/ ডিজিটাল রূপান্তরের ত্রিমুখী সংকটের মধ্যেমুদ্রিত পত্রিকা প্রকাশনার চ্যালেঞ্জ ও করণীয়

ডিজিটাল রূপান্তরের ত্রিমুখী সংকটের মধ্যেমুদ্রিত পত্রিকা প্রকাশনার চ্যালেঞ্জ ও করণীয়

।। এস এম আতিয়ার রহমান।।
পরিবর্তনের সাথে অভিযোজন-এ আপ্তবাক্যের সাথে কিউ ইউ সর্ম্পক। যেখানে কিউ থাকে তার পাশে প্রায়শই ইউ বর্ণটি দেখা যায়। পরিবর্তনের সাথে খাপখাওয়াতে না পারলে টিকে থাকা যায় না-এটাই স্বাভাবিক। সংবাদপত্র ও সাংবাদিকতার গত দুই শতাব্দিকালের ইতিহাসে দীর্ঘকাল রূপান্তরের পরিক্রমা ছিলো শ্লথ। কিন্তু বিংশ শতাব্দিতে পরিবর্তনের ধারা ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে। প্রতি পঞ্চাশ বছরের মধ্যেকার পরিবর্তন ছিলো অনেকটা গৎবাঁধা ও ধীর। কিন্তু প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে সংবাদপত্র ও সাংবাদিকতায় বহুমুখী পরিবর্তনের ধারা তৈরি হয়। সংবাদপত্র ও সংবাদ মাধ্যম তথা সাংবাদিকতা প্রভাবক ও মনস্তাত্তিক ক্ষেত্রে বড় ধরনের প্রভাবক হিসেবে অবির্ভুত হয়। ক্যামেরা আবিস্কার ও তা সংবাদ মাধ্যমে ব্যবহার ইতিহাসের বাঁকে নতুন অধ্যায় সৃষ্টি করে। পঞ্চাশের দশকের আগেই তা রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ হিসেবে পরিগণিত হয়। বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ এতোটাই শক্তিশালী হয়ে ওঠে যে সরকার পতন, প্রেসিডেন্টের পদত্যাগ থেকে শুরু করে নানা ঘটনায় এক শক্তিশালী মাধ্যমের পাশাপাশি সামাজিক দর্পণের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়। মুদ্রিত পত্রিকায় ছবি প্রিন্ট পত্রিকার জন্য নতুন আকর্ষণ ও পাঠকের কাছে জনপ্রিয়তা বাড়ায়। এর পর টেলিভিশন সাংবাদিকতা নতুন এক প্রভাবক রূপে আবির্ভূত হলে পরির্তনের নতুন ধারা সৃষ্টি হয়। আর বিংশ শতাব্দির শেষ তিন দশকে ডিজিটাল দুনিয়ায় ক্রমাগত যে পরিবর্তন আসে তা দ্রুতই সাংবাদিকতার দীর্ঘ ধারায় পরিবর্তনের প্রক্রিয়া শুরু করে। অফসেট মুদ্রণ ও কম্পিউটার কম্পোজ নতুন মাত্রা যোগায়। পরিবর্তনকে আরও ত্বরাণি¦ত করে। মুদ্রিত সংবাদপত্রও নতুন প্রযুক্তি ব্যবহারে অ্রগসর হয়।


বর্তমান বিশ্ব দ্রুত ডিজিটাল রূপান্তরের মধ্য দিয়ে অগ্রসর হচ্ছে। তথ্যপ্রযুক্তির ব্যাপক বিস্তার মানুষের জীবনযাপন, যোগাযোগ এবং তথ্য গ্রহণের পদ্ধতিতে আমূল পরিবর্তন এনেছে। এর প্রভাব সবচেয়ে বেশি দৃশ্যমান সংবাদমাধ্যমে। একসময় মুদ্রিত পত্রিকা ছিল সংবাদ, মতামত ও জনমত গঠনের প্রধান মাধ্যম। কিন্তু বর্তমানে অনলাইন নিউজ পোর্টাল, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, মোবাইল অ্যাপ এবং তাৎক্ষণিক সংবাদসেবার বিস্তারে মুদ্রিত পত্রিকা ত্রিমুখী সংকটে পড়েছে। পাঠকসংখ্যা হ্রাস, বিজ্ঞাপন আয় কমে যাওয়া এবং প্রকাশনা ও বিতরণ ব্যয় বৃদ্ধি—এই তিন সংকট মুদ্রিত সংবাদপত্রের অস্তিত্ব ও ভবিষ্যতকে কঠিন করে তুলছে।


ডিজিটাল প্রযুক্তির কারণে মানুষের সংবাদ গ্রহণের অভ্যাস দ্রুত পরিবর্তিত হয়েছে। স্মার্টফোন ও ইন্টারনেটের মাধ্যমে মানুষ মুহূর্তেই দেশ-বিদেশের সংবাদ জানতে পারছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কোনো ঘটনা ঘটার সঙ্গে সঙ্গে তার খবর ছড়িয়ে পড়ছে। ফলে পরদিন সকালে মুদ্রিত পত্রিকায় সংবাদ পড়ার আগ্রহ অনেকের কাছে কমে গেছে। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্ম দ্রুত, সংক্ষিপ্ত ও সহজলভ্য ডিজিটাল কনটেন্টে বেশি অভ্যস্ত। তাই মুদ্রিত পত্রিকাকে পাঠকের পরিবর্তিত চাহিদা ও রুচির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে নিজস্ব শক্তি পুনর্নির্ধারণ করতে হবে।


মুদ্রিত পত্রিকার দ্বিতীয় বড় সমস্যা হলো বিজ্ঞাপন আয় কমে যাওয়া। বিজ্ঞাপনদাতারা এখন অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন। কারণ ডিজিটাল মাধ্যমে নির্দিষ্ট শ্রেণির মানুষের কাছে তুলনামূলক কম ব্যয়ে বিজ্ঞাপন পৌঁছানো এবং ফলাফল পরিমাপ করা সহজ। অন্যদিকে কাগজ, কালি, মুদ্রণ, পরিবহন, বিদ্যুৎ ও জনবল বাবদ ব্যয় ক্রমেই বাড়ছে। ফলে আয় ও ব্যয়ের ভারসাম্য বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়ছে। এ অবস্থায় আর্থিকভাবে টেকসই ব্যবসায়িক মডেল গ্রহণ জরুরি।


তৃতীয় সংকট হলো প্রযুক্তির সঙ্গে কার্যকরভাবে খাপ খাওয়ানো। শুধু মুদ্রিত সংস্করণ প্রকাশ করে বর্তমান প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশে টিকে থাকা কঠিন। সংবাদপত্রকে ওয়েবসাইট, মোবাইল অ্যাপ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং অন্যান্য ডিজিটাল মাধ্যমে শক্তিশালী উপস্থিতি গড়ে তুলতে হবে। এজন্য প্রয়োজন দক্ষ সাংবাদিক, তথ্যপ্রযুক্তিতে প্রশিক্ষিত কর্মী, আধুনিক সম্পাদনা ব্যবস্থা এবং দ্রুত সংবাদ পরিবেশনের সক্ষমতা। একই সঙ্গে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে ভুয়া তথ্য ও অপতথ্যের বিরুদ্ধে নির্ভরযোগ্য সংবাদমাধ্যম হিসেবে নিজেদের অবস্থান আরও শক্ত করতে হবে।


এই সংকট মোকাবিলায় প্রথমেই প্রিন্ট ও ডিজিটাল সংস্করণের মধ্যে সমন্বিত ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। মুদ্রিত পত্রিকায় তাৎক্ষণিক খবরের পরিবর্তে বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদন, অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা, সম্পাদকীয়, বিশেষ নিবন্ধ, তথ্যচিত্র ও জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়কে গুরুত্ব দেওয়া যেতে পারে। ডিজিটাল মাধ্যমে দ্রুত সংবাদ, ভিডিও, অডিও ও তথ্যভিত্তিক কনটেন্ট প্রকাশ করা উচিত। দ্বিতীয়ত, পাঠকের মতামত, আগ্রহ ও আচরণ বিশ্লেষণ করে সংবাদ পরিকল্পনা করতে হবে। স্থানীয় সংবাদ, শিক্ষা, কর্মসংস্থান, কৃষি, স্বাস্থ্য, অর্থনীতি ও নাগরিক সমস্যাকে গুরুত্ব দিলে পাঠকের আস্থা বাড়বে।


তৃতীয়ত, আয়ের বিকল্প উৎস সৃষ্টি করতে হবে। মুদ্রিত বিজ্ঞাপনের পাশাপাশি ডিজিটাল বিজ্ঞাপন, সাবস্ক্রিপশন, সদস্যপদ, বিশেষ প্রকাশনা, অনুষ্ঠান এবং গবেষণাভিত্তিক কনটেন্টের মাধ্যমে আয় বাড়ানো যেতে পারে। পাশাপাশি মুদ্রণ ও বিতরণ ব্যবস্থায় প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়িয়ে অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কমাতে হবে। সাংবাদিকদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ, নৈতিকতা ও তথ্য যাচাইয়ের সক্ষমতা বৃদ্ধিও জরুরি।


এ ছাড়া সংবাদপত্রের ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও পেশাদারিত্ব বাড়াতে হবে। শুধু প্রচলিত পদ্ধতির ওপর নির্ভর না করে পাঠকের প্রয়োজন অনুযায়ী নতুন বিভাগ, বিশেষ আয়োজন এবং তথ্যনির্ভর ধারাবাহিক প্রকাশনা চালু করা যেতে পারে। মুদ্রিত সংস্করণের মান, কাগজের গুণগত মান, উপস্থাপনা ও ভাষার শুদ্ধতার প্রতিও নজর দিতে হবে। একই সঙ্গে সংবাদ সংগ্রহ ও সম্পাদনায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসহ আধুনিক প্রযুক্তি দায়িত্বশীলভাবে ব্যবহার করা যেতে পারে। তবে প্রযুক্তি ব্যবহারের ক্ষেত্রে তথ্যের সত্যতা, গোপনীয়তা, কপিরাইট এবং সাংবাদিকতার নৈতিক মানদণ্ড অবশ্যই নিশ্চিত করতে হবে। রাষ্ট্র, গণমাধ্যম মালিক, সাংবাদিক এবং পাঠক—সবার সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া এই শিল্পের দীর্ঘমেয়াি উন্নয়ন সম্ভব নয়। বিশ্বাসযোগ্যতা রক্ষা করে জনস্বার্থকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিলেই সংবাদপত্রের সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা আরও শক্তিশালী হবে।


ডিজিটাল রূপান্তর মুদ্রিত পত্রিকার জন্য কেবল সংকট নয়; এটি পরিবর্তনের সুযোগও সৃষ্টি করেছে। মুদ্রিত পত্রিকার বিশ্বাসযোগ্যতা, সম্পাদনার মান, অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা ও জনসম্পৃক্ততার শক্তিকে অক্ষুণ্ন রেখে ডিজিটাল প্রযুক্তিকে সহযোগী হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। সময়োপযোগী পরিকল্পনা, দক্ষ মানবসম্পদ, আর্থিক শৃঙ্খলা এবং পাঠককেন্দ্রিক প্রকাশনা নীতির মাধ্যমে মুদ্রিত পত্রিকা নতুন বাস্তবতায়ও টিকে থাকতে পারে। প্রযুক্তির সঙ্গে প্রতিযোগিতা না করে প্রযুক্তিকে কাজে লাগানো এবং পাঠকের আস্থা ধরে রাখাই হবে ভবিষ্যতের সাফল্যের প্রধান চাবিকাঠি।


সংবাদপত্র এবং সাংবাদিকতা তথা পত্রিকা প্রকাশনা কর্তৃপক্ষকে প্রাতিষ্ঠানিক চিন্তাভানায় নিতে হবে। এটাকে প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ করতে পারলে কর্মরতদের মধ্যে পেশার প্রতি এবং তার কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রটি আরও আস্থাশীল করে তুলবে, দায়িত্বশীলতা ও জবাবদিহিতা বাড়াবে। কেবল কার্ডধারী সাংবাদিকের সংখ্যা বাড়লে এ পেশায় নানা বিপত্তি সৃষ্টি করবে ,পেশাগত উৎকর্ষের স্থলে সমাজে নেতিবাচক অভিক্ষেপ সৃষ্টি হবে। এই ধারা থেকে বের হতে সরকার ও গণমাধ্যম প্রতিনিধিদের নিয়ে একটি গ্রহণযোগ্য নীতিমালা প্রণয়ন এখন সময়ের দাবি।