এইচ এম রোকন, রূপসা (খুলনা):রূপসা উপজেলায় বিগত আড়াই মাসে একের পর এক লোমহর্ষক হত্যাকান্ডের ঘটনা ঘটেছে। সর্বশেষ গত ২ নভেম্বর আঠারোবেকি নদীর চরে দুই যুবকের ক্ষতবিশেষ ও গুলিবিদ্ধ লাশ পাওয়ার পর গোটা রূপসাজুড়ে এখন চরম উদ্বেগ ও থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে। একের পর এক খুনের ঘটনায় স্থানীয় সাধারণ মানুষের মনে গভীর উৎকণ্ঠা সৃষ্টি হয়েছে। যদিও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষ থেকে অপরাধীদের ধরতে চিরুনি অভিযান ও গোয়েন্দা নজরদারি জোরদার করা হয়েছে, তবুও মাঠপর্যায়ে সাধারণ নাগরিকদের মনে ভীতি পুরোপুরি কাটছে না।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, চলতি ২০২৬ সালের আগস্ট মাস থেকে শুরু করে গত ২ নভেম্বর পর্যন্ত রূপসা উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় অন্তত ৫টি চাঞ্চল্যকর হত্যাকান্ডের ঘটনা ঘটেছে। যার প্রতিটির নেপথ্যেই ছিল বিভিন্ন অপরাধী চক্রের অভ্যন্তরীণ বিরোধ, মাদকের টাকা ভাগাভাগি ও পূর্ব শত্রুতা। সর্বশেষ ২ নভেম্বর (সোমবার) দুপুরে রূপসা উপজেলার আইচগাতী ইউনিয়নের সিংহের চর এলাকায় আঠারোবেকি নদীর চর থেকে মেহেদী হাসান সোহাগ (৩৫) এবং রেজাউল করিম (৩০) নামের দুই যুবকের গুলিবিদ্ধ ও ক্ষতবিক্ষত মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। নিহত সোহাগ রূপসার রাজাপুর গ্রামের আব্দুল্লাহর ছেলে। পুলিশের প্রাথমিক তদন্ত ও তথ্য অনুযায়ী, নিহতরা খুলনার অপরাধ জগতের একটি সক্রিয় গ্রুপের সাথে জড়িত ছিলেন এবং তাদের শরীরে গভীর ক্ষত ও গুলির চিহ্ন রয়েছে।
ধারণা করা হচ্ছে, অভ্যন্তরীণ কোনো কোন্দলের জেরে তাদের অন্য কোথাও হত্যা করার পর জোয়ার-ভাটার টানে লাশ নদীর চরে এসে আটকে পড়ে। এই জোড়া খুনের ঘটনাটি জানাজানি হওয়ার পর পুরো উপজেলায় নতুন করে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে।এর আগে গত ৫ অক্টোবর সন্ধ্যা পৌনে ৭টার দিকে উপজেলার আইচগাতী ইউনিয়নের দুর্জনিমহল গ্রামে নিজ বাড়ির সামনে রাস্তার পাশে বসা অবস্থায় আক্তার ঢালী (৬৪) নামের এক বৃদ্ধকে গুলি করে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। গত ১৫ আগস্ট তার ছেলে জয় ঢালী নির্মমভাবে খুন হওয়ার ঠিক ৫১ দিন পর এই হত্যাকান্ডটি ঘটে। এই হত্যাকান্ডটি ছিল মূলত একটি পরিকল্পিত ঘটনা, যার উদ্দেশ্য ছিল পূর্ববর্তী খুনের মামলার আইনি প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করা।এর আগে আক্তার ঢালীর ছেলে জয় ঢালী (২৭)-কে গত ১৫ আগস্ট রাত সোয়া ৯টার দিকে রূপসা উপজেলার আইচগাতী দুর্জনী মহল এলাকার আব্দুর রাজ্জাকের মোড়ে ছুরি দিয়ে কুপিয়ে ও গলা কেটে নৃশংসভাবে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা।
অপরাধী চক্রের অভ্যন্তরীণ বিরোধ ও এলাকায় প্রভাব বিস্তারকে কেন্দ্র করে এই হত্যাকান্ডটি সংঘটিত হয়েছিল, যা পরবর্তীতে তার পরিবারের ওপর আরেকটি বড় আঘাত ডেকে আনে।এছাড়া গত ১১ আগস্ট রাতে রূপসা উপজেলার নৈহাটি ইউনিয়নের রূপসা ব্রিকস নামক একটি ইটভাটার ভেতরে ঢুকে যুবদল কর্মী ফখরুল শেখ (৩২)-কে গুলি করে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। তিনি নৈহাটি গ্রামের বাসিন্দা ছিলেন এবং ইটভাটার পাহারার দায়িত্বে নিয়োজিত ছিলেন। পূর্ব শত্রুতা এবং স্থানীয় বালু মহালের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বিরোধের জেরে এই হত্যাকান্ডটি ঘটে বলে জানা গেছে।এদিকে গত ২ নভেম্বর আঠারোবেকি নদীতে জোড়া লাশ পাওয়ার পর রূপসার রাজাপুর, নৈহাটি এবং আইচগাতী এলাকার একাধিক সাধারণ বাসিন্দা ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, একের পর এক এ ধরনের মর্মান্তিক ঘটনায় আমরা সাধারণ মানুষ চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছি। বিশেষ করে সন্ধ্যার পর ব্যবসা প্রতিষ্ঠান খোলা রাখতে বা রাস্তায় বের হতে ভয় কাজ করছে। আমরা প্রশাসনের কাছে একটাই দাবি জানাই, এলাকা থেকে মাদক ও অপরাধী চক্রগুলোকে চিরতরে নির্মূল করে সাধারণ মানুষের স্বাভাবিক ও শান্তিপূর্ণ জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হোক।
এ বিষয়ে রূপসা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মাসুম খান জানান, আঠারোবেকি নদী থেকে উদ্ধার হওয়া দুই লাশের শরীরে আঘাতের চিহ্ন রয়েছে এবং পুলিশ সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে ঘটনাটি খতিয়ে দেখছে। রূপসার মাটিতে কোনো প্রকার অপরাধমূলক কর্মকান্ড বরদাশত করা হবে না। ঘটনার নেপথ্যে জড়িত চক্রগুলোকে চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনতে পুলিশ ও গোয়েন্দা টিম বিশেষ অভিযান পরিচালনা করছে। অপরদিকে স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, রূপসা উপজেলাকে পুরোপুরি নিরাপদ করতে হলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে তাদের চলমান ইতিবাচক অভিযান আরও জোরদার করতে হবে। সাধারণ মানুষ এখন কোনো প্রকার ভীতি ছাড়া একটি সুন্দর ও সন্ত্রাসমুক্ত রূপসা জনপদের প্রত্যাশায় প্রশাসনের পরবর্তী কঠোর পদক্ষেপের দিকে তাকিয়ে আছে। উল্লেখ্য,থানা পুলিশ সূত্রে জানা যায়, বিগত আড়াই মাসে ঘটে যাওয়া আলোচিত এই ৫টি হত্যাকান্ড ছাড়াও, চলতি ২০২৬ সালের পূর্ববর্তী মাস গুলোতে রূপসা উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নে অভ্যন্তরীণ কোন্দল, জমিজমা সংক্রান্ত বিরোধ এবং পারিবারিক কলহের জেরে আরও অন্তত ৭টি হত্যাকান্ডের ঘটনা ঘটেছে। সব মিলিয়ে চলতি বছরের ১ নভেম্বর পর্যন্ত রূপসা উপজেলায় মোট ১২টি খুনের ঘটনা ঘটেছে।
সাম্প্রতিক সময়ে খুনের এই অনাকাঙ্ক্ষিত পুনরাবৃত্তিরোধে আইনগত কঠোরতা বাড়ানোর জোরালো দাবি উঠেছে সর্বস্তরের জনগণের পক্ষ থেকে।