এম মুর্শেদ : খুলনার ব্যস্ত সড়কের মাঝখানে থাকা অব্যবহৃত আইল্যান্ডগুলো এতদিন ছিল ধুলোবালি ও আগাছার দখলে। এবার সেই পতিত জায়গাগুলোতেই শুরু হয়েছে ভিন্নধর্মী এক উদ্যোগ। বটিয়াঘাটা উপজেলার কৃষকরা স্থানীয় কৃষি বিভাগের সহায়তায় রূপসা সেতু সংযোগ সড়কের আইল্যান্ডে রোপণ করছেন পুষ্টিগুণে সমৃদ্ধ সজিনার (শজনা) ডাল। এতে একদিকে যেমন বাড়ছে শহরের সবুজায়ন, অন্যদিকে কৃষকদের জন্য তৈরি হচ্ছে নতুন সম্ভাবনার ক্ষেত্র।
শহরের ব্যস্ত সড়কপথের মাঝের পতিত আইল্যান্ডগুলো এবার শুধু ধুলো ও আগাছি দিয়ে পূর্ণ নয়। খুলনার বটিয়াঘাটা উপজেলার কৃষকরা স্থানীয় কৃষি অফিসের সহায়তায় এই পতিত জমিতে রোপণ করছেন সবুজ ও পুষ্টিগুণে সমৃদ্ধ সজিনার (শজনা) ডাল। খোলা রাস্তার আইল্যান্ডগুলোতে সজিনা ঢাল রোপণের মাধ্যমে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা, কৃষকের আয়ের উৎস বৃদ্ধি এবং স্থানীয় সম্প্রদায়ের পুষ্টি চাহিদা পূরণ এ তিনটি লক্ষ্য একসাথে অর্জনের চেষ্টা করা হচ্ছে।
প্রধানমন্ত্রীর ২৫ কোটি বৃক্ষ রোপণ কর্মসূচীর আহ্বানকে বাস্তবে রূপ দিতে জিরো পয়েন্ট থেকে হরিনটানা পর্যন্ত প্রায় দুই কিলোমিটার রাস্তার আইল্যান্ডের পতিত জায়গাগুলোতে কৃষকরা সক্রিয়ভাবে অংশ নিচ্ছেন।
জিরো পয়েন্ট এলাকার কৃষক মোঃ সাহেব আলী ও আঃ কুদ্দুস জানান, আমরা এলাকার ১০-১২ কৃষক মিলে প্রায় এক কিলোমিটার রাস্তার পতিত জায়গায় প্রায় ১২০ টি সজিনার ডাল রোপণ করেছি। এটি করা হয়েছে উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা জীবানন্দ রায়ের পরামর্শে।
সৈয়েদ বাড়ী এলাকার কৃষক মোঃ আমিরুল ইসলামও বলেন, রূপা তেলের ডিপো থেকে হরিনটানা পর্যন্ত প্রায় এক কিলোমিটার রাস্তার আইল্যান্ডের মধ্য দিয়ে পতিত জায়গায় আমরা প্রায় ৮০টি সজিনা ঢাল রোপণ করেছি। এতে জমি শস্যহীন থাকছে না এবং পরিবেশও সবুজ হচ্ছে।
উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা জীবানন্দ রায় জানান, এ ধরনের উদ্যোগ পরিবেশ সংরক্ষণ, পতিত জমির সদ্ব্যবহার এবং কৃষক কৃষাণীদের আর্থসামাজিক উন্নয়নের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মোট দুই কিলোমিটার রাস্তার আইল্যান্ডের পতিত জায়গায় আমরা প্রায় ২০০-২৫০ টি সজিনার ডাল রোপণ করেছি। এ বছর আমাদের লক্ষ্য প্রায় ৩০০০ টি সজিনা ঢাল রোপণ করা।
শজিনা (শিমুলজাতীয় ঝবংনধহরধ জাতের গাছ) একটি বহু দিক থেকে উপযোগী ও মূল্যবান উদ্ভিদ। শজিনার বিভিন্ন অংশ পাতা, ডাল ও বীজ উচ্চ পুষ্টিমানসম্পন্ন। শজিনার পাতাতে প্রোটিনের পরিমাণ তুলনামূলক বেশি। গবেষণায় দেখা গেছে, শজিনা পাতা প্রোটিনের অন্যতম ভেজিটেবল উৎস হিসেবে কাজ করতে পারে, যা খাদ্য নিরাপত্তায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এতে ভিটামিন অ, ঈ এবং ক্যালসিয়াম, আয়রন, পটাশিয়ামসহ বিভিন্ন খনিজ উপাদান থাকে, যা শরীরের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা ও পুষ্টি ভারসাম্য রাখতে সাহায্য করে। খাদ্য নালীর স্বাস্থ্যের জন্য প্রয়োজনীয় ফাইবার শজিনার পুষ্টিগুণকে আরও উপযোগী করে তোলে।শজিনা শুধুই খাদ্যগুণসম্পন্ন উদ্ভিদ নয় এতে রয়েছে শক্তিশালী বায়োলজিক্যাল অ্যাক্টিভ কম্পাউন্ড।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর খুলনার জেলা প্রশিক্ষণ অফিসার মহাদেব কুমার সানা বলেন, সজিনা পুষ্টির ডিনামাইট। এটি উচ্চমূল্যের ফসল এবং কম পরিচর্যা প্রয়োজন। পতিত জমিতে এ ধরনের উদ্যোগ কৃষকের আয় বাড়ানোসহ পরিবেশ সংরক্ষণেও সহায়ক।
জেলার উপ-পরিচালক মোঃ নজরুল ইসলামও মন্তব্য করেন, এ ধরনের কার্যক্রম শুধু পরিবেশ সংরক্ষণ নয়, বরং কৃষকের আর্থিক নিরাপত্তার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। পতিত জমি ব্যবহার করে অর্থনৈতিক মূল্যবান ফসল উৎপাদন করা হলে কৃষকের আয় বাড়বে এবং খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে।
স্থানীয় কৃষকদের মতে, পতিত জমিতে সজিনার ডাল রোপণ শুধুমাত্র অর্থনৈতিক দিক থেকেই নয়, বরং এর মাধ্যমে পরিবেশও সবুজ ও প্রাণবন্ত হচ্ছে। রাস্তার আইল্যান্ডগুলোতে সবুজের ছোঁয়া শহরের দৃশ্য পরিবর্তন করছে এবং পথচারীদের মনকে সতেজ করছে।
উদ্যোগটি শুরু হওয়ায় অন্যান্য কৃষকরাও এতে অংশ নিতে উৎসাহিত হয়েছেন। তারা জানাচ্ছেন, পতিত জমি ব্যবহার করে তারা একদিকে শহরের সৌন্দর্য বৃদ্ধি করছেন, অন্যদিকে কৃষি উৎপাদনের মাধ্যমে নতুন আয়ের পথ তৈরি করছেন।
সজিনা গাছের ডাল, পাতা এবং ফল নিয়মিত ব্যবহার করলে পরিবারের পুষ্টি চাহিদা পূরণ হয়। বিশেষ করে শিশুরা ও বৃদ্ধদের পুষ্টি নিশ্চিত করতে এর ফল অত্যন্ত উপকারী।
বটিয়াঘাটার কৃষি অফিস জানাচ্ছে, শুধুমাত্র এই বছর নয়, আগামী বছরেও এ ধরনের উদ্যোগ অব্যাহত থাকবে। স্থানীয় কৃষকদের প্রশিক্ষণ ও সহায়তার মাধ্যমে পতিত জমি ব্যবহার করে আরও বেশি সংখ্যক সজিনা ঢাল রোপণ করা হবে।
ফলে বলা যায়, পতিত জমিতে সজিনা ঢাল রোপণ উদ্যোগটি কেবল বৃক্ষ রোপণ নয়, এটি কৃষকের অর্থনৈতিক উন্নয়ন, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার এক সফল সমন্বয়। শহরের ব্যস্ত রাস্তার মাঝে ছোট ছোট সবুজ দ্বীপগুলো প্রমাণ করছে, সঠিক পরিকল্পনা ও স্থানীয় উদ্যোগ কিভাবে প্রকৃতি ও মানুষকে একসাথে উপকৃত করতে পারে।