মেহেদী হাচান : আসন্ন ঈদ-উল-আজহাকে ঘিরে খুলনাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে কোরবানির পশুর হাট প্রস্তুত হচ্ছে জোরেশোরে। সরকারি হিসেবে খুলনা অঞ্চলে এবার পশুর কোনো সংকট নেই, বরং চাহিদার তুলনায় উল্লেখযোগ্য পরিমাণ পশু উদ্বৃত্ত থাকবে। কিন্তু সেই পরিসংখ্যানের আড়ালে খুলনার খামারিদের বাস্তবতা অনেকটাই ভিন্ন। পশুখাদ্যের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি, খামার পরিচালনার বাড়তি ব্যয় এবং ন্যায্যমূল্য না পাওয়ার শঙ্কায় উদ্বেগ-উৎকণ্ঠায় দিন কাটছে তাদের। অনেক ক্ষুদ্র খামারি ইতোমধ্যে খামার ছেড়ে দিয়েছেন। আবার কেউ কেউ ভবিষ্যতে পশু পালনের আগ্রহও হারাচ্ছেন।
খুলনার বিভিন্ন খামার ঘুরে দেখা গেছে, এবার কোরবানির জন্য দেশি জাতের পাশাপাশি শাহিওয়াল ও ফ্রিজিয়ান জাতের গরুও প্রস্তুত করেছেন খামারিরা। অধিকাংশ খামারেই গরু মোটাতাজাকরণে প্রাকৃতিক খাদ্যের ব্যবহার বাড়ানো হয়েছে। তবে খাদ্য খরচ বেড়ে যাওয়ায় সেই প্রস্তুতিই এখন বড় চাপ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
খামারিদের ভাষ্য, কয়েক মাস ধরেই খড়, ভুষি, খৈল ও দানাদার খাবারের দাম অস্বাভাবিক হারে বেড়েছে। প্রতিটি গরুর পেছনে এখন প্রতিদিন ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা পর্যন্ত খাদ্য ব্যয় করতে হচ্ছে। অথচ বাজারে সেই অনুপাতে দাম পাওয়া নিয়ে রয়েছে অনিশ্চয়তা।
ডুমুরিয়ার ক্ষুদ্র খামারি আলতাফ বলেন, দানাদার খাবারের দাম যেভাবে বাড়ছে, তাতে আগ্রহ থাকলেও মানুষ আর খামার টিকিয়ে রাখতে পারবে না। একটি গরুকে প্রতিদিন ৫০০-৬০০ টাকার খাবার খাওয়াতে হয়। এটা কোথা থেকে দেবে মানুষ? খামার কমে যাচ্ছে দিন দিন।
আরেক খামারি আসাবুর জানান, শুধু খাদ্যের দাম নয়, খামার পরিচালনার অন্যান্য ব্যয়ও বেড়েছে। তিনি বলেন, প্রতি মাসে অন্তত ৩০ হাজার টাকা ভাড়া দিতে হয়। খাবারের দাম আর খামারের ভাড়ার কারণে অনেকেই খামার ছেড়ে চলে গেছেন।
স্থানীয় খামারিদের অভিযোগ, কোরবানির সময় বাজারে দালাল ও মধ্যস্বত্বভোগীদের আধিপত্যের কারণে প্রকৃত উৎপাদকরা ন্যায্যমূল্য পান না। উৎপাদন খরচ বাড়লেও শেষ পর্যন্ত লাভের বড় অংশ চলে যায় ব্যবসায়ী ও পাইকারদের হাতে। ফলে মৌসুম শেষে অনেক খামারির হাতেই থেকে যায় ঋণের বোঝা।
তবে সরকারি পরিসংখ্যান বলছে, উৎপাদনের দিক থেকে এবার বেশ ভালো অবস্থানে রয়েছে খুলনা অঞ্চল। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, খুলনা বিভাগের ১০ জেলায় এবার কোরবানির পশুর চাহিদা রয়েছে ১০ লাখ ৭৯ হাজার ৪৪৯টি। বিপরীতে খামারিরা প্রস্তুত করেছেন ১৪ লাখ ৪৬ হাজার ৮০৯টি পশু। অর্থাৎ বিভাগে প্রায় ৩ লাখ ৬৭ হাজার ৩৬০টি পশু উদ্বৃত্ত থাকবে, যা চাহিদার তুলনায় প্রায় ৭৪ দশমিক ৬১ শতাংশ বেশি।
এবারের প্রস্তুত পশুর মধ্যে রয়েছে ষাঁড় ১ লাখ ৩০ হাজার ৪২৭টি, বলদ ৩২ হাজার ২৭টি, গরু ৮২ হাজার ৩০২টি, মহিষ ৪ হাজার ৮৯টি, ছাগল ৮ লাখ ৫১ হাজার ৩৭০টি, ভেড়া ৫১ হাজার ১৭৩টি এবং অন্যান্য ২১৬টি পশু।
খুলনা জেলা প্রাণিসম্পদ অফিসের তথ্য অনুযায়ী, জেলায় এবার কোরবানির পশুর চাহিদা ১ লাখ ৫৪ হাজার ৪৫৬টি। বিপরীতে উৎপাদন হয়েছে ১ লাখ ৬৩ হাজার ২২৯টি। ফলে উদ্বৃত্ত রয়েছে ৮ হাজার ৭৭৩টি পশু।
খুলনা জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডাঃ মোহাম্মদ শরিফুল ইসলাম বলেন, এবার আমাদের কোরবানির যোগ্য পশু আছে ১ লাখ ৬৩ হাজার ২২৯টি। চাহিদা ১ লাখ ৫৪ হাজার ৪৫৬টি। ঘাটতি নেই, বরং উদ্বৃত্ত আছে ৮ হাজার ৭৭৩টি পশু। বাইরের বা বিদেশি গরু আমদানির প্রয়োজন হবে না।
প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তারা বলছেন, এবার স্থানীয় খামারিরা তুলনামূলক বেশি সচেতন। হরমোন বা স্টেরয়েড ব্যবহার না করে দেশীয় পদ্ধতিতে পশু মোটাতাজাকরণের প্রবণতা বেড়েছে।
খুলনা প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের পরিচালক ড. মোহাম্মদ গোলাম হায়দার বলেন, খামারিরা এখন স্টেরয়েড বা ক্ষতিকর উপাদান ব্যবহার থেকে সরে এসেছে। স্থানীয় খাবার ব্যবহার করে প্রাকৃতিকভাবে গরু পালন করা হচ্ছে।
এদিকে ঈদ সামনে রেখে খুলনার বিভিন্ন এলাকায় পশুর হাট বসতে শুরু করেছে। তবে এখনো জমে ওঠেনি কেনাবেচা। অনেক ক্রেতাই শেষ সময় পর্যন্ত অপেক্ষা করছেন। তাদের আশা, শেষ মুহূর্তে দাম কিছুটা কমতে পারে।
খুলনা নগরীর ঐতিহ্যবাহী জোড়াগেট পশুর হাট এবারও পরিচালনা করবে খুলনা সিটি কর্পোরেশন। পরপর চারবার দরপত্র আহ্বান করেও কোনো ইজারাদার আগ্রহ না দেখানোয় নিজস্ব ব্যবস্থাপনাতেই হাট পরিচালনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সংস্থাটি।
কেসিসির বাজার শাখার কর্মকর্তা শেখ শফিকুল হাসান দিদার বলেন, চারবার টেন্ডার আহ্বান করার পরও কেউ অংশ নেয়নি। তাই সিটি কর্পোরেশন নিজেই হাট পরিচালনা করবে।
প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, জাল টাকা প্রতিরোধে পশুর হাটে ব্যাংকের বুথ থাকবে। এছাড়া পশু ও মানুষের চিকিৎসার জন্য মেডিকেল টিম এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় অতিরিক্ত টহলের ব্যবস্থাও রাখা হবে।
তবে খামারিদের প্রশ্ন, শুধু উৎপাদনের হিসাব দিয়ে কি বাস্তব সংকট আড়াল করা সম্ভব? তাদের মতে, খাদ্যের দাম নিয়ন্ত্রণ, সহজ শর্তে ঋণ এবং বাজার মনিটরিং জোরদার না হলে স্থানীয় খামার টিকিয়ে রাখা কঠিন হয়ে পড়বে। উৎপাদন বেশি হলেও ন্যায্যমূল্যের নিশ্চয়তা না থাকায় তাই ঈদের আগেও স্বস্তি ফিরছে না খুলনার খামারিদের জীবনে।