসব বাস চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। নগর পরিবহন সেবা ফের চালুর দাবিতে বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনসহ নিরাপদ সড়ক চাই (নিসচা)-এর আন্দোলনের ফলে ২০২২ সালের ১ আগস্ট রূপসা থেকে ফুলতলা পর্যন্ত বাস চলাচল শুরু হয়। এ উদ্যোগে যাত্রীদের মধ্যে স্বস্তি ফিরেছিল এবং পরিবহন শ্রমিকদের জন্য নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছিল। কিন্তু যাত্রীদের ধৈর্যহীনতা ও অন্যান্য পরিবহন মাধ্যমের প্রতিযোগিতার কারণে সেবাটি আবার বন্ধ হয়ে যায়।
১৯৮০ সালের দিকে খুলনার নগর পরিবহন বেশ কয়েকটি রুটে সেবা দিত। সে সময় এটি ছিল অন্যতম জনপ্রিয় গণপরিবহন ব্যবস্থা।
১৯৯৫-২০০০ সালের দিকে খুলনার নগর পরিবহন সেবাটি বেশ কার্যকর ছিল এবং শহরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ রুটে চলাচল করত। রুটগুলোতে নগর পরিবহন কার্যকরভাবে যাত্রী পরিবহন করত। শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ ভাড়ার ব্যবস্থা ছিল, যা ছিল ৫-৭ টাকা। সাধারণ যাত্রীদের জন্য ভাড়া ছিল রুটভেদে ১০-১৫ টাকার মধ্যে। এই পরিষেবা কম খরচে যাত্রী পরিবহনের জন্য বেশ জনপ্রিয় ছিল, বিশেষ করে কর্মজীবী ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে।এতে কিছুদিনের জন্য যাত্রী স্বস্তি পায়, পরিবহন শ্রমিকদের জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টিও হয়। তবে ইজিবাইক, মাহেন্দ্রা, সিএনজি অটোরিকশার আধিপত্য ,যাত্রীদের ধৈর্যহীনতা, অন্যান্য যানবাহনের প্রতিযোগিতা এবং সঠিক পরিকল্পনার অভাবে সেবাটি আবার বন্ধ হয়ে যায়।
নগর পরিবহন বন্ধ থাকায় দরিদ্র জনগোষ্ঠীর দৈনন্দিন জীবনযাত্রায় ব্যাপক প্রভাব পড়েছে। বিশেষত যারা কম খরচে কাজের জায়গায় বা বাজারে যাতায়াত করতেন, তারা এখন অতিরিক্ত খরচ ও দীর্ঘ সময় ব্যয় করে বিকল্প যানবাহন ব্যবহার করতে বাধ্য হচ্ছেন। শিক্ষার্থীরা কম খরচে স্কুল ও কলেজে যাতায়াত করতে পারছে না। নগরবাসীকে চড়া ভাড়ার ইজিবাইক, মাহেন্দ্রা ও সিএনজি অটোরিকশির ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে, যা তাদের দৈনন্দিন খরচ বাড়াচ্ছে।
নিরাপদ সড়ক চাই, খুলনা মহানগর শাখার সাধারণ সম্পাদক মাহবুবুর রহমান মুন্না বলেন, খুলনায় আবারো চালু হতে যাচ্ছে নগর পরিবহন। দীর্ঘদিন আমরা দাবি জানিয়ে আসছিলাম বিআরটিসির পরিবহন দিয়ে সার্ভিসটি চালুর জন্য। অবশেষে খুলনা বিভাগীয় কমিশনার নগরবাসীর চাহিদার কথা মাথায় রেখে অক্টোবরের মধ্যেই প্রাথমিক পর্যায়ে ২টি বিআরটিসির পরিবহন দিয়ে নগর পরিবহন সেবাটি চালুর সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। এজন্য আমরা আন্তরিক ধন্যবাদ জানাই। একই সঙ্গে আমাদের দাবি রূপসা-ফুলতলা, রূপসা ব্রিজ-জিরো পয়েন্ট-বিকেএসপি আটরা, ডুমুরিয়া-গল্লামারী-রেল স্টেশন, ফেরিঘাট-জোড়াগেট-পলিটেকনিক কলেজ-মহসীন কলেজ-পিপলস মিলস্-নতুন রাস্তা, শিববাড়ী-সোনাডাঙ্গা-বয়রা-নতুন রাস্তা, রূপসা ব্রিজ-লবণচরা-শিপইয়ার্ড-জজ কোর্ট এসব রুট অনুসরণ করে যেন নগর পরিবহন চলাচল করে এমনটি দাবি জানাচ্ছি।
খুলনা নাগরিক সমাজ সদস্য সচিব অ্যাডঃ মোঃ বাবুল হাওলাদার, বলেন, দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা খুলনা মহানগরীর নগর পরিবহন (টাউন সার্ভিস) পুনরায় চালুর উদ্যোগ গ্রহণ করায় আমরা কৃতজ্ঞতা জানাই খুলনা বিভাগীয় কমিশনার ও কেসিসি প্রশাসক মোঃ ফিরোজ সরকারকে। বিগত সরকারের আমলে কতিপয় জনপ্রতিনিধির ইন্ধনে গড়ে ওঠা অবৈধ সিন্ডিকেট ৫৫টি বাসের সমন্বয়ে চলমান নগর পরিবহন বন্ধ করে দেয়। সরাসরি আর্থিকভাবে লাভবান হওয়ার জন্যই গণবিরোধী এ সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করা হয়েছিল। বর্তমানে বিআরটিসির তত্ত¡াবধানে দুটি বাস দিয়ে টাউন সার্ভিস চালু হতে যাচ্ছে এটি নি¤œ আয়ের মানুষ ও শিক্ষার্থীদের যাতায়াতে স্বস্তি দেবে। তবে মহানগরের আয়তন ও জনসংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় এখন অন্তত ১০০ বাস চালু সময়ের দাবি। আমরা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি এবং এ উদ্যোগকে বাধাগ্রস্ত করার সম্ভাব্য ষড়যন্ত্র প্রতিহত করতে নগরবাসীকে ঐক্যবদ্ধ থাকার আহŸান জানাচ্ছি।
আমরা বৃহত্তর খুলনাবাসীর প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক রোটাঃ সরদার আবু তাহের বলেন, দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা খুলনা নগর পরিবহন পুনরায় চালুর উদ্যোগ গ্রহণ করায় আমরা বৃহত্তর খুলনাবাসীর পক্ষ থেকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানাচ্ছি বিভাগীয় কমিশনার ও কেসিসি প্রশাসক মোঃ ফিরোজ সরকারকে।
স্বল্প আয়ের মানুষ ও শিক্ষার্থীদের কল্যাণে এবং যানজট নিরসনে এই উদ্যোগ সাধারণ মানুষের মধ্যে আনন্দের ঢেউ তুলেছে। আমরা এই উদ্যোগের সর্বাত্মক সফলতা কামনা করছি। খুলনার নগর পরিবহন দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার ফলে যাত্রী, শিক্ষার্থী ও শ্রমিকরা দৈনন্দিন যাতায়াতে সমস্যার মুখোমুখি হয়েছিল। কিন্তু স¤প্রতি সরকারি উদ্যোগ ও নাগরিক সমাজের দাবীর প্রেক্ষিতে প্রাথমিকভাবে দুইটি বিআরটিসির বাস দিয়ে টাউন সার্ভিস পুনরায় চালু করা হচ্ছে। এটি শুধু নগরবাসীর সুবিধার জন্য নয়, শহরের টেকসই পরিবহন ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবেও বিবেচিত হচ্ছে।