/ খুলনা বিসিক শিল্পনগরীর বহু ইউনিট সুযোগ-সুবিধার অভাবে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে

খুলনা বিসিক শিল্পনগরীর বহু ইউনিট সুযোগ-সুবিধার অভাবে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে

গাজী মনিরুজ্জামান: প্রতিষ্ঠার পর থেকেই নানা জটিলতায় ধুকছে খুলনা বিসিক শিল্প নগরী। নতুন উদ্যোক্তাও আসছে না। উল্টো প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধার অভাবে এখান থেকে ব্যবসা গুটাচ্ছেন উদ্যোক্তারা। এরই মধ্যে বন্ধ হয়ে গেছে প্রায় ৪০ শতাংশ শিল্প-কলকারখানা ইউনিট। অনেকগুলো চলছে খুড়িয়ে খুড়িয়ে। তারা আগ্রহী হচ্ছে না বড় কোন বিনিয়োগে।

শিল্প-কারখানার মালিকরা অভিযোগ করেছেন, বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প কর্পোরেশন (বিসিক) খুলনার আশানুরূপ অবকাঠামোগত উন্নয়ন হয়নি। নেই ব্যবসাবান্ধব পরিবেশও। ব্যবসায়ীদের সুবিধা-অসুবিধা দেখার কেউ নেই। এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, পানি, ড্রেনসংস্কারসহ পয়ঃনিষ্কাশনের জন্য নেই সঠিক ব্যবস্থাপনা, অধিকাংশ রাস্তা চলাচলের অযোগ্য। এলাকাবাসীর অভিযোগ, বেশিরভাগ রাস্তায় সড়ক বাতি না থাকায় সন্ধ্যার পর সংশ্লিষ্ট এলাকা পরিণত হয় ভূতুড়ে পরিবেশে।

বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প কর্পোরেশন (বিসিক) দেশের ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পের উন্নয়ন ও সম্প্রসারণে নিয়োজিত সরকারি খাতের মুখ্য প্রতিষ্ঠান। ১৯৫৭ সালে সংসদীয় আইনের মাধ্যমে বিসিকের জন্ম। বিসিক-এর প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষ উদ্যোগে দেশে প্রচুর শিল্পোদ্যোক্তা সৃষ্টি এবং শিল্প প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে উৎপাদন বৃদ্ধির মাধ্যমে দারিদ্র বিমোচন করার সাথে সাথে ভারসাম্যপূর্ণ আঞ্চলিক উন্নয়নে বিসিক প্রধান ভূমিকা রাখে।

খুলনা জেলার বিসিক শিল্পনগরী কর্মকর্তা মোঃ খায়রুল ইসলাম জানান, ১৯৬৫ সালের ৮ মার্চ খুলনা অঞ্চলের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তাদের কথা চিন্তা করে খুলনা নগরী থেকে ১৫ কিলোমিটার উত্তরে খানজাহান আলী থানাধীন শ্যামগঞ্জ মৌজার শিরোমনি এলাকায় বিসিক শিল্পনগরী হিসাবে গড়ে তুলতে কর্তৃপক্ষ প্রকল্পের অনুমোদন দেয়। প্রায় ৪৪ একর জমির ওপর স্থাপিত ৫৩.৭১ লাখ টাকা ব্যয়ে বিসিক শিল্পনগরীর ১৯৭৮ সালের সেপ্টেম্বরে প্রকল্পের কাজ শেষ হয়।

বিসিক কর্তৃপক্ষ জানায়, ২৪৪টি প্লটের বিপরীতে ২৪০টি প্লটের বরাদ্ধ ইতিমধ্যে দেয়া হয়েছে। এরমধ্যে কর্তৃপক্ষ ৮৪টি প্লটে শিল্প ইউনিট স্থাপনের উদ্যোগ নেয়। ৮৪টি শিল্প ইউনিটের মধ্যে বর্তমানে ৬৬টি প্রতিষ্ঠান চালু রয়েছে। বেশ কয়েকটি উৎপাদনের অপেক্ষায় আছে। চালু হওয়া ৬৬টি ইউনিটের মধ্যে ১৯টি খাদ্যজাত, ৪টি পাটজাত, ৬টি বনজ, ৩৪টি কেমিক্যাল, ৫টি প্রিন্টিং অ্যান্ড প্যাকেজিং, ১২টি প্রকৌশল শিল্প, বাকিগুলো ইলেকট্রিক অ্যান্ড ইলেকট্রনিক্স এবং চামড়াজাত, বস্ত্রজাত ও গøাস সিরামিক। চালু প্রতিষ্ঠানগুলোতে প্রায় ৫হাজার মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে। উক্ত শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে বছরে প্রায় ৫০ কোটি টাকা রাজস্ব আদায় হয়।

বিসিক শিল্পনগরী কর্মকর্তা মোঃ খায়রুল ইসলাম আরো জানান, এখানে ৯টি শিল্প প্রতিষ্ঠান রুগ্ন হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের অধিকাংশই ব্যাংকের কাছে ঋণ খেলাপী। রুগ্ন শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে রয়েছে মহাসিন টেক্সটাইল মিল্স, সোহানা ইন্ডাস্ট্রিজ লিঃ, মধুমতি কোক অ্যান্ড ব্রিকেট, জামান অ্যাসোসিয়েটস, এআর ফ্লাওয়ার্স মিল্স, ওয়ার্ক লেদার, একোয়া রিসোর্স, খুলনা পেপার বোর্ড অ্যান্ড প্যাকেজিং এবং মেসার্স গেøাবাল এন্টারপ্রাইজ।

কর্মকর্তা মোঃ খায়রুল ইসলাম বলেন, ব্যাংক ঋণের বোঝা, পণ্য বাজারজাতকরণ করতে না পারা, শিল্প ইউনিট বরাদ্দ নেওয়ার পর মালিকানা নিয়ে বিরোধ এবং উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি পাওয়ায় এসব শিল্প ইউনিট রুগ্ন হিসেবে পরিণত হয়েছে।
বৃহত্তর খুলনা উন্নয়ন সংগ্রাম সমন্বয় কমিটির সভাপতি শেখ আশরাফ-উজ-জামান বলেন, অনেক সম্ভাবনাময় হওয়ার পরও খুলনা বিসিকে কোন বড় ধরনের শিল্প কারখানা গড়ে ওঠেনি। দেশ যত শিল্পোন্নত হচ্ছে, ততই যেন পিছিয়ে পড়ছে খুলনা বিসিক শিল্প নগরী।
অব্যবস্থাপনার কারণেই আজ এ দশা। এখন দেশের যোগাযোগ ব্যবস্থা ভালো, পদ্মা সেতু চালু হয়েছে, এমনকি বিদ্যুতের সমস্যাও নেই। অথচ বিসিক শিল্প নগরীর করুণ অবস্থা কাটছে না। তিনি খুলনা বিসিককে টিকিয়ে রাখতে বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের শিল্প উপদেষ্টার জরুরী ও কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের দাবী জানান।

বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) খুলনা বিভাগীয় সমন্বয়ক মাহফুজুর রহমান মুকুল অভিাযোগ করেছেন, শিরোমণি-বিসিক শিল্পনগরীর শিল্প কল কারখানাগুলো পরিবেশ আইনের তোয়াক্কা না করায় সংশ্লিষ্ট এলাকার পরিবেশ বিষিয়ে তুলছে। এখানকার বিভিন্ন কারখানার বর্জ্য পুকুর, খাল-বিলে মিশে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে ও মাছসহ বিভিন্ন জলজ প্রাণী মারা যাচ্ছে।