অপরিকল্পিত নগরায়ন ভবিষ্যত ঝুঁকি বাড়াচ্ছে #সাধারণ মানুষ প্রস্তুতির করণীয় জানে না #ব্যাপক প্রস্তুতিতে গুরুত্বারোপ #খুলনা উপকূল কম ঝুঁকিতে
ফারুক আহমেদ: ভূমিকম্প প্রস্তুতিতে বাংলাদেশের অবস্থান তলানীতে। ঘূর্ণিঝড় ও বন্যার মত দুর্যোগে বাংলাদেশের প্রস্তুতি বিশ্বে সমাদৃত হলেও ভূমিকম্পে বাংলাদেশ এখনো আতুর ঘরেই রয়েছে বলে মনে করেন দুর্যোগ বিশেষজ্ঞগণ। তাদের মতে, এ কারণে বাংলাদেশে মাঝারী মাত্রার ভূমিকম্পেই খুব উচ্চমাত্রার ভূমিকম্পের প্রভাবের মত ক্ষয়ক্ষতি হওয়ার আশংকা খুবই প্রবল। এমনি বাস্তবতায় জরুরী ভিত্তিতে ভূমিকম্পের মত প্রাণঘাতি দুর্যোগের পূর্ব প্রস্তুতিতে ব্যাপকভিত্তিক কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন জরুরী।
ভৌগলিক কারণে বাংলাদেশকে দুর্যোগের দেশ বলা হয় মূলত বন্যা এবং ঘূর্ণিঝড়ের আধিক্যের কারণে। উত্তরে বিশাল পর্বতমালা হিমালয় এবং দক্ষিণে ভারত মহাসাগরের উপসাগর হিসেবে বঙ্গোপসাগর বাংলাদেশ বন্যা এবং সামুদ্রিক ঘূর্ণিঝড়ের চারণক্ষেত্রে পরিণত করেছে। মূলত ভৌগলিক অবস্থানের এই বিপদাপন্নতাই বেশী গুরুত্ব পাওয়ায় ভূমিকম্পের মত প্রাণঘাতি দুর্যোগের চিন্তা কালে কালে উপেক্ষিত হয়েছে। ফলশ্রুতিতে ভূমিকম্পের প্রস্তুতি কখনোই গুরুত্ব পায়নি। অথচ জাতীয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনায় (২০২১-২০২৫) বলা হয়েছে, বাংলাদেশে যদি বড় মাত্রার ভূমিকম্প হয়, তাহলে সমগ্র দেশে সাড়ে ৬ কোটি ১২ লক্ষ মানুষ বিপদের সম্মুখীন হতে পারে।
বিশেষজ্ঞগণ বলেন, ভূমিকম্পের সবচেয়ে বিপদের বিষয় হলো ভূমিকম্প হঠাৎ করেই সংঘটিত হয়, পূর্বাভাস পাওয়া যায় না। যে কারণে এই ধরণের দুর্যোগে প্রাণহানিসহ ক্ষয়ক্ষতির আশংকা থাকে শতভাগ। বাংলাদেশ শক্তিশালী ভূমিকম্প বলয়ে অবস্থান করা সত্ত্বেও বিপদের গুরুত্ব অনুযায়ী প্রস্তুতি নেই। কিন্তু বাংলাদেশে যে অদূর ভবিষ্যতে বড় ধরণের ভূমিকম্পের আঘাত আসতে পারে তার আশংকা অনেক আগে থেকেই করা হচ্ছে। তারপরেও ভূমিকম্পের সম্ভাব্য ঝুঁকি প্রশমনে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ ও সামাজিক সচেতনতার সৃষ্টির কোন উদ্যোগই লক্ষ্য করা যাচ্ছে না। এর ফলে ভূমিকম্প বলয়ে অবস্থানরত জেলাগুলির বিপুল সংখ্যক জনগোষ্ঠী এক অর্থে উচ্চ ঝুঁকির মধ্যেই অবস্থান করছে।
বিশেষজ্ঞগণ বলছেন, ঢাকাসহ দেশের কিছু অঞ্চল ভূমিকম্পের জন্য উচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছে। কিছু অঞ্চল রয়েছে মধ্যম ঝুঁকিতে এবং অবশিষ্ট অঞ্চল অল্প ঝুঁকিতে অবস্থান করছে। কিন্তু প্রকৃত অর্থে বা সাধারণভাবে পুরো বাংলাদেশই কমবেশী ঝুঁকিতে রয়েছে।
আবহাওয়া অধিদপ্তর বলছে, ভূমিকম্পের উচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছে সিলেট, ময়মনসিংহ এবং রংপুর, ঢাকা, কুমিল্লা ও পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলের কিছু অংশ। এর মধ্যে সিলেট বিভাগের চারটি জেলায় বড় মাত্রার ভূমিকম্পের ঝুঁকিতে রয়েছে। একইভাবে ময়মনসিংহ বিভাগের পাঁচটি জেলাও ভূমিকম্পের ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। ঢাকা বিভাগের মধ্যে টাঙ্গাইল, গাজীপুর, নরসিংদী জেলার অংশ বিশেষ, পুরো কিশোরগঞ্জ জেলা এবং কুমিল্লা বিভাগের মধ্যে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা উচ্চ মাত্রার ভূমিকম্পের ঝুঁকিতে রয়েছে। এ ছাড়া ভূমিকম্পের উচ্চ ঝুঁকিতে আছে খাগড়াছড়ি ও রাঙামাটি জেলার উত্তরাংশ। মাঝারি মাত্রার ভূমিকম্পের ঝুঁকিতে রয়েছে ঢাকা, মানিকগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জ, মুন্সিগঞ্জ, কুমিল্লা, চাঁদপুর, ফেনী, নোয়াখালী, পাবনা, সিরাজগঞ্জ, নওগাঁ, রাজশাহী, নাটোর, চাঁপাইনবাবগঞ্জের অংশ বিশেষ, চট্টগ্রাম,বান্দরবান ও কক্সবাজার জেলা। ভূমিকম্পের কম ঝুঁকিতে রয়েছে দক্ষিণাঞ্চলের পুরো খুলনা ও বরিশাল বিভাগ। বাংলাদেশে ভূমিকম্পের ঝুঁকি বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, কোনো স্থানের ভূকম্পনের জন্য ফল্ট লাইন এবং টেকনিক স্ট্রেস ফিল্ড গভীরভাবে সম্পর্কযুক্ত। সাধারণত, বড় ধরনের ভূকম্পন হয়ে থাকে প্লেটের বাউন্ডারির মধ্যে। যদিও বাংলাদেশ প্লেটের বাউন্ডারির মধ্যে নয়, তথাপি ভূ-প্রাকৃতিক অবস্থান ও বিন্যাসের স্বকীয়তা বাংলাদেশকে ভূমিকম্প বলয়ের আশপাশেই ফেলেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সারা বিশ্ব অনেকগুলো টেকটোনিক প্লেটের মাধ্যমে বিভক্ত হয়ে রয়েছে। যখন এসব প্লেট নড়াচড়া করে তখন যেসব দেশ বা এলাকা সেই প্লেটগুলোর ওপরে অবস্থিত, সেখানে ভূমিকম্প অনুভূত হয়। হিমালয়ের পাদদেশে নেপাল যে টেকটোনিক প্লেটের ওপরে বসে রয়েছে, সেটার ওপরেই রয়েছে ভারতের উত্তর অংশ। আর উত্তরে তিব্বত সাব-প্লেট, ইন্ডিয়ান প্লেট এবং দক্ষিণে বার্মা সাব-প্লেটের সংযোগস্থলে বাংলাদেশের অবস্থান। কোনো স্থানের ভূকম্পনের জন্য ফল্ট লাইন এবং টেকনিক স্ট্রেস ফিল্ড গভীরভাবে সম্পর্কযুক্ত। সাধারণত, বড় ধরনের ভূকম্পন হয়ে থাকে প্লেটের বাউন্ডারির মধ্যে। যদিও বাংলাদেশ প্লেটের বাউন্ডারির মধ্যে নয়, তথাপি ভূ-প্রাকৃতিক অবস্থান ও বিন্যাসের স্বকীয়তা বাংলাদেশকে ভূমিকম্প বলয়ের আশপাশেই ফেলেছে।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের ভূমিকম্প পর্যবেক্ষণ ও গবেষণাকেন্দ্রের হিসাব অনুযায়ী, ২০১৭ সালে বাংলাদেশে এবং কাছাকাছি এলাকায় ২৮টি ভূমিকম্প হয়। ২০২৩ সালে এর সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়ে সংখ্যা দাঁড়ায় ৪১টি এবং গত ২০২৪ সালে দেশে ও আশপাশে ৫৩টি ভূমিকম্প হয়েছে। এটি ছিল আট বৎসরের মধ্যে সর্বোচ্চ। এমতাবস্থায় বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ছোট ও মাঝারি ভূকম্পনের কারণে যে কোনো সময় একটি বড় ভূমিকম্প সংঘটিত হইতে পারে। তাদের মতে, সাত মাত্রার ভূমিকম্পগুলি ফেরত আসার সময় হয়ে গেছে। এই আশঙকা সত্য হলে রাজধানী ঢাকার ৪০ শতাংশ বাড়িঘর ধ্বংস হতে পারে।
মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা ইউএসজিএসের তথ্য মতে, বাংলাদেশ ভূকম্পনের সক্রিয় এলাকায় অবস্থিত। দুর্যোগ সূচক অনুযায়ী, বিশ্বব্যাপী ভূমিকম্পের জন্য সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ ২০টি শহরের মধ্যে রয়েছে ঢাকা। কারণ ঢাকার অতি ঘনবসতি এবং জনঘনত্ব ও অপরিকল্পিত নগরায়ন রাজধানী ঢাকাকে অতি ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে। তাদের মতে ঢাকা ধ্বংসস্তুপে পরিণত হতে মাঝারী বা ৭ মাত্রার ভূমিকম্পই যথেষ্ট। ভূমিকম্প বিশেষজ্ঞগণ আরও বলছেন, বার্মিজ প্লেট ও ইন্ডিয়ান প্লেটের পরস্পরমুখী গতির কারণেই ঘন ঘন এই ধরনের ভূমিকম্প হচ্ছে। এই দুইটি প্লেটের সংযোগস্থলে প্রচুর পরিমাণে শক্তি জমা হয়েছে। যা বের হয়ে আসতে পাওে বড় ধরণের ভূমিকম্প সংঘটনের মাধ্যমে।
উল্লেখ্য, বাংলাদেশে ‘দুর্যোগ আইন’ রয়েছে যা বিশ্বের অনেক উন্নত দেশেও নেই। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় বাংলাদেশে ‘এসওডি’ বা দুর্যোগ বিষয়ে স্থায়ী আদেশাবলী রয়েছে। কেন্দ্র হতে তৃণমূল পর্যন্ত ‘দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা’ কমিটি রয়েছে। এছাড়াও ‘জাতীয় দুর্যোগ পরিকল্পনা’ আছে। এগুলি সবই বাংলাদেশের দুর্যোগ ঘনঘটাকে বিবেচনায় নিয়েই করা হয়েছে। আভিধানিক সব ডক্যুমেন্টে বাংলাদেশ এগিয়ে থাকলেও ভূমিকম্প প্রস্তুতি খুবই উপেক্ষিত। সাধারণ মানুষ ভূমিকম্পের প্রস্তুতিতে কী কী করতে হবে তাও জানে না যা তাদের বিপদের মাত্রা অনেক বাড়িয়ে দিয়েছে।