/ এলপিজি-সিএনজির জন্য খুলনায় দীর্ঘ লাইনঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা, আয় বন্ধ চালকদের

এলপিজি-সিএনজির জন্য খুলনায় দীর্ঘ লাইনঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা, আয় বন্ধ চালকদের

সরবরাহ ঘাটতি, দাম বাড়ার আশঙ্কা নাকি কৃত্রিম সংকট ?

স্টাফ রিপোর্টার | জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার পর এবার যানবাহনের বিকল্প জ্বালানি এলপিজি ও সিএনজি নিয়েও তৈরি হয়েছে অস্বস্তি। খুলনার বিভিন্ন অটো গ্যাস স্টেশনে মঙ্গলবার দিনভর দেখা গেছে যানবাহনের দীর্ঘ সারি। কোথাও ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও গ্যাস মেলেনি। মুজগুন্নীর ডিএম অটো ফিলিং অ্যান্ড গ্যাস সাপ্লাই স্টেশনের সামনে গাড়ির সারি প্রায় এক কিলোমিটার ছাড়িয়ে যায়। এক স্টেশন থেকে আরেক স্টেশনে ঘুরেও গ্যাস না পেয়ে কেউ অকটেনে, কেউ অন্য জ্বালানিতে গাড়ি চালাতে বাধ্য হয়েছেন।


প্রশ্ন উঠেছে, এই সংকটের নেপথ্যে কী? সরবরাহব্যবস্থার বাস্তব ঘাটতি, নাকি দাম বাড়ার আশঙ্কায় বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি করা হচ্ছে?
জাতীয় বাজারের তথ্য বলছে, এলপিজির ক্ষেত্রে সরবরাহ ঘাটতির বাস্তব ভিত্তি রয়েছে। বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) সেপ্টেম্বরে ১২ কেজি এলপিজি সিলিন্ডারের দাম ১ হাজার ৫৮৫ টাকা নির্ধারণ করলেও দেশের বিভিন্ন এলাকায় সেটি ২ হাজার টাকার বেশি দামে বিক্রির খবর এসেছে। আমদানিকারক ও বিইআরসি-সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, আগস্টে দেশে এলপিজি আমদানি হয়েছিল প্রায় ১ লাখ ৬০ হাজার টন; সেপ্টেম্বরের ২২ দিন পর্যন্ত আমদানি হয়েছে ১ লাখ ১৮ হাজার ৭৪২ টন। অর্থাৎ আমদানির গতি কমেছে।


এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আন্তর্জাতিক নৌপথের অস্থিরতা, জাহাজ সংকট ও পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি। ফলে আমদানিকারকদের সরবরাহ ব্যবস্থায় চাপ তৈরি হয়েছে বলে শিল্পসংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
তবে এখানেই তৈরি হচ্ছে আরেক প্রশ্ন। ২৮ সেপ্টেম্বর জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে বৈঠকে এলপিজি আমদানিকারক ও অপারেটররা দেশে এলপিজির কোনো সংকট নেই বলে দাবি করেছেন। তাঁদের হিসাবে, আগস্টে ১ লাখ ৫৭ হাজার ৭৬০ টন এবং সেপ্টেম্বরের ২২ দিন পর্যন্ত ১ লাখ ১৮ হাজার ৭৪২ টন এলপিজি আমদানি হয়েছে। মজুত ও আমদানি অব্যাহত থাকলে বাজারে সরবরাহ ঘাটতি থাকার কথা নয়—এমন অবস্থান তাঁদের।
এর বিপরীতে মাঠের চিত্র ভিন্ন। খুলনায় কয়েক দিন ধরে চাহিদা অনুযায়ী এলপিজি না পাওয়ার কথা জানিয়েছেন অটো স্টেশন মালিকরা।


নগরীর গল্লামারীর মেট্রোপলিটন ফিলিং স্টেশনের মালিক অ্যাডভোকেট মাসুদ হোসেন রনি বলেন, সাধারণত চার থেকে পাঁচ হাজার লিটার গ্যাসের জন্য পে-অর্ডার করা হলেও এখন চাহিদা অনুযায়ী সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে না। সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানও নিয়মিত গ্যাস দিতে পারছে না। ঝড়ের কারণে জাহাজ চলাচলে সাময়িক বিঘ্নসহ বিভিন্ন কারণে এ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে বলে তাঁকে জানানো হয়েছে। এক-দুই দিনের মধ্যে সরবরাহ স্বাভাবিক হওয়ার আশ্বাসও পেয়েছেন তিনি।
সিএনজির সংকটের পেছনেও রয়েছে আলাদা চাপ। দেশে গ্যাস সরবরাহের ঘাটতির কারণে সিএনজি স্টেশন মালিকদের সংগঠন ২৮ সেপ্টেম্বর থেকে অনির্দিষ্টকালের জন্য স্টেশন বন্ধ রাখার কর্মসূচি ঘোষণা করেছিল। পরে সরকারের আশ্বাসে কর্মসূচিটি স্থগিত করা হয়। এর আগে আগস্টেও গ্যাস সংকটের কারণে কর্মসূচি স্থগিতের খবর এসেছিল।
ফলে খুলনার স্টেশনগুলোতে মঙ্গলবারের দীর্ঘ লাইনকে শুধু স্থানীয় কোনো একটি স্টেশনের সমস্যা হিসেবে দেখার সুযোগ কম। একদিকে জাতীয় পর্যায়ে গ্যাস সরবরাহের চাপ, অন্যদিকে এলপিজি আমদানির গতি কমে যাওয়া- দুই ধরনের সংকটই স্থানীয় বাজারে এসে মিলছে।


তবে দাম বাড়ার আশঙ্কা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। ইতিমধ্যে নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে এলপিজি বিক্রির অভিযোগ উঠেছে দেশের বিভিন্ন এলাকায়। একই সঙ্গে মজুত করে কৃত্রিম সংকট তৈরি করলে ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারিও দিয়েছে সরকার।
খুলনায় এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে পরিবহন খাতে। সিএনজি চালক ইদ্রিস বলেন, দুপুর ১২টা থেকে লাইনে দাঁড়িয়ে বিকেল পর্যন্ত গ্যাস পাননি। তাঁর ভাষায়, ‘আজকের দিনের ইনকাম শেষ।’ গাড়ি চালাতে না পারায় ভ্যানচালককে ২০০ টাকা দিয়ে গাড়ি সরিয়ে নিতে হয়েছে।


এলপিজি ব্যবহারকারী গাড়ির মালিক আরিফ আহমেদ জানান, সোমবার খালাসির মোড়ের একটি স্টেশনে গ্যাস না পেয়ে ডুমুরিয়া থেকে ফেরার পথে এলপিজি শেষ হয়ে গেলে অকটেনে গাড়ি চালাতে হয়েছে। আব্দুল ওয়াদুদও মঙ্গলবার সকালে নগরীর একাধিক স্টেশনে ঘুরে এলপিজি পাননি।


অর্থাৎ সংকটের কারণ একক নয়- সরবরাহ ঘাটতি, আমদানি ও পরিবহন পরিস্থিতি, গ্যাসের জাতীয় সংকট এবং বাজারে দাম বাড়ার প্রত্যাশা—সবই এর সঙ্গে যুক্ত। এর মধ্যে কোথাও মজুতদারি বা কৃত্রিম সংকট তৈরি হচ্ছে কি না, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন। আর সেই প্রশ্নের উত্তর না মিললে গ্যাসের জন্য দীর্ঘ লাইনই শুধু বাড়বে না, বাড়তে পারে পরিবহন ব্যয় ও সাধারণ মানুষের ভোগান্তিও।