স্টাফ রিপোর্টার ঃ টানা অতিবর্ষণ খুলনার মৎস্যচাষিদের ক্ষতির হিসাব ক্রমেই স্পষ্ট হচ্ছে| প্লাবিত পুকুর, দিঘি ও মাছের ঘের থেকে ভেসে গেছে শত শত টন মাছ, কোটি কোটি পোনা ও চিংড়ির রেনু| এতে জেলার মৎস্য খাতে দুই কোটি টাকার বেশি ক্ষতি হয়েছে| সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়েছেন দিঘলিয়া উপজেলার ঘের ও পুকুরের মাছচাষিরা| ক্ষতিগ্রস্তরা বলছেন, কয়েক মাসের বিনিয়োগ মুহূর্তেই পানিতে ভেসে গেছে| এখন সরকারি সহায়তা না পেলে ঘুরে দাঁড়ানো কঠিন হবে|
জেলা মৎস্য দপ্তরের গত রবিবার একীভূত ক্ষয়ক্ষতির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জেলার নয়টি উপজেলার মধ্যে ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে শুধু দিঘলিয়া ও রূপসা উপজেলায়| বন্যায় জেলার মোট পাঁচটি ইউনিয়ন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে| এর মধ্যে দিঘলিয়ার চারটি এবং রূপসার একটি ইউনিয়ন রয়েছে| অন্যদিকে পাইকগাছা, কয়রা, দাকোপ, বটিয়াঘাটা, ডুমুরিয়া, ফুলতলা ও তেরখাদা উপজেলায় মৎস্য খাতে কোনো ক্ষয়ক্ষতির তথ্য পাওয়া যায়নি|
সরকারি হিসাবে, জেলার ১৫২টি পুকুর ও দিঘি এবং ৬৫০টি মৎস্য ঘের প্লাবিত হয়েছে| প্লাবিত পুকুর ও দিঘির মোট আয়তন ৩ দশমিক ৩১ হেক্টর এবং ঘেরের আয়তন ২৮২ হেক্টর|
সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে দিঘলিয়া উপজেলায়| সেখানে ১৪০টি পুকুর-দিঘি ও ৬৫০টি ঘের পানিতে তলিয়ে যায়| প্লাবিত পুকুর-দিঘির আয়তন ২ দশমিক ২৫ হেক্টর এবং ঘেরের আয়তন ২৮২ হেক্টর| বন্যার পানিতে ৭০২ মেট্রিক টন সাদা মাছ, ২৭৯ লাখ পোনা এবং বিপুল পরিমাণ চিংড়ির রেনু ভেসে গেছে| এতে মাছ ও পোনার ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২১৩ দশমিক ২৩ লাখ টাকা| এছাড়া পুকুর, ঘের ও স্লুইস গেটের অবকাঠামোগত ক্ষতি হয়েছে আরও ৪ দশমিক ৫০ লাখ টাকা| সব মিলিয়ে শুধু দিঘলিয়াতেই ক্ষতির পরিমাণ ২১৬ দশমিক ১০ লাখ টাকা|
রূপসা উপজেলায় ক্ষতির পরিমাণ তুলনামূলকভাবে কম| উপজেলার একটি ইউনিয়নের ১২টি পুকুর ও দিঘি প্লাবিত হয়েছে| এসব জলাশয়ের মোট আয়তন ১ দশমিক ০৬ হেক্টর| বন্যার পানিতে ০ দশমিক ৭৮ মেট্রিক টন সাদা মাছ ভেসে যাওয়ায় প্রায় ১ দশমিক ১৭ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে| তবে সেখানে কোনো চিংড়ি ঘের, পোনা কিংবা মৎস্য অবকাঠামোর ক্ষয়ক্ষতির তথ্য পাওয়া যায়নি|
জেলাভিত্তিক সারসংক্ষেপে বলা হয়েছে, বন্যায় মোট ৭০২ দশমিক ৭৮ মেট্রিক টন সাদা মাছ, ২৭৯ লাখ পোনা এবং প্রায় ৮ দশমিক ০৪ লাখ টাকার চিংড়ির রেনু ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে| তবে এ দুর্যোগে চিংড়ি উৎপাদনে কোনো ক্ষতির তথ্য পাওয়া যায়নি| একই সঙ্গে কোনো মৎস্যজীবী বা জেলের প্রাণহানি, আহত হওয়ার ঘটনা কিংবা মাছ ধরার ট্রলার, জলযান ও জালের ক্ষয়ক্ষতির তথ্যও পাওয়া যায়নি|
রূপসার সামন্তসেনা গ্রামের ঘের ব্যবসায়ী নাসির বলেন, টানা বৃষ্টিতে ঘেরের বাঁধ কয়েক জায়গায় ভেঙে গেছে| পানির স্রোতে অনেক মাছ বের হয়ে গেছে| এখন ঘেরে যা মাছ আছে, তাও ঠিকমতো থাকবে কি না বুঝতে পারছি না| প্রায় পাঁচ লাখ টাকা বিনিয়োগ করেছি| এর মধ্যে তিন থেকে চার লাখ টাকার ক্ষতি হবে| সরকার যদি আর্থিক সহায়তা দেয় এবং বাঁধ মেরামতের ব্যবস্থা করে, তাহলে কিছুটা ঘুরে দাঁড়াতে পারব|
খুলনা জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. বদরুজ্জামান বলেন, টানা অতিবর্ষণ ও বন্যার প্রভাবে জেলার বিভিন্ন এলাকায় মাছের ঘের ও পুকুরের ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে| আমাদের প্রাথমিক সমন্বিত প্রতিবেদনে দিঘলিয়া ও রূপসা উপজেলায় উল্লেখযোগ্য ক্ষতির তথ্য পাওয়া গেছে| মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা সার্বক্ষণিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছেন এবং ক্ষতিগ্রস্ত চাষিদের তালিকা নিয়মিত হালনাগাদ করা হচ্ছে|
তিনি বলেন, ক্ষয়ক্ষতি কমাতে চাষিদের ঘেরের বাঁধ দ্রুত মেরামত, পানির স্তর ও প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ, জাল দিয়ে ঘেরের চারপাশ সুরক্ষিত রাখা এবং মাছের সাস্থ্য ব্যবস্থাপনায় গুরুত্ব দেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে| পাশাপাশি মাঠপর্যায়ে প্রয়োজনীয় কারিগরি সহায়তাও দেওয়া হচ্ছে| ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণাঙ্গ তথ্য সংগ্রহের কাজ চলমান রয়েছে| সরকারিভাবে সম্ভাব্য সহায়তার বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা অনুযায়ী পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে|
বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বিএফআরআই) খুলনা কেন্দ্রের মুখ্য ˆবজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. আজহার আলী বলেন, টানা অতিবৃষ্টিতে ঘের ও পুকুরের পানির লবণাক্ততা কমে যায়, পিএইচের ভারসাম্য নষ্ট হয় এবং দ্রবীভূত অক্সিজেনের মাত্রা হ্রাস পায়| ফলে বিশেষ করে চিংড়িসহ বিভিন্ন মাছ রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে| এ পরিস্থিতিতে চাষিদের নিয়মিত পানির গুণগত মান পর্যবেক্ষণ করতে হবে| প্রয়োজনে চিংড়িঘেরে পাথরের চুন (ক্যালসিয়াম কার্বোনেট) ব্যবহার এবং বাঁধ ও ঘেরের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে মাছের সাস্থ্য ব্যবস্থাপনায় বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে|