সংবাদদাতা, কয়রা (খুলনা): সেতু খালে পড়ে আছে, পাশে বাশেঁর সাঁকো দিয়া পোলাপান স্কুলে যায়, মানুষ বাজারে যায়। একটু এদিক-ওদিক হইলেই খালে পড়ে যাওয়ার ভয়। ছয় বছর ধইরা এমন কষ্ট করতিছি, কিন্তু সেতু আর হইল না।ক্ষোভ, হতাশা আর অনিশ্চয়তার কথা বলতে গিয়ে এভাবেই নিজের দুর্ভোগের চিত্র তুলে ধরেন খুলনার কয়রা উপজেলার সদর ইউনিয়নের ওড়াতলা গ্রামের খাল পাড়ের বাসিন্দা রিপন আহম্মেদ ।
শুধু রিপন আহম্মেদই নয় ক্ষোভ নিয়ে ওই গ্রামের একাধিক ব্যক্তি বলেন,একটি সেতু নেই, তাই থমকে আছে পাঁচ গ্রামের হাজারো মানুষের স্বাভাবিক জীবন। কোথাও যেতে হলে ভরসা নড়বড়ে বাঁশের সাঁকো। সেই সাঁকো পার হতে গিয়ে প্রতিদিন দুর্ঘটনার ঝুঁকি নিচ্ছে স্কুল-কলেজ ও মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরা। একই পথে চলতে হচ্ছে কৃষক, শ্রমজীবী মানুষ ও ব্যবসায়ীদেরও। জরুরি প্রয়োজনে রোগী কিংবা প্রসূতিকে হাসপাতালে নেওয়াও হয়ে উঠছে দুর্ভোগের কারণ।
জানা যায়,খুলনার কয়রা উপজেলার সদর ইউনিয়নের ২ নম্বর কয়রা-ওড়াতলা খালের ওপর নির্মিত সেতুটি ২০২০ সালে ধসে পড়ে। এরপর কেটে গেছে ছয় বছর। কিন্তু নতুন সেতু নির্মাণের উদ্যোগ এখনো বাস্তবে রূপ নেয়নি। স্থানীয়দের উদ্যোগে তৈরি বাঁশের সাঁকোটিই এখন ২ নম্বর কয়রা, ওড়াতলা, গোবরা, হরিণখোলা ও পূর্বচকসহ আশপাশের গ্রামের মানুষের পারাপারের একমাত্র ভরসা।
গত শনিবার সরেজমিনে দেখা যায়, খালের দুই পাড়ের মধ্যে কোনোমতে সংযোগ তৈরি করেছে বাঁশের একটি সাঁকো।বাঁশের সেঁকো দিয়ে স্থানীয় লোকজন পারাপার হচ্ছে খালের এক পাশ থেকে অন্য পাশে। স্কুল গামি কোমলমতি শিশু ও বৃদ্ধারা বাঁশের সেঁকো ঝুঁকি ও ভয় নিয়ে পারাপার হচ্ছেন কেউ কেউ অন্যের সাহায্য নিয়ে বাঁশের সাকো পার হয়ে নিচ্ছে। পাশেই রয়েছে ভঙ্গর সেতুটির কঙ্কাল, যার ৯০ শতাংশ ভেঙ্গে খালে পড়ে আছে। ভ্যান, ইজিবাইক ও পণ্যবাহী যানবাহন নিয়ে অনেকদুর ঘুরে আসতে হচ্ছে স্থানীয়দের ।
২ নং কয়রা গ্রামের বাসিন্দা গফুর সানা বলেন, সাঁকো পার হতে গিয়ে শিক্ষার্থীরা প্রায়ই পিছলে পড়ে যায়। বই-খাতা পানিতে পড়ে নষ্ট হয়। বর্ষাকালে দুর্ঘটনার ভয় আরও বাড়ে। রাতের বেলা কোনো রোগী বা প্রসূতিকে হাসপাতালে নেওয়ার প্রয়োজন হলে বিপাকে পড়তে হয় স্বজনদের। তাঁর ভাষ্য, দীর্ঘদিন ধরে সেতু না থাকায় এলাকার মানুষের ভোগান্তির শেষ নেই।
স্থানীয়দের দাবি, পাঁচ গ্রামের মানুষের যাতায়াতের দুর্ভোগ লাঘবে দ্রুত সেতু নির্মাণের প্রকল্প নিতে হবে। বছরের পর বছর বাঁশের সাঁকোর ওপর নির্ভর করে একটি জনপদের যোগাযোগব্যবস্থা চলতে পারে না। বিশেষ করে শিক্ষার্থী, অসুস্থ মানুষ ও বয়স্কদের নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করা জরুরি।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ১৯৯৬ সালে খুলনা পানি উন্নয়ন বোর্ডের ১৩-১৪/১ নম্বর পোল্ডারের আওতায় ২ নম্বর কয়রা-ওড়াতলা খালের ওপর সেতুটি নির্মাণ করা হয়েছিল। ২০২০ সালে সেটি পুরোপুরি ধসে পড়ার পর থেকে স্থায়ী যোগাযোগব্যবস্থা ভেঙে পড়ে। এরপর বাঁশের সাঁকো দিয়ে কোনো রকমে চলাচল চালিয়ে যাচ্ছেন কয়েকটি গ্রামের মানুষ।
কয়রা সদরের ২ নং ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য মাসুম বিল্লাহ বলেন, “সেতুর অভাবে শিক্ষার্থীদের ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করতে হচ্ছে। সভায় বারবার বলেও সমাধান মেলেনি। দ্রুত সেতু নির্মাণ করে মানুষের দুর্ভোগ লাঘব জরুরি।
কয়রা সদর ইউনিয়নের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান লুৎফর রহমান বলেন, ভাঙা সেতুতে কয়েকটি গ্রামের মানুষের দুর্ভোগ চরমে পৌঁছেছে। বিষয়টি উপজেলা প্রশাসন লিখিতভাবে জানিয়েছি। এখন জরুরি ভিত্তিতে প্রকল্প গ্রহণ করে সেতুটি নির্মাণ করা প্রয়োজন। উপজেলা নির্বাহী অফিসার আব্দুল্লাহ আল বাকী বলেন,ছয় বছর ধরে একটি সেতু না থাকায় পাঁচ গ্রামের মানুষ ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করছেন এটি অবশ্যই উদ্বেগজনক। বিষয়টি খতিয়ে দেখে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের সঙ্গে সমন্বয় করে সেতু নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হবে। শুধু আশ্বাস নয়, সমস্যাটির বাস্তবসম্মত সমাধানে কী করা যায়, তা গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হবে।