আসামি করা হয়েছে নিচের সারির প্রকৌশলীদের, আড়ালে অপরাধীরা
স্টাফ রিপোর্টার : খুলনার শিপইয়ার্ড সড়ক প্রশস্তকরণ প্রকল্পে অনিয়মের অভিযোগে দুই ঠিকাদার ও খুলনা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের ৬ প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে পৃথক দুটি মামলা করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। রোববার (২৫ অক্টোবর) দুদকের উপ-সহকারী পরিচালক আশিকুর রহমান বাদি হিয়ে খুলনা সমন্বিত জেলা কার্যালয়ে মামলা দুটি দায়ের করেন।
মামলায় কাজ না করেই ঠিকাদারকে এক কোটি ৫৫ লাখ টাকা বিল প্রদান এবং আরেকটি মামলায় ঠিকাদারের অনুকূলে অর্থ ছাড় করে ১১ কোটি ১৯ লাখ টাকা রাজস্ব হিসেবে স্থানান্তরের অভিযোগ আনা হয়েছে।
তবে ঠিকাদারকে অতিরিক্ত অর্থ ছাড়ের নেপথ্যে ভূমিকা রাখা কেডিএর চেয়ারম্যান, সচিব, সদস্য (উন্নয়ন) ও সদস্য (প্রশাসন)কে কাউকেই দুদকের মামলায় আসামি করা হয়নি। মূল হোতাদের বাদ নিয়ে নিচের সারীর প্রকৌশলীদের আসামি করায় বিষয়টি নিয়ে সমালোচনা শুরু হয়েছে।
দুদকের মামলার আসামিরা হলেন ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান আতাউর রহমান খান লিমিটেডের চেয়ারম্যান মো. আতাউর রহমান, ঠিকাদারি কোম্পানি মাহাবুব ব্রাদার্স লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শেখ মাহাবুব রহমান, কেডিএর প্রধান প্রকৌশলী কাজী সাবিরুল আলম, সাবেক তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী শামীম জেহাদ, প্রকল্প পরিচালক মো. আরমান হোসেন, নির্বাহী প্রকৌশলী মুনতাসির মামুন, সহকারী প্রকৌশলী বাসুদেব কুমার বিশ্বাস ও উপ-সহকারী প্রকৌশলী শরীফ ওয়াহিদুজ্জামান।
এদিকে একই ঘটনায় গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় গঠিত তদন্ত কমিটির কেডিএর তিন সদস্যসহ মোট ১৪ জনের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ করে। কেডিএর সদস্য (উন্নয়ন) এস এম মাহমুদুর রহমান ও সদস্য (প্রশাসন) মো. ইকবাল হোসেন এবং সাবেক সাবেক সচিব মো. বদিউজ্জামানের বিরুদ্ধে সংস্থাপন মন্ত্রণালয়ে এবং বাকি ১১ জনের বিরুদ্ধে কেডিএতে বিভাগীয় মামলাও হয়েছে। কিন্তু একই বিষয়ে তদন্ত করে দুদক ওই তিন সদস্যকেও বাদ দিয়েছে। বিত্তশালী ও ক্ষমতাধর সরকারি কর্মকর্তাদের বাদ দিয়ে শুধু তাদের নির্দেশ পালনকালী প্রকৌশলীদের আসামি করায় দুদকের তদন্ত নিয়েই প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। পাশাপাশি মন্ত্রণালয় এবং দুদক দুই সংস্থাই কেডিএ চেয়ারম্যান পদে থাকা সামরিক কর্মকর্তাদের বাদ দেওয়ায় প্রকৃত বিচার নিয়ে আস্থার সংকট তৈরি হয়েছে।
কেডিএর কর্মকর্তা ও ঠিকাদাররা জানান, শিপইয়ার্ড সড়কের কাজ চলাকালে পুরো বিষয়টি দেখভাল করতেন চেয়ারম্যান ও সদস্যরা। সরকারি দলের প্রভাবশালী নেতা হওয়ায় ঠিকাদার মাহবুবুর রহমান প্রকল্পের প্রকৌশলীদের পাত্তা দিতেন না। কাজে কোন ভুল হয়েছে, এটা সংশোধন বা চিঠি দিতেও ভয়ে থাকতেন দায়িত্বরত প্রকৌশলীরা। বিল থেকে শুরু করে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের বেশিরভাগই তারা নিতেন। ২০২৪ সালের জুন মাসে প্রকল্পের অনুকূলে বরাদ্দ থাকা ১৩ কোটি টাকার বিল তৈরির নির্দেশ দেন চেয়ারম্যান ও সচিব। তাদের নির্দেশে নিচের প্রকৌশলীরা বিল তৈরি করে।
কেডিএ থেকে জানা গেছে, শিপইয়ার্ড সড়ক প্রশস্তকরণ ও উন্নয়ন প্রকল্প একনেকে অনুমোদন পায় ২০১৩ সালের ৭ মে। শুরুতে প্রকল্প ব্যয় ছিল ৯৮ কোটি টাকা। দীর্ঘ ১৩ বছরেও সড়কটির কাজ শেষ হয়নি। উল্টো ব্যয় বেড়ে দাড়িয়েছে ২৮০ কোটি টাকা। ২০২৫ সালের ১১ সেপ্টেম্বর ওই সড়কে অভিযান চালায় দুদক। সড়কে কাজের ধীরগতি দেখে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানও তদন্তের নির্দেশ দেন। পৃথক দুটি তদন্ত গত সেপ্টেম্বর মাসে শেষ হয়।
কেডিএ থেকে জানা গেছে, খুলনা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের প্রধান নির্বাহী ও প্রশাসনিক ক্ষমতার অধিকারী ব্যক্তি হলেন চেয়ারম্যান। সংস্থার প্রশাসনিক ও নীতিনির্ধারণী সমস্ত সিদ্ধান্ত তাঁর নেতৃত্বেই পরিচালিত হয়। প্রকল্প চলাকালীন দুই জন সামরিক কর্মকর্তা চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। দ্বিতীয় পর্যায়ে রয়েছেন সচিব ও সদস্যরা। রাজনৈতিক বিবেচনায় অরাজনৈতিক ব্যক্তি ও কর্মকর্তারা এই পদে দায়িত্ব পালন করেন। প্রকল্প চলাকালে প্রায় ৩ জন সদস্য কেডিএর সদস্য দায়িত্ব পালনকালে প্রকল্পটি দেখাশোনা করেছেন।
সূত্রটি জানায়, আওয়ামী লীগ সমর্থিত ঠিকাদার মাহবুবকে অতিরিক্ত বিল ছাড়ে উৎসাহী ভূমিকায় ছিলেন চেয়ারম্যান ও বোর্ড সদস্যরা। কেডিএর নথি অনুমোদন ও বিল প্রদানের নির্দেশিকায় দেখা গেছে, নিম্নমান সহকারী থেকে প্রধান প্রকৌশলীর পরে বিলের নথিতে সদস্য (প্রকৌশল), সচিব, সদস্য (প্রশাসন ও অর্থ) ও চেয়ারম্যান অনুমোদন করেন। এরপর চেয়ারম্যান ও সচিব যৌথভাবে বিলে স্বাক্ষর করেন। অথচ দুদকের তদন্তে তাদের কারও নাম উল্লেখ করা হয়নি।
জানতে চাইলে দুদকের খুলনা জেলা কার্যালয়ের উপ-পরিচালক হলেন মামুনুর রশীদ চৌধুরী বলেন, প্রাথমিক অনুসন্ধান শেষে মামলা হয়েছে। মামলার তদন্তকালে যদি অন্য কারও সংশ্লিষ্টতা পাওয়া যায়, তাহলে তাদেরও আসামি করা হবে।
খুলনা মহানগর নাগরিক ফোরামের কো-চেয়ারম্যান সরদার আবু তাহের বলেন, পুরো বিষয়টি দুঃখজনক। দীর্ঘ ১৩ বছর তারা মানুষকে কষ্ট দিয়েছে। শিপইয়ার্ড সড়কের অনিয়ম-দুর্নীতিতে জড়িত সকলের বিরুদ্ধে দৃষ্টিমূলক আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে। প্রয়োজনে পুনঃতদন্ত করতে হবে।