গত ১৪ মাসে অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্রের গুলিতে পাঁচ শতাধিক খুনের ঘটনা ঘটেছে
আসাদুজ্জামান বিকু : অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিতব্য জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ওপর প্রভাব বিস্তার করতে পারে। পুলিশের লুট হওয়া বৈধ অস্ত্রের একটা উল্লেখযোগ্য অংশ এখনও উদ্ধার হয়নি। লুট হওয়ার এক বছর পর গত ১০ আগষ্ট অস্ত্র উদ্ধারে পুরস্কার ঘোষণা করেও তেমন লাভ হয়নি। উল্টো আন্ডারওয়ার্ল্ডে অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্রে ছড়াছড়ি। এসব অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্রের মধ্যে পুলিশের লুট হওয়া অস্ত্র রয়েছে কি না-তা কেউ নিশ্চিত হতে পারেনি।
গত ১২ ডিসেম্বর রাজধানীর মতিঝিলে ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র ও জাতীয় নির্বাচনে সম্ভাব্য প্রার্থী শরিফ ওসমান হাদিকে গুলি করে হত্যার পর সারাদেশে আন্ডারওয়ার্ল্ডে অবৈধ অস্ত্রের মজুদ নিয়ে আইন শৃঙ্খলা বাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলোকে ভাবিয়ে তুলেছে। এই ঘটনার ১০ দিনের মাথায় গত ২২ ডিসেম্বর খুলনার সোনাডাঙ্গায় একটি বাড়িতে দলীয় আন্তঃকোন্দলে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) খুলনা বিভাগীয় প্রধান ও এনসিপি শ্রমিক শক্তির কেন্দ্রীয় সংগঠক মোতালেব শিকদার গুলিবিদ্ধ হন। এর পাশাপাশি যশোর, চট্টগ্রাম, খুলনা, গাজীপুর, নারায়াণগঞ্জ, কুমিল্লা, বগুড়া, পাবনাসহ ২০ জেলায় গত ১৪ মাসে প্রতিপক্ষের অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্রের গুলিতে পাঁচ শতাধিক খুনের ঘটনা ঘটেছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক বলেন, পুলিশের লুট করা আগ্নেয়াস্ত্রগুলি অপরাধীরা লুট করে অপরাধের জন্য ব্যবহার করা হয়। আবার কিছু কিছু ক্ষেত্রে অপরাধীরা আগ্নেয়াস্ত্র ভাড়া দেয়ারও ঘটনা ধরা পড়েছে। একটি সুষ্ঠ নির্বাচন যাতে অনুষ্ঠিত হতে না পারে সেজন্য অপরাধীগোষ্ঠী তার আগে অস্থিতিশীল পরিবেশ তৈরির জন্য এসব আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করতে পারে।
পুলিশ সদর দপ্তরের সূত্র বলছে, আন্ডারওয়ার্ল্ডে অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্রের পাশাপাশি পুলিশের লুট হওয়া অস্ত্রও যুক্ত হয়েছে। এটাই আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতির ওপর প্রভাব পড়েছে। এ কারণে গত ১০ আগষ্ট স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী লুট হওয়া আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধারে পুরস্কার ঘোষণা করেন। ঘোষণায় বলা হয়, একটি লাইট মেশিনগান (এলএমজি) উদ্ধার করতে পারলে সন্ধানদাতা পাবেন পাঁচ লাখ টাকা। এ ছাড়া সাব মেশিনগানের (এসএমজি) জন্য দেড় লাখ, চায়না রাইফেলের জন্য এক লাখ এবং পিস্তল ও শটগানের জন্য ৫০ হাজার টাকা পুরস্কার দেওয়া হবে। আর প্রতি রাউন্ড গুলির জন্য মিলবে ৫০০ টাকা। স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টার এই ঘোষণার সময় পুলিশের হারিয়ে যাওয়া অস্ত্রের সংখ্যা ছিল ১,৩৭৫টি এবং গোলাবারুদ ছিল ২,৫৭,৮৪৯টি।
পুরষ্কার ঘোষণার পর থেকে নভেম্বর মাস পর্যন্ত মাত্র ৩৫টি আগ্নেয়াস্ত্র এবং ১৯০ রাউন্ড গুলি উদ্ধার করা হয়েছে। এখনও ১,৩৪০টি অস্ত্র এবং ২,৫৭,৬৫৯ রাউন্ডেরও বেশি গুলি কোথায় তা অজানা। এসব অস্ত্রের মধ্যে রয়েছে রাইফেল, সাব-মেশিনগান (এসএমজি), হালকা মেশিনগান (এলএমজি), বিভিন্ন ক্যালিবারের পিস্তল, শটগান, গ্যাসগান এবং টিয়ারগ্যাস লঞ্চার রয়েছে।
পুলিশ সদর দপ্তরের সূত্র জানায়, লুট হওয়া বা খোয়া যাওয়া অস্ত্রগুলি ইতিমধ্যেই বিভিন্ন হাতে চলে গেছে। অস্ত্রের ক্রেতা বা বাহকদের খুঁজে বের করতে সময় লাগবে। অনেক আগ্নেয়াস্ত্র হাত বদল করে অপরাধী গোষ্ঠীর কাছে বিক্রি করা হয়েছে। আবার কিছু অস্ত্র ও গুলি ভয়ে বাহকরা নদীতে বা জলাশয়ে ফেলে দেওয়া হতে পারে।
অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিতব্য জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতির ওপর প্রভাব বিস্তার করতে পারে, এমন আশংকার কথা মাথায় রেখে নির্বাচনের আগে সরকার নতুন আগ্নেয়াস্ত্র লাইসেন্স প্রদান স্থগিত রেখেছে। তবে ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর ঢাকা জেলা প্রশাসন প্রায় ৪৫টি লাইসেন্স প্রদান করেছে।
২০০৯ থেকে ২০২৪ সালের জুলাই মাস পর্যন্ত বিগত আওয়ামী লীগ সরকার প্রায় ১৭,২০০টি আগ্নেয়াস্ত্র লাইসেন্স প্রদান করে। অন্তর্বর্তীকালীন প্রশাসন এসব আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্স স্থগিত করে। ২০২৪ সালের ৩ সেপ্টেম্বরের মধ্যে অস্ত্র জমা দেওয়ার নির্দেশ দেয়া হয়। এর মধ্যে ১৩,৩৪০টি জমা পড়ে। ৩,৮৬০টি আগ্নেয়াস্ত্র এখনও জমা দেওয়া হয়নি। যারা অস্ত্র ও লাইসেন্স আত্মসমর্পণ করেনি তাদের ওইসব আগ্নেয়াস্ত্র এখন ‘অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র’ বলে ঘোষণ দেয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রনালয়।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ১,১৭৭টি লাইসেন্স বাতিল করে। বাতিল করা লাইসেন্সের মধ্যে বেশিরভাগই আওয়ামী লীগের রাজনীতিবিদ এবং ব্যবসায়ীদের। ঢাকায় সর্বোচ্চ ৭৯৬টি লাইসেন্স বাতিল করা হয়। পাবনায় ১৪১টি, চট্টগ্রামে ৭৩টি, যশোরে ৬৬টি, সিলেটে ৬৩টি এবং কক্সবাজারে ৩৮টি লাইসেন্স বাতিল করা হয়।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রনালয়ের সূত্র জানায়, অনেক লাইসেন্সধারী দেশ ছেড়ে চলে গেছেন। আবার অনেকে আত্মগোপনে আছেন। অনেকেই দাবি করেছেন যে বিদ্রোহের সময় তাদের অস্ত্র চুরি হয়ে গেছে। মাহবুবুল আলম হানিফ, নিজাম উদ্দিন হাজারী, শামীম ওসমান ও মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেলসহ আওয়ামী লীগের নেতারা নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তাদের অস্ত্র জমা দিতে ব্যর্থ হয়েছেন। নিরাপত্তা বিশ্লেষকগণ বলেন, জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে বিপুল সংখ্যক অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র নিরাপত্তার ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিবে। এর ফলে সহিংসতা, রাজনৈতিক ভীতিপ্রদর্শণ এবং অপরাধ সংঘঠনের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।