/ সিরাতুন্নবী (স.): অন্ধকার থেকে আলোর পথে

সিরাতুন্নবী (স.): অন্ধকার থেকে আলোর পথে


।। প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউসুফ আলী।।
ঈদ অর্থ আনন্দ; আর মিলাদুন্নবী অর্থ নবীর জন্ম। মহানবীর (স.) জন্ম উপলক্ষে আয়োজিত স্মরণ ও কর্মসূচিকে ঈদে মিলাদুন্নবী বা সিরাতুন্নবী (স.) বলা হয়। তবে এর প্রকৃত তাৎপর্য শুধু আনুষ্ঠানিকতায় নয়; বরং মহানবী (স.)-এর জীবন, চরিত্র ও আদর্শকে স্মরণ করে তা জীবনে ধারণ করা। প্রচলিত ঐতিহাসিক মত অনুযায়ী,৫৭০ খ্রিস্টাব্দে রবিউল আউয়ালের ১২ তারিখে মহানবী (স.) পৃথিবীতে আগমন করেন। সে সময় আরব সমাজ ছিল নৈতিক ও মানবিক অবক্ষয়ের গভীর অন্ধকারে-গোত্রে গোত্রে সংঘর্ষ, তুচ্ছ বিষয়ে যুদ্ধ, দুর্বলের ওপর অত্যাচার এবং কন্যাসন্তানকে জীবন্ত কবর দেওয়ার মতো বর্বরতা ছিল সমাজের বাস্তবতা।এমন অন্ধকার সময়ে মহানবী (স.) মানবতার মুক্তির দূত হিসেবে আবির্ভূত হয়ে মানুষকে সত্য, ন্যায়, দয়া, ভ্রাতৃত্ব ও মানবিকতার পথে পরিচালিত করেন। তাঁর জীবন ও আদর্শ বিভক্ত সমাজকে ঐক্যবদ্ধ করে মানবসভ্যতার জন্য এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করে।তাই মহানবী (স.)-এর জন্ম শুধু একটি ঐতিহাসিক ঘটনা নয়; এটি মানবতার জন্য আলোর এক নতুন সূচনা।
সর্বোত্তম আদর্শ: মহানবী (স.)-এর উন্নত চরিত্র সারা বিশ্বে মানুষের কাছে দিবালোকের মতো পরিষ্কার। তার জীবনের সর্বত্রই রয়েছে অনুকরণীয় ও অনুসরণীয় আদর্শ। তার চরিত্রের প্রশংসা করে স্বয়ং মহান আল্লাহপাক প্রবিত্র কুরআনে ঘোষণা করেছেন, নিশ্চয়ই তোমাদের জন্য রসুলের জীবনেই রয়েছে সর্বোত্তম আদর্শ (সুরা আহজাব: ২১)। অন্য জায়গায় আল্লাহ তায়ালা এরশাদ করেন, নিশ্চয়ই আপনি মহান ও উন্নত চরিত্রের ওপর প্রতিষ্ঠিত (সূরা কলম: ৪)। খোঁজ নিলে দেখা যাবে বিশ্বের প্রায় প্রত্যেক মানুষই তার জীবনে কোন না কোন মানুষকে আদর্শ হিসাবে গ্রহণ করে। প্রশ্ন হলো, মহানবী (স.) ছাড়া পৃথিবীতে এমন একটি মানুষও কি কেউ দেখাতে পারবেন যিনি জীবন চলার সব বিষয়ে পান্ডিত্য অর্জন করেছেন অথবা দিকনের্দেশনা দিয়েছেন? এর উত্তর কেউই দিতে পারবেন না। কারণ, কোন মানুষই আজ পর্যন্ত নিজেকে সার্বিক বিষয়ে মডেল বা আদর্শ দাবি করতে সক্ষম হননি। অথচ মহান আল্লাহ তায়াল্ইা তাকে মডেল বা আদর্শ হিসেবে বিশ্ববাসীর কাছে পেশ করেছেন। আর তিনি কেয়ামত পর্যন্ত সমগ মাসুষের জন্য মডেল বা অনুকরণীয় নমুনা। কোন কোন সাহাবী (যেমন আবু হুরায়রা রা.) এমন ছিলেন যারা হুজুর (স.)-এর পবিত্র মুখনিঃসৃত কথাগুলো সাথে সাথে লিখে রাখতেন অথবা মুখস্ত করে ফেলতেন। এতে অন্যান্য সাহাবায়ে কেরাম (রা.) কিছুটা আপত্তি করেন যে, তোমরা সব কথা লিখে রেখোনা কারণ অনেক সময় মহানবী (স.) রাগের মাথায় অনেক কিছু বলে থাকতে পারেন। এতে মহানবী (স.) উত্তর দিলেন, না তোমরা সব কথায় লিখে রাখতে পারো, কারণ আমি রাগের বশোবর্তি হয়ে কিছু বলি না, যা বলি মহান আল্লা’র পক্ষ থেকেই বলি। মহানবীর (স.) ব্যক্তিগত রাতের জীবন অর্থাৎ তিনি কিভাবে স্ত্রীদের সাথে ব্যবহার করেছেন সেটাও আমাদের জন্য অনুকরণীয় আদর্শ বা সুন্নত। জীবনের এমন কোন দিক নেই যে বিষয়ে তিনি দিক নির্দেশনা দেননি। হাতের নখ কাটা, মাথার চুল কাটা থেকে রাষ্ট্র চালানো পর্যন্ত সব বিষয়েই তিনি শুধু দিক নির্দেশনা দেননি, বরং তিনি তার জীবদ্দশায় তা বাস্তবায়ন করে দেখিয়ে দিয়েছেন। তিনি একই সঙ্গে আদর্শ যুবক, আদর্শ শিক্ষক, আদর্শ পিতা, আদর্শ স্বামী, আদর্শ সমাজ সংস্কারক, আদর্শ রাষ্ট্র নায়ক; এক কথায় সর্ব দিক দিয়েই আদর্শ। তিনি জাতি, ধর্ম, বর্ণ, নির্বিশেষে সকল মানুষের শান্তি, নিরাপত্তা ও সুন্দরভাবে বাঁচার নিশ্চয়তা বিধান করেছে।
ঈদে মিলাদুন্নবীতে আমাদের অঙ্গীকার: ঈদে মিলাদুন্নবীকে কেন্দ্র করে আমরা মহানবী (স.)-এর প্রশংসা করি, তাঁর জীবন নিয়ে আলোচনা করি এবং তাঁর প্রতি ভালোবাসা প্রকাশ করি। কিন্তু এই ভালোবাসার সবচেয়ে বড় প্রমাণ হলো তাঁর আদর্শকে জীবনে ধারণ করা।মিলাদ শুধু একটি দিনের অনুষ্ঠান হয়ে থাকলে তার প্রকৃত উদ্দেশ্য পূর্ণ হবে না। মহানবী (স.)-এর চরিত্র ও আদর্শ নিয়ে সারা বছর আলোচনা, শিক্ষা ও চর্চা প্রয়োজন।তাঁর ক্ষমা আমাদের ক্ষমাশীল হতে শেখাবে।তাঁর দয়া আমাদের দয়ালু হতে শেখাবে।তাঁর ধৈর্য আমাদের সংযমী হতে শেখাবে।তাঁর ন্যায়বিচার আমাদের ন্যায়পরায়ণ হতে শেখাবে।তাঁর সততা আমাদের আমানতদার হতে শেখাবে।এই পরিবর্তন ব্যক্তিজীবন থেকে পরিবার, পরিবার থেকে সমাজ এবং সমাজ থেকে রাষ্ট্রে ছড়িয়ে পড়তে পারে।
তাই আসুন, এই পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী (স.) উপলক্ষে আমরা যদি সত্যিই নবীজির শিক্ষা গ্রহণ করতে চাই, তাহলে আমাদের অঙ্গীকার হোক-
গালাগালির পরিবর্তে সুন্দরভাষা/বিদ্বেষের পরিবর্তে ভালোবাসা/গুজবের পরিবর্তে সত্য/অসহিষ্ণুতার পরিবর্তে সহনশীলতা/অপমানের পরিবর্তে সম্মান এবং বিভেদেও পরিবর্তে ভ্রাতৃত্ব।
(লেখক: অধ্যাপক, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়, অস্ট্রেলিয়াথেকে)

সম্পর্কিত খবর

আরও খবর