উপকূলের নারী শ্রমিকদের
বঞ্চনার যেন শেষ নেই
এম. মুর্শেদ ও শিপন ভূইয়া : মাঠে ধান রোপণ, আগাছা পরিষ্কার কিংবা ফসল কাটার মতো কঠিন কৃষিকাজে পুরুষদের সঙ্গে সমানতালে কাজ করেন তারা। কিন্তু দিনের শেষে মজুরির খামে থাকে স্পষ্ট বৈষম্য, পুরুষ শ্রমিকদের তুলনায় কম পারিশ্রমিক পান নারী শ্রমিকরা। খুলনার উপকূলীয় উপজেলা কয়রায় কৃষিক্ষেত্রে কর্মরত নারীদের জীবনে এ বৈষম্য বহুদিনের বাস্তবতা।
আন্তর্জাতিক নারী দিবসকে সামনে রেখে উপকূলের নারীদের জীবনযাত্রা নিয়ে মাঠপর্যায়ে খোঁজ নিতে গিয়ে উঠে এসেছে এই চিত্র। কয়রা উপজেলার ৩ নম্বর কয়রা ইউনিয়নের ২ নম্বর ওয়ার্ডের চৌরাস্তা মোড় সংলগ্ন একটি আমন ধানের জমিতে আগাছা পরিষ্কারের কাজ করছিলেন পুষ্প মণ্ডল ও দিপালি ঘরামি। জমির মালিক শহিদুল ইসলামের জমিতে কাজ করতে করতে তারা জানান, প্রতিদিন ভোর থেকে টানা আট ঘণ্টা মাঠে কাজ করলেও পুরুষ শ্রমিকদের মতো মজুরি পান না।পুষ্প মণ্ডল বলেন, আমরা পুরুষদের মতোই কাজ করি। একই সময় মাঠে থাকি, একই কাজ করি। কিন্তু দিনের শেষে পুরুষরা যেখানে ৪০০ টাকা পায়, আমরা পাই ৩০০ টাকা। একই কথা বলেন দিপালি ঘরামি। তার ভাষ্য, এই মজুরি বৈষম্য নতুন কিছু নয় বহু বছর ধরেই এমনটা চলে আসছে। কেন এমন বৈষম্য-তার সঠিক কারণ তারা জানেন না। তবে সংসারের চাহিদা মেটাতে বাধ্য হয়ে কম মজুরিতেই কাজ করে যেতে হচ্ছে।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, উপকূলীয় এলাকায় কৃষিকাজে নারীদের অংশগ্রহণ অনেক বেশি। ধান রোপণ, আগাছা পরিষ্কার, ফসল কাটা-বিভিন্ন কাজেই নিয়মিত শ্রম দেন নারীরা। কিন্তু মজুরির ক্ষেত্রে নারী শ্রমিকদের জন্য আলাদা হার যেন অলিখিত নিয়মে পরিণত হয়েছে।
উপকূলীয় অঞ্চলে জীবনযাত্রার কও নারীদের জন্য তুলনামূলক বেশি কঠিন। প্রাকৃতিক দুর্যোগ, নদীভাঙন ও লবণাক্ততার প্রভাবের সঙ্গে লড়াই করে টিকে থাকতে হয় এখানকার মানুষকে। এসব সংকটে পুরুষদের পাশাপাশি নারীরাও সমানভাবে শ্রম দেন। তবে ঘরের কাজ, সন্তান লালন-পালন এবং পরিবারের দেখাশোনার বড় অংশের দায়িত্বও তাদেরই কাঁধে থাকে।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, পানি সংগ্রহের মতো মৌলিক কাজেও নারীদেরই বেশি ক করতে হয়। অনেক গ্রামে নিরাপদ পানির উৎস দূরে হওয়ায় কিশোরী ও নারীদের দূর থেকে টিউবওয়েল বা পুকুরের পানি আনতে যেতে হয়। এতে পথে নানা ধরনের ঝুঁকি ও হয়রানির মুখেও পড়তে হয় তাদের।
সম্মিলিত নারী অধিকার সুরক্ষা ফোরামের সদস্যসচিব সুতপা দেবজ্ঞ বলেন, নারীর অধিকার নিয়ে অনেক আলোচনা হলেও বাস্তবে শ্রমজীবী নারীদের জীবনে তেমন পরিবর্তন আসেনি। তার মতে, ভুক্তভোগী নারীদেরই নিজেদের অধিকার আদায়ে আরও সোচ্চার হতে হবে। তিনি বলেন, যতক্ষণ পর্যন্ত শ্রমজীবী নারীরা সংগঠিত হয়ে দাবি তুলতে না পারবেন, ততক্ষণ এই বৈষম্য দূর করা কঠিন। শুধু সংগঠন বা এনজিওর প্রতিবাদে দীর্ঘস্থায়ী পরিবর্তন আসে না।
বাংলাদেশ উইমেন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের খুলনা বিভাগীয় প্রধান অ্যাডভোকেট শামীমা সুলতানা শিলু বলেন, প্রতি বছর নারী দিবস পালিত হলেও বাস্তবে সমাজে নারীদের প্রতি দৃভিঙ্গির পরিবর্তন খুব ধীরে হচ্ছে। তার মতে, পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতার কারণেই অনেক ক্ষেত্রে নারীরা এখনও বঞ্চনার শিকার হচ্ছেন। কৃষিক্ষেত্রে নারী শ্রমিকদের মজুরি বৈষম্য তার বড় উদাহরণ।তিনি আরও জানান, খুলনার দাকোপ, কয়রা ও পাইকগাছা উপজেলায় তরমুজ ক্ষেতসহ বিভিন্ন কৃষি কাজে নিয়োজিত নারী শ্রমিকরা আরও বেশি বঞ্চনার শিকার হন। অনেক ক্ষেত্রে তাদের কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তার বিষয়টিও উপেক্ষিত থাকে।
স্থানীয় ইউপি সদস্য সোহরাব হোসেন বলেন, উপকূলীয় এলাকায় কঠিন পরিশ্রমের কাজেও নারীরা পুরুষদের সঙ্গে সমানভাবে অংশ নেন। কিন্তু মজুরি নির্ধারণের ক্ষেত্রে পুরনো ধারণা এখনও কাজ করছে। অনেকের মনে এখনও ধারণা আছে-নারী শ্রমিক মানেই কম মজুরি। এই মানসিকতা বদলাতে হবে। জমির মালিক ও মহাজনদের সচেতন হওয়া জরুরি, বলেন তিনি।
বেসরকারি সংস্থা জাগ্রত যুব সংঘ (জেজেএস)এর সমন্বয়কারী (পরিকল্পনা) নাজমুল হুদা বলেন, উপকূলীয় এলাকায় কর্মসংস্থানের সুযোগ সীমিত হওয়ায় নারী শ্রমিকরা সহজে প্রতিবাদ করতে পারেন না। তার মতে, বিকল্প আয়ের সুযোগ সৃি এবং নারীদের অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করার উদ্যোগ নেওয়া গেলে তাদের অবস্থার উন্নতি সম্ভব।
আন্তর্জাতিক নারী দিবস সামনে এলেই নারী অধিকার ও সমতার নানা আলোচনা সামনে আসে। কিন্তু উপকূলের মাঠে কাজ করা নারী শ্রমিকদের বাস্তবতা বলছে,সমতার পথ এখনও অনেক দীর্ঘ। সমান শ্রমের ন্যায্য মূল্য পাওয়ার দাবিতে তাদের নীরব লড়াই এখনও চলছেই।