মোঃ মনিরুজ্জামান চৌধুরী, নড়াগাতী (কালিয়া) প্রতিনিধি: নড়াইলের কালিয়া উপজেলার নড়াগাতী থানার বিভিন্ন এলাকায় বাল্যবিবাহ বন্ধে প্রশাসনিক উদ্যোগ ও আইন থাকলেও কমছে না এ প্রবণতা। বরং নিয়মিতভাবেই স্কুলপড়ুয়া কিশোরীদের বিয়ে দেওয়ার অভিযোগ উঠছে। এতে কন্যাশিশুদের শিক্ষাজীবন ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি তাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে স্থানীয় সচেতন মহলে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, নড়াগাতীর বিভিন্ন এলাকায় ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণিতে পড়ুয়া কিশোরীদের বিয়ের আয়োজন করা হচ্ছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে বিয়ের খবর আগে থেকেই স্থানীয়ভাবে ছড়িয়ে পড়লেও তা বন্ধে কার্যকর উদ্যোগ নিতে দেখা যায় না। প্রতিবেশী, স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তি কিংবা বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ বিষয়টি জানলেও পারিবারিক সম্পর্ক, সামাজিক চাপ কিংবা ‘গরিব মানুষের মেয়ের বিয়েতে বাধা দেওয়া ঠিক নয়’—এমন মানসিকতার কারণে অনেকে নীরব থাকেন।
স্থানীয়দের ভাষ্য, এখনো অনেক পরিবার মনে করে, মেয়েকে দ্রুত বিয়ে দিয়ে ‘পরের বাড়ি’ পাঠিয়ে দিতে পারলেই পরিবারের দায়িত্ব কমে যায়। দরিদ্র পরিবারের ক্ষেত্রে এ প্রবণতা আরও বেশি বলে অভিযোগ রয়েছে। ফলে যে বয়সে কিশোরীদের বিদ্যালয়ে থাকার কথা, সে বয়সেই অনেককে সংসার জীবনে প্রবেশ করতে হচ্ছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, কোনো কোনো শিক্ষার্থীর বিয়ের খবর বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা জানতে পারলেও অভিভাবক বা স্থানীয় প্রভাবশালীদের চাপের কারণে প্রকাশ্যে অবস্থান নিতে অনেকে অনাগ্রহী। ফলে বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে বিদ্যালয়ের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা অনেক সময় কার্যকর হচ্ছে না।
সচেতন নাগরিকদের মতে, কোনো ছাত্রী হঠাৎ বিদ্যালয়ে অনুপস্থিত হয়ে গেলে কিংবা দীর্ঘদিন শ্রেণিকক্ষে না এলে তার কারণ খতিয়ে দেখা দরকার। শিক্ষার্থী বিয়ের ঝুঁকিতে আছে কি না, সে বিষয়ে শিক্ষক ও বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের নিয়মিত নজরদারি থাকলে অনেক বাল্যবিবাহ আগেই প্রতিরোধ করা সম্ভব।
বাল্যবিবাহের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়ে কন্যাশিশুর শিক্ষা ও ভবিষ্যতের ওপর। অল্প বয়সে বিয়ে হলে অনেকেরই পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যায়। পাশাপাশি অপরিণত বয়সে গর্ভধারণের ফলে মা ও শিশুর স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়তে পারে। প্রসবজনিত জটিলতা, অপুষ্টি, মানসিক চাপসহ নানা ধরনের সমস্যার আশঙ্কা থাকে।
বাংলাদেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী, সাধারণভাবে মেয়েদের বিয়ের ন্যূনতম বয়স ১৮ বছর এবং ছেলেদের ২১ বছর। এর কম বয়সে বিয়ে বাল্যবিবাহের আওতায় পড়ে। বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার বিধানও রয়েছে।
সচেতন মহলের মতে, শুধু প্রশাসনের অভিযান কিংবা আইন প্রয়োগের মাধ্যমে বাল্যবিবাহ পুরোপুরি বন্ধ করা সম্ভব নয়। এর জন্য পরিবার ও সমাজের মানসিকতার পরিবর্তন জরুরি। ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড পর্যায়ে নিয়মিত সচেতনতামূলক কর্মসূচি, বিদ্যালয়ে প্রচার, অভিভাবক সমাবেশ এবং কিশোরীদের নিয়ে সচেতনতামূলক কার্যক্রম জোরদার করা প্রয়োজন।