স্টাফ রিপোর্টার ঃ ভালো কাজ ও উচ্চ বেতনের স্বপ্ন দেখিয়ে সাড়ে ছয়লাখ টাকার বিনিময়ে মালদ্বীপে পাঠানো হয়েছিল খুলনা মহানগরীর সোনাডাঙ্গা এলাকার ইয়াসিন মোল্লাকে। কিন্তু সেখানে গিয়ে কাজ তো দূরের কথা, দুই বেলা ঠিকমতো খাবারও জোটেনি। দীর্ঘ দুই মাস বন্দিদশার মতো অবস্থায় কাটানোর পর নানা চেষ্টা-তদবির করে অবশেষে দেশে ফেরেন তিনি। এখন মানবপাচারের অভিযোগে বিচার চাইছেন। কিন্তু থানায় গেলে মামলা না নিয়ে পাঠানো হয় আদালতে। আদালতেও আইনী বেড়াজালে আটকে আছেন তিনি।
ব্র্যাক মাইগ্রেশন প্রোগ্রাম কর্তৃক বাস্তবায়িত ‘‘ঈড়সনধঃরহম ঐঁসধহ ঞৎধভভরপশরহম ঃযৎড়ঁময ঝঃৎবহমঃযবহরহম ৪চং” চৎড়লবপঃ-এর অধীনে জেলা লিগ্যাল এইড কমিটির সাথে “মানব পাচার ও অনিয়মিত অভিবাসন প্রতিরোধ” বিষয়ক মতবিনিময় সভায় ভুক্তভোগী ইয়াসিন মোল্লা এভাবেই বলছিলেন তার অভিজ্ঞতার কথা।
এসময় প্রধান অতিথির বক্তব্যে খুলনার জেলা লিগ্যাল এইড কমিটির চেয়ারম্যান সিনিয়র জেলা ও দায়রা জজ চাঁদ মোহাম্মদ আব্দুল আলিম আল রাজী বলেন, পাচারকারী ও প্রতারকের শাস্তি নিশ্চিত করা গেলেই নিরাপদ অভিবাসন নিশ্চিত করা সম্ভব। তিনি বলেন, অভিবাসনের সময় সবচেয়ে বেশি প্রতারণার শিকার হচ্ছে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মানুষ। জেলা লিগ্যাল এইড অফিস এই প্রান্তিক জনগোষ্টির পাশে আছে এবং থাকবে।
গতকাল সোমবার বিকেলে খুলনা জেলা জজ আদালতের সম্মেলন কক্ষে এ মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়।
প্রধান আতিথি আরও বলেন, খুলনা, নড়াইল এবং যশোর জেলা থেকে ভারতসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে নারী ও শিশুসহ অভিবাসী কর্মীদের পাচার করা হচ্ছে। কিছু ক্ষেত্রে বিদেশে নেওয়ার পর তাদের শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হতে হচ্ছে এবং অনেক ক্ষেত্রে মুক্তিপণ আদায় করা হচ্ছে। কিছু ভুক্তভোগী প্রতারিত হয়ে নিঃস্ব অবস্থায় দেশে ফিরে আসছেন। প্রতারিত হয়ে দেশে ফেরার পরও অনেকে আইনি জটিলতার কারণে ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। তবে জেলা ও দায়রা জজ আদালত, খুলনা পাচারের শিকার ব্যক্তিদের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে আন্তরিকভাবে কাজ করে যাচ্ছে। ভুক্তভোগীরা জেলা লিগ্যাল এইড কমিটির নিকট অভিযোগ দাখিল করলে প্রয়োজনীয় আইনগত সহায়তা ও ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
অন্যান্যের মধ্যে বক্তৃতা করেন, মহানগর দায়রা জজ মোহাঃ মহিদুজ্জামান, মানব পাচার অপরাধ দমন ট্রাইব্যুনালে বিচারব (জেলা ও দায়রা জজ) বুশরা সাইয়েদা, চীফ মেট্টোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মোঃ ফারুক ইকবাল, চীফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আবু সাঈদ, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মোঃ খায়রুল আনাম, অতিরিক্ত চীফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মোঃ ফারুক আজম, অতিরিক্ত চীফ মেট্টোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট রাকিবুল ইসলাম, সিনিয়র সিভিল জজ, জেলা লিগ্যাল এইড অফিসার মোঃ রশিদুল আলম, মেট্টোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মোঃ আসাদুর জামান, মেট্টোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট ফরিদুজ্জামান, মেট্টোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট ইব্রাহিম খলিল, জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আলতাফ মাহামুদ, জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট অপূর্ব বালা, দৈনিক কালের কণ্ঠের খুলনা ব্যুরো প্রধান এইচ এম আলাউদ্দিন, দৈনিক প্রথম আলোর নিজস্ব প্রতিবেদক উত্তম মন্ডল, ভুক্তভোগী ইয়াসিন মোল্লা এবং তুষার মোল্লা।
এমআরএসসি কো-অর্ডিনেটর অশোক বালার সঞ্চালনায় মতবিনিময় সভায় সভাপতিত্ব করেন খুলনার জেলা লিগ্যাল এইড অফিসার সিনিয়র সিভিল জজ মোঃ রশিদুল আলম। স্বাগত বক্তব্য রাখেন ব্র্যাক ডিস্ট্রিক্ট কো-অর্ডিনেটর শফিকুল ইসলাম।
জেলা লিগ্যাল এইড কমিটির সাথে “মানব পাচার ও অনিয়মিত অভিবাসন প্রতিরোধ” বিষয়ক মতবিনিময় সভায় মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ব্র্যাক মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের রিজিওনাল এমআরএসসি কো-অর্ডিনেটর দেবানন্দ মন্ডল।
ব্র্যাক ১৯৭২ সালের প্রতিষ্ঠাকালীন সময় থেকে দেশে ও দেশের বাইরে নানাবিধ কর্মসূচি বাস্তবায়নের মাধ্যমে মানুষের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে কাজ করে যাচ্ছে। ব্র্যাকের বিভিন্ন কর্মসূচিগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য একটি কর্মসূচি হল মাইগ্রেশন প্রোগ্রাম। ব্র্যাকের এই প্রোগ্রাম ২০০৬ সাল থেকে দেশের অভিবাসনপ্রবণ জেলাসমূহে বিদেশগামী নারী ও পুরুষের মাঝে সঠিক তথ্যের মাধ্যমে নিরাপদ অভিবাসন বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধিমূলক কার্যক্রম, বিদেশ-ফেরতদের পুনরেকত্রীকরণ, প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ, অভিবাসন খাতে অ্যাডভোকেসি ও নানাবিধ সহযোগিতামূলক কার্যক্রম বাস্তবায়ন করে আসছে।
ভুক্তভোগী ইয়াসিন মোল্লা এসময় অভিযোগ করে বলেন, গত ২ নভেম্বর তিনি মালদ্বীপে যান। তার কাছ থেকে ৬ লাখ ৫০ হাজার টাকা নেয় একটি রিক্রুটিং প্রতিষ্ঠান। একইভাবে আরও প্রায় ৪০ জনকে মালদ্বীপে পাঠানো হয়। তবে সেখানে পৌঁছানোর পর কাউকেই নির্ধারিত কোনো কাজ দেওয়া হয়নি।
তিনি জানান, মালদ্বীপে পৌঁছে তাদের একটি নির্দিষ্ট স্থানে রাখা হয়। একসঙ্গে প্রায় ৬২ জন অবস্থান করছিলেন সেখানে। পর্যাপ্ত খাবার দেওয়া হতো না, দুই বেলার বেশি কখনো খাবার জোটেনি। এমনকি দুই মাস পরও তাদের নিচে নামতে দেওয়া হতো না। একপর্যায়ে ইমাম হোসেন নামে আরেক ভুক্তভোগীকে নিয়ে জোর করে নিচে নামেন তিনি। নামাজ আদায়ের পর তারা মালদ্বীপে অবস্থিত বাংলাদেশ হাই কমিশনে গিয়ে অভিযোগ জানান।
হাই কমিশন তাদের অভিযোগ গ্রহণ করে এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে তলব করে। তবে অভিযুক্ত ব্যক্তি উপস্থিত হননি বলে দাবি করেন ভুক্তভোগী। পরে হাই কমিশন থেকে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠানো হয়।
দেশে ফিরে গত ১১ ফেব্রুয়ারি তিনি কুমিল্লায় যান এবং ৫ ফেব্রুয়ারি (দেশে ফেরার পর) খুলনা জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে লিখিত অভিযোগ দেন। পরে আইনজীবীর মাধ্যমে বিষয়টি পুলিশ কমিশনারের দপ্তরে পাঠানো হয়। সেখান থেকে মামলাটি খুলনার সোনাডাঙ্গা থানায় পাঠানো হয়।
ভুক্তভোগীর দাবি, থানায় একটি বৈঠক ডাকা হলেও পরবর্তীতে মামলা প্রক্রিয়া জটিল হয়ে পড়ে। তিনি জানান, থানার ওসি তাকে আদালতে গিয়ে মানবপাচারের মামলা করতে পরামর্শ দেন। কিন্তু আদালতে গিয়েও তিনি মামলা করতে পারেননি।
ইয়াসিন মোল্লা বলেন, “আমাদের কাছ থেকে লাখ লাখ টাকা নিয়ে বিদেশে পাঠানো হয়েছে, কিন্তু কোনো কাজ দেয়নি। আমরা বন্দির মতো ছিলাম। এখন দেশে এসে বিচার চাইছি, কিন্তু নানাভাবে বাধার মুখে পড়ছি।”