ঘন ঘন ভূমিকম্পে কাঁপছে বাংলাদেশ।
চলতি মাসের প্রথম ২৭ দিনেই রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ১০ দফা ভূকম্পন অনুভূত হয়েছে। অধিকাংশ কম্পনের মাত্রা মৃদু থেকে মাঝারি হলেও জনমনে আতঙ্ক বাড়ছে। যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা (ইউএসজিএস) ও ইউরোপীয়-ভূমধ্যসাগরীয় সিসমোলজিক্যাল সেন্টারের (ইএমএসসি) তথ্যমতে, এ মাসে ২৭ দিনেই ভূমিকম্প হয়েছে ১০ বার। শুক্রবার (২৭ ফেব্রুয়ারি) দুপুর ১টা ৫২ মিনিট ২৪ সেকেন্ডে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় ভূমিকম্প অনুভূত হয়। এর উৎপত্তিস্থল ছিল সাতক্ষীরার আশাশুনি উপজেলা। রিখটার স্কেলে কম্পনের মাত্রা ছিল ৫ দশমিক ৩। এর আগের দিন বৃহস্পতিবার দুপুর ১২টা ৪ মিনিট ৫ সেকেন্ডে আরেকটি ভূমিকম্পে কেঁপে ওঠে দেশ। বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদফতর জানায়, এর মাত্রা ছিল ৪ দশমিক ৬ এবং উৎপত্তিস্থল ভারতের সিকিম অঞ্চলে, যা ঢাকা থেকে প্রায় ৪৫৫ কিলোমিটার উত্তর-পশ্চিমে। বুধবারও (২৫ ফেব্রুয়ারি) রাত ১০টা ৫৪ মিনিটে মিয়ানমার উৎপত্তিস্থল থেকে সৃষ্ট ভূমিকম্প ঢাকাসহ বিভিন্ন স্থানে অনুভূত হয়। চলতি মাসের প্রথম দিনও ভূকম্পন অনুভূত হয়। সেদিন ঢাকাসহ আশপাশের এলাকায় মৃদু ভূমিকম্প হয়। রিখটার স্কেলে যার মাত্রা ছিল ৩। এর উৎপত্তিস্থল ছিল সিলেট শহর থেকে পূর্ব-দক্ষিণ-পূর্বে। ৩ ফেব্রুয়ারি রাতে পরপর দুটি ভূমিকম্পে কেঁপে ওঠে দেশের বিভিন্ন এলাকা। ওই দুই কম্পনের মাত্রা ছিল যথাক্রমে ৫ দশমিক ৯ ও ৫ দশমিক ২ যার উৎপত্তিস্থল ছিল মিয়ানমার। একই দিন ভোরে সাতক্ষীরার কলারোয়া উপজেলাকেন্দ্রিক ৪ দশমিক ১ মাত্রার আরেকটি ভূমিকম্প হয়। এ ছাড়া ৯ ও ১০ ফেব্রুয়ারি সিলেটের গোয়াইনঘাট উপজেলায় দুটি কম্পন অনুভূত হয় (মাত্রা ৩ দশমিক ৩ ও ৪)। ১৯ ফেব্রুয়ারি সুনামগঞ্জের ছাতক উপজেলাকেন্দ্রিক ৪ দশমিক ১ মাত্রার ভূমিকম্পও রেকর্ড করা হয়। ঘন ঘন ভূমিকম্পের প্রেক্ষাপটে বিশেষজ্ঞরা বড় ধরনের দুর্যোগের ঝুঁকি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। ভূতত্ত্ববিদদের মতে, বাংলাদেশ ভূমিকম্পপ্রবণ অঞ্চলে অবস্থিত হওয়ায় ভবন নির্মাণে বিধিমালা মেনে চলা এবং প্রস্তুতি জোরদার করা জরুরি। ভূমিকম্প এমনই এক প্রাকৃতিক দুর্যোগ যার আগাম কোন সংকেত দেয়া যায় না। এ কারণে এই দুর্যোগে ক্ষয়লয় অনেক বেশী হয়ে থাকে। ভ’মিকম্প তার সক্রিয় বলয়ের মধ্যে যে কোন সময় আঘাত হানতে পারে। আর বাংলাদেশ যেহেতু সক্রিয় বলয়ে মধ্যে রয়েছে সে কারণে এই মারাত্মক এবং বিধ্বংসী দুর্যোগের জন্য যথাযথ প্রস্তুতিই ক্ষয়ক্ষতি কমানোর উপায় হতে পারে। অন্যান্য দুর্যোগ যেমন ঘূর্ণিঝড়, বন্যা ইত্যাদি দীর্ঘসময় ধরে আঘাত হেনে ব্যাপক ক্ষয়লয়ের কারণ হয়। ভূমিকম্প কিন্তু দীর্ঘ সময়ের দুর্যোগ নয়। অল্প কয়েক সেকেন্ড বা কয়েক মিনিটের কম্পনে বিধ্বংসী সব কান্ড ঘটাতে সক্ষম ভূমিকম্প। তাই বিশ্বব্যাপী ভূমিকম্পকে বিধ্বংসী এবং ভয়ঙ্কর দুর্যোগ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। বাংলাদেশে সাধারণত বন্যা, ঘূর্ণিঝড়ই দুর্যোগ হিসেবে বেশী পরিচিত। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে ভূমিকম্পের আশংকা খুবই বেশী বেশী করে অনুভূত হচ্ছে। বিশেষ করে বারেবাওে মৃদু এবং মাঝারী মাত্রার ঝাঁকুনিতে কেঁপে উঠছে দেশ। বারেবারে অল্প কাপুনি বা ঝাঁকুনি বড় ধরণের কাপুনি ঝাঁকুনির ইঙ্গিত দেয় বলে মনে করেন ভূতত্ত্ববিদগণ। বাংলাদেশ যেহেতু সক্রিয় ভূমিকম্প বলয়ের মধ্যে অবস্থান করছে সে কারণে ভূমিকম্প দুর্যোগ নিয়ে আমাদের চিন্তা এখন বাড়ছেই। আমরা মনে করি সরকারের দুর্যোগ মন্ত্রণালয়কে ভূমিকম্পের আশংকর বিষয়টি মাথায় রেখে প্রয়োজনীয় আত্মরক্ষামুলক ব্যবস্থা গ্রহণের কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত হবে। বিশেষ করে দেশের বড় বড় শহরগুলিতে যেখানে প্রচুর অপরিকল্পিত অবকাঠামো এবং বিপুল জনঘনত্বের আবাসন রয়েছে সেই শহরগুলিতে এই ব্যবস্থা দ্রুতই শুরু করা প্রয়োজন বলে মনে করি। সেক্ষেত্রে ঢাকা এবং চট্টগ্রামের নাম আগে আসে। এর পরে ভূমিকম্প বলয়ের অপরাপর জেলাসমূহ বিশেষ করে দেশের পূর্বাঞ্চল এবং মধ্যাঞ্চলের জেলাগুলিকে বেশী গুরুত্ব দেয়া উচিত। দেশের দক্ষিণাঞ্চল অপেক্ষাকৃত কম ঝুঁকিপূর্ণ বিবেচনা করা হলেও এখানেও প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি প্রয়োজন। আমরা জানি বিশ্বে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় বাংলাদেশের সক্ষমতার বিষয়ে সুনাম থাকলেও ভূমিকম্পের প্রস্তুতি আমাদের প্রায় শূণ্য। এ কারণে আমাদের সুপারিশ হলো ভূমিকম্পকে এখন গুরুত্ব দিতে হবে। কারণ বাংলাদেশের অপরিকল্পিত নগরায়ন এবং জনসংখ্যার চাপ বাংলাদেশের কোন অঞ্চলে মাঝারী মাত্রার কয়েক সেকেন্ডে ভূমিকম্পেই তীব্রমাত্রার ভূমিকম্পের মত ক্ষয়ক্ষতির কারণ হতে পারে বলে অনুমান করা হয়। ঢাকা এবং চট্টগ্রামের মত শহরেতো ভূমিকম্প আঘাত হানলে উদ্ধার কাজ পরিচালনা করাও দুষ্কর হয়ে পড়তে পারে বলে আংশকা করা হয়। এ কারণে সার্বিক দিক বিচার বিবেচনা করে ভূমিকম্পে প্রস্তুতিতে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের উদ্যোগ নেয়া হবে বলে মনে করি।