/ মাঠ ছাড়িয়ে গ্লোবাল মার্কেট, বদলে যাচ্ছে রূপসা

মাঠ ছাড়িয়ে গ্লোবাল মার্কেট, বদলে যাচ্ছে রূপসা

এইচ এম রোকন, রূপসা(খুলনা) ঃ সবুজ শস্যের বিস্তীর্ণ ক্যানভাস আর অপার অর্থনৈতিক সম্ভাবনার এক চেনা জনপদ খুলনা জেলার রূপসা উপজেলা। তবে একসময় এখানকার গ্রামীণ অর্থনীতির চাকা প্রথাগত এক-ফসলি কৃষিকাজ কিংবা সনাতন মৎস্য ঘেরের বৃত্তে আটকে থাকলেও, আজ সেখানে লেগেছে আধুনিকতার ছোঁয়া। তথ্যপ্রযুক্তির অভাবনীয় প্রসার এবং একই জমিতে স্বল্পমেয়াদি উচ্চ ফলনশীল জাত আবাদের বৈপ্লবিক পরিবর্তনের ফলে উপজেলার গ্রামীণ অর্থনীতিতে এখন এক অভূতপূর্ব ও দৃশ্যমান রূপান্তর ঘটেছে। মাঠের বিষমুক্ত সবজি ও বারোমাসি ধান চাষ থেকে শুরু করে ঘরের কোণে বসে তরুণদের গ্লোবাল ফ্রিল্যান্সিং মার্কেটপ্লেস জয় সব মিলিয়ে দ্রুত বদলে যাচ্ছে রূপসার সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার মান, যা এখন পুরো খুলনাঞ্চলের জন্য এক অনুকরণীয় মডেল।


উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মাঠপর্যায়ের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, রূপসার আইচগাতী, শ্রীফলতলা এবং ঘাটভোগ ইউনিয়নের কৃষকেরা এখন আর সনাতন বা ভাগ্যনির্ভর চাষাবাদের ওপর আটকে নেই। জলবায়ু পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে স্বল্প মেয়াদি ধানের জাত উদ্ভাবন হওয়ায় কৃষকেরা একই জমিতে বছরে চারবার ফসল আবাদের ফোর-ক্রপ মডেলে বাজিমাত করছেন। কৃষকেরা আউশ, আমন ও বোরো ধান চাষের পাশাপাশি মধ্যবর্তী সময়ে সরিষা বা শীতকালীন বাম্পার সবজি আবাদ করছেন। বিশেষ করে ব্রি ধান-৪৮, ব্রি ধান-৯৮ ও বিনা ধান-১৯ এর মতো স্বল্পমেয়াদি আউশ জাতগুলো চাষের ফলে ধান কাটার পর অনায়াসেই জমিতে আরেকটি ফসল ফলানো সম্ভব হচ্ছে, যা কৃষকের ঘরে বারোমাসি অর্থ এনে দিচ্ছে।ঘাটভোগ ইউনিয়নের তিলক গ্রামের প্রত্যন্ত মাঠে গিয়ে দেখা যায় আধুনিক চাষাবাদের এক মহা কর্মযজ্ঞ। সেখানকার সফল চাষি আব্দুল মজিদ এবার নিজের আড়াই বিঘা জমিতে পর্যায়ক্রমে ধান ও শীতকালীন সবজি চাষ করে রেকর্ড মুনাফা করেছেন। ঘামঝরা হাসিতে তিনি এ প্রতিবেদককে বলেন, বাপ-দাদার আমলে দেখতাম বছরে একটা বা দুইটা ফসল তুলে বাকি সময় জমি অলস ফেলে রাখতি হতো, অভাব লেগে থাকত বারো মাস। এখন কৃষি অফিসের পরামর্শে উন্নত বীজ আর আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে আমরা একই জমিতে বছরে চারবার ফসল পাচ্ছি। সবচেয়ে বড় কথা, এখন আর ফড়িয়া বা দালালের খপ্পরে পড়তে হয় না, খেতের মাল সরাসরি খুলনা শহরে নিয়ে ভালো দামে বেচতে পারছি। একই এলাকার নারী উদ্যোক্তা ও সবজি চাষি রাবেয়া খাতুন জানান, প্রযুক্তির কারণে এখন আমরা ঘরে বসেই জানতে পারি কোন সারে কী কাজ হয়। বিষমুক্ত সবজি চাষ করায় বাজারে আমাদের মালের চাহিদা সবচেয়ে বেশি এবং রূপসা ব্রিজের কারণে যাতায়াত সহজ হওয়ায় খুলনা শহরের বড় পাইকাররা ক্ষেত থেকেই মাল কিনে নিয়ে যাচ্ছে।কৃষিবিপ্লবের পাশাপাশি রূপসার তরুণদের বড় একটি অংশ এখন প্রথাগত চাকরির পেছনে ছুটে সময় নষ্ট না করে ফ্রিল্যান্সিং এবং ই-কমার্সের দিকে ঝুঁকছে। উপজেলার আইচগাতী ও নৈহাটি ইউনিয়নের শিক্ষিত তরুণেরা ঘরে বসেই ইউরোপ-আমেরিকার বিভিন্ন আইটি প্রজেক্টে কাজ করছেন। গ্রাফিক্স ডিজাইন, ওয়েব ডেভেলপমেন্ট ও ডিজিটাল মার্কেটিংয়ের মাধ্যমে উপার্জিত এ ডিজিটাল রেমিট্যান্স সরাসরি গ্রামীণ অর্থনীতিকে মজবুত করছে। অন্যদিকে, উপজেলার ডেইরি ও মৎস্য খামারিরা এখন ফেসবুক ও বিভিন্ন ই-কমার্স প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে সরাসরি ভোক্তাদের কাছে খাঁটি দুধ, ঘি এবং মাছ পৌঁছে দিচ্ছেন। ফলে মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য চিরতরে বন্ধ হয়েছে এবং খামারিরা সরাসরি ন্যায্য মূল্য পাচ্ছেন।
উপজেলার সামগ্রিক অর্থনৈতিক ও কৃষি রূপান্তর সম্পর্কে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা তরুন কুমার বালা অত্যন্ত আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, রূপসার কৃষিতে এখন আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার শতভাগ নিশ্চিত করা হচ্ছে। বিশেষ করে স্বল্প মেয়াদি আউশ চাষের ফলে কৃষকেরা একই জমিতে বহু-ফসলি চাষাবাদ করতে পারছেন, যা গ্রামীণ অর্থনীতিতে এক বড় ধাক্কা দিয়েছে। উন্নত বীজ, সুষম সার ও সরকারি প্রণোদনা সরাসরি প্রকৃত কৃষকের হাতে পৌঁছানোর কারণে ফসলের উৎপাদন খরচ অনেক কমেছে। আমরা নিয়মিত মাঠপর্যায়ে গিয়ে কৃষকদের কারিগরি সহায়তা দিচ্ছি, যার ফলে রূপসার গ্রামীণ অর্থনীতিতে একটি স্থায়ী ও টেকসই রূপ এসেছে।যোগাযোগ অবকাঠামোর দিক থেকে রূপসা সেতু (খান জাহান আলী সেতু) উপজেলার সাথে খুলনা জেলা সদর এবং মোংলা বন্দরের দূরত্বকে একদম শূন্যের কোঠায় নামিয়ে এনেছে, যা কৃষি ও মৎস্য পণ্য দ্রুত বাজারজাতকরণে আশীর্বাদ হয়ে দাঁড়িয়েছে। যদিও জলবায়ু পরিবর্তন, অতিবৃষ্টি বা অনাবৃষ্টি এবং কিছু এলাকায় আবাদি জমি হ্রাসের মতো প্রাকৃতিক ও মানবসৃষ্ট চ্যালেঞ্জ রয়েছে, তবুও রূপসার এ প্রযুক্তি ও আধুনিক কৃষিনির্ভর অর্থনৈতিক মডেলটি অনন্য। স্থানীয় অর্থনীতিবিদ ও সমাজ সচেতন মহলের মতে, রূপসার এ সফল মডেলটিকে যদি প্রাতিষ্ঠানিক ঋণ সুবিধা এবং আরও উন্নত কারিগরি সহায়তার আওতায় আনা যায়, তবে আগামী কয়েক বছরে রূপসা উপজেলাই খুলনা জেলার অন্যতম প্রধান অর্থনৈতিক চালিকাশক্তিতে পরিণত হবে।