দুই যৌনপল্লিতে প্রায় ২২০ যৌনকর্মী, চলছে স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও কাউন্সেলিং
প্রদীপ ঘোষ, যশোরঃ বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সীমান্তবর্তী জেলা যশোরে এইচআইভি-এইডস সংক্রমণের সামগ্রিক ঝুঁকি বাড়লেও যৌনপল্লিগুলোতে যৌনকর্মীদের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগ অব্যাহত রয়েছে। নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা, কাউন্সেলিং, এইচআইভি পরীক্ষা ও নিরাপদ যৌন আচরণে সচেতনতা তৈরির পাশাপাশি বিভিন্ন উন্নয়ন সংস্থা যৌথভাবে কাজ করছে। তবে যৌনকর্মীদের মধ্যে বিনামূল্যে সরবরাহ করা সরকারি কনডম বর্তমানে বন্ধ থাকায় নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, যশোর শহরের মাড়ুয়া মন্দিরসংলগ্ন ও ঝালাইপট্টি এলাকার দুটি যৌনপল্লিতে প্রায় ২২০ জন যৌনকর্মী রয়েছেন। তাঁদের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় আগে সরকারি উদ্যোগে নিয়মিত কনডম সরবরাহ করা হলেও বর্তমানে তা বন্ধ রয়েছে। কিছু বেসরকারি সংস্থা কনডম সরবরাহ করলেও প্রয়োজনের তুলনায় তা অপ্রতুল বলে সংশ্লিষ্টদের দাবি।
বিশেষজ্ঞ ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, রক্ত ও যৌন সংস্পর্শসহ বিভিন্ন মাধ্যমে এইচআইভি ছড়াতে পারে। তাই যৌনকর্মীদের পাশাপাশি তাঁদের গ্রাহকদের নিরাপদ যৌন আচরণ নিশ্চিত করা জরুরি। যৌনপল্লিতে নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা, যৌনবাহিত সংক্রমণ (এসটিআই) শনাক্ত ও চিকিৎসা এবং এইচআইভি পরীক্ষা সংক্রমণ প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
যৌনকর্মীদের জন্য বিশেষায়িত ড্রপ-ইন সেন্টার (ডিআইসি) ও ‘সুখ পাখি’ কেন্দ্রের মাধ্যমে স্বাস্থ্যসেবা দেওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে। এসব কেন্দ্রে যৌনবাহিত রোগের পরীক্ষা ও চিকিৎসার পাশাপাশি এইচআইভি পরীক্ষা এবং কাউন্সেলিং করা হয়।
সংশ্লিষ্টরা জানান, গোপনীয়তা বজায় রেখে ‘র্যাপিড টেস্ট কিট’-এর মাধ্যমে দ্রুত এইচআইভি স্ক্রিনিং করা যায়। কারও পরীক্ষার ফল পজিটিভ এলে তাকে মানসিকভাবে ভেঙে না পড়তে পেশাদার কাউন্সেলিং দেওয়া হয়। প্রয়োজন হলে পরবর্তী চিকিৎসার জন্য তাকে সরকারি হাসপাতালে পাঠানো হয়।
স্বাস্থ্যকর্মীদের পাশাপাশি যৌনপল্লির অভিজ্ঞ কর্মীদের প্রশিক্ষণ দিয়ে ‘পিয়ার এডুকেটর’ হিসেবে তৈরি করা হয়েছে। তাঁরা সহকর্মীদের নিরাপদ যৌন আচরণ, এইচআইভি পরীক্ষা ও সংক্রমণ প্রতিরোধের বিষয়ে সচেতন করেন। প্রয়োজন হলে পরীক্ষাকেন্দ্রে যেতেও উৎসাহিত করেন তাঁরা।
এইচআইভি ও অন্যান্য যৌনবাহিত রোগ প্রতিরোধে কনডম ব্যবহারকে কার্যকর সুরক্ষা ব্যবস্থাগুলোর একটি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। যৌনপল্লিতে কনডমের ব্যবহার নিশ্চিত করতে বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি প্রকল্পের মাধ্যমে বিনামূল্যে কনডম সরবরাহ করা হয়ে থাকে।
যৌনকর্মীদের গ্রাহকদের সঙ্গে কনডম ছাড়া যৌনসম্পর্কে না যেতে রাজি করানোর জন্য দর-কষাকষির কৌশলও শেখানো হয়। পিয়ার এডুকেটররা নিয়মিত এ বিষয়ে সচেতনতা তৈরি করেন।
তবে সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, আগে সরকারি ব্যবস্থাপনায় নিয়মিত কনডম সরবরাহ করা হলেও বর্তমানে সেই সরবরাহ বন্ধ রয়েছে। কিছু এনজিও কনডম সরবরাহ করলেও প্রয়োজনের তুলনায় পরিমাণ কম হওয়ায় সংকট তৈরি হচ্ছে।
এইচআইভি পজিটিভ রোগীদের দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসার জন্য যশোর ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালে অ্যান্টিরেট্রোভাইরাল থেরাপি (এআরটি) সেন্টার চালু রয়েছে। যৌনপল্লিতে কোনো কর্মী এইচআইভি আক্রান্ত হিসেবে শনাক্ত হলে তাঁকে ওই কেন্দ্রে রেফার করা হয়।
সেখান থেকে বিনামূল্যে নিয়মিত এআরটি ওষুধ দেওয়া হয়। এ চিকিৎসায় শরীরে ভাইরাসের মাত্রা কমিয়ে আনা সম্ভব হয়। ফলে আক্রান্ত ব্যক্তির কাছ থেকে অন্যদের মধ্যে সংক্রমণের ঝুঁকিও উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, যশোরের যৌনপল্লিগুলোতে এইচআইভি প্রতিরোধ ও স্বাস্থ্য সুরক্ষার বড় একটি অংশ আন্তর্জাতিক ও দেশীয় অর্থায়নের ওপর নির্ভরশীল। সাম্প্রতিক সময়ে অর্থায়ন সংকটের কারণে কিছু ড্রপ-ইন সেন্টার বন্ধ হয়ে গেছে। একই সঙ্গে বিনামূল্যে কনডম সরবরাহেও ঘাটতি দেখা দিয়েছে।
এতে স্বাস্থ্য পরীক্ষা, কাউন্সেলিং, সচেতনতা কার্যক্রম ও নিরাপদ যৌন আচরণ নিশ্চিত করার সামগ্রিক ব্যবস্থায় কিছুটা ঝুঁকি তৈরি হয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বঞ্চিতা মহিলা ও শিশু উন্নয়ন সংস্থার নির্বাহী পরিচালক নুরুননাহার বলেন, সীমান্তবর্তী জেলা হওয়ায় ভারত থেকে বিভিন্ন ধরনের মানুষ যশোরে প্রবেশ করেন। তাঁদের অনেকে যৌনপল্লি ও ভ্রাম্যমাণ যৌনকর্মীদের কাছে যান। ফলে তাঁদের মাধ্যমে বিভিন্ন ধরনের যৌনবাহিত রোগ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
তিনি বলেন, ভ্রাম্যমাণ যৌনকর্মীদের মধ্যেও অনেকের এইচআইভি শনাক্ত হয়েছে। ফলে তাঁদের মাধ্যমে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকিও রয়েছে।
নুরুননাহার আরও বলেন, যশোরের দুটি যৌনপল্লিতে থাকা প্রায় ২২০ জন যৌনকর্মীর নিয়মিত কাউন্সেলিং করা হয়। বিভিন্ন এনজিওর মাধ্যমে তাঁদের কনডম সরবরাহ করা হলেও আগে সরকারি ব্যবস্থাপনায়ও কনডম দেওয়া হতো। বর্তমানে সরকারি পর্যায়ে সেই সরবরাহ আর হচ্ছে না।