স্টাফ রিপোর্টারঃ ভাষা আন্দোলন বিশ্বের মুক্তির সংগ্রামের ইতিহাসে এক অনন্য ঘটনা। বস্তুত ভাষা আন্দোলন ছিল পশ্চিম পাকিস্তানি ঔপনিবেশিক শাসন শোষণের বিরুদ্ধে পূর্ববঙ্গের শোষিত জনগণের সুদীর্ঘ সংগ্রামের সংগঠিত সূচনা। এটি ছিল দেশের প্রথম গণতান্ত্রিক ও সাংস্কৃতিক আন্দোলন। সেক্যুলার এই আন্দোলনে পূর্ব বাংলায় জিন্নাহর দ্বিজাতিতত্তে¡র ধ্বংসের বীজ রোপিত হয়। এই আন্দোলনের মধ্যেই ছিল বাঙ্গালী জাতীয়তাবাদী অনুভব।
‘ভাষা আন্দোলনের ইতিহাসগুলির বিবরণ অনুযায়ী বাঙালি লেখকগণ বাংলা রাষ্ট্রভাষার স্বপক্ষে পত্র-পত্রিকায় লিখতে আরম্ভ করেছিলেন ১৯৪৭ সালের জুলাই মাসে এবং এ প্রয়াসের সূচনা ঢাকায় ।
প্রথম পর্যায়ে রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন দানা বাধে কতকগুলি সরকারী প্ররোচনার প্রতিক্রিয়া হিসাবে। ১৯৪৭ সালে তৎকালীন রাজধানী করাচীতে একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এই শিক্ষা সম্মেলনে উর্দুকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা করার জন্যে একটি সর্বসম্মত প্রস্তাব গৃহীত হয়েছে মর্মে সংবাদ এর প্রতিবাদে ঐদিনই দুপুর দুইটার সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা ইন্টারমিডিয়েট কলেজ, জগন্নাথ ইন্টারমিডিয়েট কলেজ ও অন্যান্য কলেজসহ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা এক প্রতিবাদ সভা করে। এতে সভাপতিত্ব করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক তমদ্দুন মজলিশের সম্পাদক আবুল কাসেম। বক্তৃতা করেন মুনীর চৌধুরী, এ.কে.এম আহসান প্রমুখ । প্রস্তাব পাঠ করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র-সংসদের ভিপি ফরিদ আহমদ। রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনে বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে এটাই সর্বপ্রথম সাধারণ ছাত্র সভা। বাংলাদেশের অন্য সকল আন্দোলনের মত ভাষা আন্দোলনের সূতিকাগারও তাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
১৯৪৭ সালের ডিসেম্বরের শেষের দিকে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার সমর্থনে প্রথম রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ গঠন করা হয়। তমদ্দুন মজলিশের অধ্যাপক নূরুল হক ভূঁইয়া এই কমিটির আহবায়ক ছিলেন।
১৯৪৮ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি করাচীতে অনুষ্ঠিত পাকিস্তান গণপরিষদের অধিবেশনে পরিষদ সদস্যদের উর্দু বা ইংরেজিতে বক্তৃতা দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়। পূর্ব পাকিস্তানের কংগ্রেস দলের সদস্য ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত এ প্রস্তাবে সংশোধনী এনে বাংলাকেও পরিষদের অন্যতম ভাষা করার দাবি জানান। তিনি বলেন, পাকিস্তানের ৬ কোটি ৯০ লাখ মানুষের মধ্যে ৪ কোটি ৪০ লাখই পূর্ব পাকিস্তানের,যাদের মাতৃভাষা বাংলা। অধিবেশনে পূর্ব বাঙলার মুখ্যমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দিন সদম্ভে ঘোষণা করে বলেন যে,’পূর্ব বাংলার অধিকাংশ অধিবাসীরই এই মনোভাব যে,একমাত্র উর্দুকেই রাষ্ট্রভাষা রূপে গ্রহণ করা যাইতে পারে’। নাজিমুদ্দিনের এই বক্তব্যের প্রতিবাদে ঢাকাসহ পূর্ব পাকিস্তানের সর্বত্র প্রতিবাদ ও বিক্ষোভ শুরু হয়। এসময় তমদ্দুন মজলিস, গণ আজাদী লীগ, পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগ ও বিভিন্ন ছাত্রাবাসের যৌথ উদ্যোগে ২রা মার্চ ফজলুল হক হলে সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক কর্মীদের এক সভায় সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হয়। রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ ঐদিন এক প্রস্তাবে সারা পূর্ব বাঙলায় ১১ মার্চ সাধারণ ধর্মঘটের একটি সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। ১১ মার্চ সাধারণ ধর্মঘট পালিত হয়। ভোরে পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন হল থেকে ছাত্ররা বের হয়ে আসে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ অন্যান্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পূর্ণ ধর্মঘট পালিত হয়।
১৯৪৮ সালের পর বাংলা ভাষা আন্দোলন কিছুটা স্তিমিত হয়ে পড়লেও পাকিস্তানের শাসক শ্রেণির বাংলা ভাষা বিরোধী ষড়যন্ত্র থেমে থাকেনি। বাংলা ভাষাকে সমূলে উৎপাটন করাই ছিল এ প্রচেষ্টার উদ্দেশ্য। এ জন্য আরবি হরফে বাংলা লেখার আজগুবি এক প্রস্তাব নিয়ে হাজির হয় তারা। এ কাজে বাংলাভাষী কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ফজলুর রহমান দালালের ভূমিকায় অবতীর্ণ হন। ১৯৪৮ সালের ২৭ ডিসেম্বর করাচীতে অনুষ্ঠিত নিখিল পাকিস্তান শিক্ষা সম্মেলনে বাংলা ভাষা আরবি হরফে লেখার প্রস্তাব উত্থাপন করেন তৎকালীন পাক শিক্ষামন্ত্রী ফজলুর রহমান। অতঃপর ১২ ফেব্রুয়ারি ১৯৪৯ তারিখে পেশোয়ারে অনুষ্ঠিত শিক্ষা উপদেষ্টা বোর্ডের সভার দ্বিতীয় অধিবেশনে তিনি বাংলা হরফকে বাদ দিয়ে তদস্থলে আরবি হরফে বাংলা লেখা প্রবর্তনের ঘোষণা দেন। তার এ ঘোষণার প্রতিবাদে ২৪ ফেব্রুয়ারি ১৯৪৯ তারিখে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের ছাত্রছাত্রীরা মোস্তফা নূর উল ইসলামের সভাপতিত্বে এক প্রতিবাদ সভার আয়োজন করেন এবং নজরুল ইসলাম,আশরাফ সিদ্দিকী, ইলা দাস গুপ্ত, নূরুল ইসলাম,মমতাজ বেগম, রিজিয়া সিদ্দিকী,খলিলুর রহমান প্রমুখের সমন্বয়ে একটি বর্ণমালা সাব-কমিটি গঠন করা হয়।
১৯৫০ সালের ১১ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আব্দুল মতিনের নেতৃত্বে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে গঠিত হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম কমিটি। এই কমিটি ভাষা আন্দোলনের বিভিন্ন পর্যায়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ২৭ জানুয়ারি ১৯৫২ তারিখে ঢাকার পল্টন ময়দানে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দিন ‘পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হবে একমাত্র উর্দু’ এবং ‘উর্দু হরফে বাংলা লিখনের প্রচেষ্টা সাফল্যমন্তডিত হচ্ছে’ বলে উক্তি করেন। তার বক্তৃতায় প্রদেশব্যাপী বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হয়। ২৯ তারিখে বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদের এক প্রতিবাদ সভা অনুষ্ঠিত হয়। ৩০ জানুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম কমিটির আহ্বানে বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রতীক ধর্মঘট পালন করা হয় ও ৪ ফেব্রুয়ারি ঢাকার সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ধর্মঘটের আহবান করা হয়।
বস্তুত ভাষা আন্দোলনের মাধ্যমে পূর্ব বাংলায় জিন্নাহর দ্বিজাতিতত্তে¡র ভিত্তিতে অর্জিত পাকিস্তানের ধ্বংসের বীজ রোপিত হয়।বাঙ্গালিত্বের ভিত্তিতে সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে ‘৭১এর ১৬ ডিসেম্বর স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশের বিজয় অর্জিত হয়। এর ফলে ভাষা আন্দোলনের চেতনা চূড়ান্ত বিজয় লাভ করে।