/ শুরু না হতেই শেষ হলো সাব্বির-মিতুর নতুন জীবন

শুরু না হতেই শেষ হলো সাব্বির-মিতুর নতুন জীবন

খুলনা-মোংলা মহাসড়কে ভয়াবহ সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ১৪

নিজস্ব সংবাদদাতা, (বাগেরহাট, রামপাল, মংলা ও কয়রা) : সকালে ছিল বিয়ের হাসি, আনন্দ আর নতুন জীবনের স্বপ্ন। বিকেলের মধ্যেই সেই স্বপ্ন রক্তে ভেসে নিভে গেল চিরতরে। শুরু না হতেই শেষ হয়ে গেল নবদম্পতি সাব্বির ও মার্জিয়া মিতুর দাম্পত্য জীবন। এক মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় মুহূর্তেই নিশ্চিহ্ন হয়ে গেল একটি পরিবারের প্রায় সব সদস্য। খুলনা-মোংলা মহাসড়কের বেলাই ব্রিজ এলাকায় নৌ বাহিনীর বাস ও মাইক্রোবাসের মুখোমুখি সংঘর্ষে ৪ শিশুসহ মোট ১৪ জন নিহত হয়েছেন। খুলনার কয়রায় একটি বিয়ের অনুষ্ঠান থেকে মোংলায় নিজেদের বাড়ি ফেরার পথে এ দুর্ঘটনার মুখোমুখি হন যাত্রীরা। ঘটনাস্থলেই মাইক্রো বাসে থাকা ৪ জন নিহত হন। আহতদের উদ্ধার করে খুলনা মেডিকেল কলেজসহ স্থানীয় বিভিন্ন হাসপাতালে পাঠানো হয়।

পরে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আনার পথে এবং চিকিৎসাধীন অবস্থায় মাইক্রোবাসে থাকা ১৪ জনই নিহত হন। খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে ১০ জন এবং রামপাল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ৪ জনের লাশ রয়েছে। নিহতদের বাড়ি মোংলা উপজেলার শ্যাওলা বুনিয়া ও কয়রা উপজেলার নাকশা গ্রামে। দুর্ঘটনায় মংলা পৌরসভার ৮ নং ওয়ার্ড বিএনপি’র সভাপতি আব্দুর রাজ্জাকসহ তার পরিবারের বেশিরভাগ সদস্য নিহত হয়েছেন। এদিকে, মর্মান্তিক এ সড়ক দুর্ঘটনায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান, স্থানীয় সংসদ সদস্য বনপরিবেশ ও জলবায়ু বিষায়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী লায়ন ড. শেখ ফরিদুল ইসলাম গভীর শোক ও সমবেদনা জানিয়েছেন।

হাসপাতাল ও সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, নিহতরা সবাই মোংলা পৌরসভার ৮ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা। এরা হলেন, পরিবারের প্রধান আব্দুর রাজ্জাক (৭০), তার স্ত্রী সামসুন্নাহার (৬০), বর সাব্বির হোসেন (৩২), কনে মার্জিয়া মিতু (২৫), কনের বোন লামিয়া (১২), কনের নানী মনোয়ারা (৫৮), আঞ্জুমান, বরের মা আনোয়ারা, সাব্বিরের খালাতো বোন পুতুল ও ঐশী, ইলরাম, সামিউল, আলিফ।এছাড়া মাইক্রোবাসের ড্রাইভার নাঈম শেখ।


পরিবারের নিকট আত্মীয়দের দেয়া তথ্যমতে, বৃহস্পতিবার বিকেলে খুলনা-মোংলা মহাসড়কের বেলাই ব্রিজ এলাকায় বরযাত্রীবাহী মাইক্রোবাস ও নৌবাহিনীর একটি বাসের মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। এতে প্রাণ হারিয়েছেন ১৪ জন। পরিবারের সদস্যরা বলছেন, দুপুরে খুলনার কয়রা উপজেলার নাকশা এলাকার মিতুর সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয় সাব্বির। পরে নববধূকে নিয়ে মংলার নিজে বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা হয় পুরো পরিবার। রামপাল উপজেলার বেলাই ব্রিজ এলাকায় পৌঁছলেই ঘটে দুর্ঘটনা। নিহত হন মাইক্রোবাসে থাকা সকলেই।

স্থানীয় প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, বেলাই ব্রিজ এলাকায় দ্রুতগতিতে আসা নৌবাহিনীর বাস ও যাত্রীবাহী মাইক্রোবাসটির মধ্যে প্রচণ্ড সংঘর্ষ হয়। এতে মাইক্রোবাসটি দুমড়ে-মুচড়ে রাস্তার পাশে ছিটকে পড়ে। খবর পেয়ে পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে উদ্ধার অভিযান শুরু করেন।


আব্দুর রহীম নামে এক প্রত্যক্ষদর্শী বলেন, আমরা বিকট শব্দ শুনে দৌড়ে এসে দেখি মাইক্রোবাসের ভেতর থেকে শুধু রক্ত গড়িয়ে পড়ছে। ছোট ছোট বাচ্চাদের দেহগুলো সিটের নিচে আটকে ছিল। ওই দৃশ্য মনে করার মতো নয়। ফায়ার সার্ভিস ও পুলিশ সদস্যরা দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে গ্যাস কাটার দিয়ে গাড়ি কেটে একে একে মরদেহগুলো বের করে আনেন।

দুর্ঘটনার পর পরিবারের একমাত্র জীবিত জনি তার খালাতো ভাই মিঠুকে ফোন করে কান্নায় ভেঙে পড়েন। মিঠু জানান, জনি তাকে ফোনে বলেন ‘আমি বাদে পরিবারের সবাই একই গাড়িতে ছিল, তারা সবাই মারা গেছে। আমি রামপাল হাসপাতালে যাচ্ছি, তোমরা একটু খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে যাও।’ মিঠু দ্রুত হাসপাতালে গিয়ে দেখেন, জনির পরিবারের কাউকেই আর জীবিত উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি।
অন্যদিকে, রামপাল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের কর্মকর্তা ডা: সুকান্ত কুমার পাল জানিয়েছেন, তাদের হাসপাতালে ৪টি মরদেহ রয়েছে। গুরুতর আহত আরও ১২ জনকে প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে উন্নত চিকিৎসার জন্য খুলনা মেডিকেলে পাঠানো হয়েছে।


খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগের কর্তব্যরত চিকিৎসক মেহেনাজ মোশাররফ বলেন, ‘আমরা ১০ জনকে মৃত অবস্থায় পাই। এর মধ্যে তিনজন নারী, তিনজন পুরুষ ও তিন শিশু রয়েছে। কয়েকজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক। তাদের হাসপাতালে ভর্তি রেখে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।’
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, কয়রা উপজেলার আমাদী ইউনিয়নের নাকশা গ্রামের আব্দুস সালাম মোড়লের মেয়ে নববধু মিতু আক্তার(২৫) কে বর পক্ষ গতকাল বেলা ১১ টায় শ্বশুরবাড়ী বাগেরহাটের মোংলায় নিয়ে যাচ্ছিলো। সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত মিতু আক্তার নাকশা ডি.এফ আলিম মাদ্রাসার প্রথমবর্ষের শিক্ষার্থী। তার সাথে সফর সঙ্গী ছোট বোন লামিয়া খাতুন(১১), দাদী রাশিদা(৫১) ও নানী আনোয়ারা খাতুন(৫৫) সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন।

এদিকে একসঙ্গে এতগুলো প্রাণহানির ঘটনায় কয়রা, মোংলা ও আশপাশের এলাকায় নেমে এসেছে গভীর শোকের ছায়া। যে বাড়িতে নতুন বউকে বরণ করার প্রস্তুতি ছিল, সেই বাড়িতেই এখন শুধু কান্না আর আহাজারি।

একদিন আগেও যে পরিবারে ছিল বিয়ের আনন্দ, হাসি আর নতুন জীবনের স্বপ্ন- এক বিকেলের সড়ক দুর্ঘটনায় সেই পরিবার প্রায় সম্পূর্ণ নিশ্চিহ্ন হয়ে গেল।