/ জমি নেই, উঠোন নেই তবু সবুজের সংসার

জমি নেই, উঠোন নেই তবু সবুজের সংসার

আজ শেষ হচ্ছে খুলনার বৃক্ষমেলা, কোটি টাকার চারা বিক্রি

এম মুর্শেদ : শহরের বাসা। উঠোন নেই। জমি নেই। তবু গাছ লাগানোর ইচ্ছেটা যেন কিছুতেই মরে না। তাই ছাদে টব, বারান্দার রেলিং, জানালার কার্নিশ কিংবা ঘরের এক চিলতে কোণ যেখানে যতটুকু জায়গা, সেখানেই সবুজের সংসার পাতছেন নগরবাসী। কারও টবে দেশি আমলকী, কারও বারান্দায় বারোমাসি আমড়া। আবার কারও শখের তালিকায় জায়গা করে নিচ্ছে হাজার মাইল দূরের পার্সিমন, রামবুটান, ডুরিয়ান কিংবা অ্যাভোকাডো।


খুলনার সার্কিট হাউস মাঠে মাসব্যাপী বৃক্ষমেলার শেষ দিনে এসে যেন সেই বদলে যাওয়া শহরেরই ছবি চোখে পড়ে। স্টলে স্টলে ভিড়। কেউ পাতার আড়ালে ফল খুঁজছেন, কেউ গাছের দাম জানতে চাইছেন। কেউ আবার গাছটির চেয়েও বেশি কৌতূহলী এটি কোথাকার, কত দিনে ফল দেবে, টবে রাখা যাবে কি না।


একটি মাম্মি সফেদা গাছের দাম ৩০ হাজার টাকা। ফলসহ পার্সিমন ২৫ হাজার। রামবুটানের বড় গাছ ২০ থেকে ২৫ হাজার টাকা। দাম শুনে চোখ কপালে উঠলেও কৌতূহল কমছে না ক্রেতাদের। বরং বিদেশি ও দুর্লভ ফলের গাছের চারপাশেই সবচেয়ে বেশি ভিড়।
খুলনা জেলা প্রশাসন ও সুন্দরবন পশ্চিম বন বিভাগের যৌথ উদ্যোগে গত ১১ জুন শুরু হওয়া খুলনা বিভাগীয় বৃক্ষরোপণ অভিযান ও বৃক্ষমেলা শেষ হচ্ছে আজ মঙ্গলবার। আয়োজকদের তথ্য অনুযায়ী, মেলা শুরুর পর ১ মাসে বিভিন্ন প্রজাতির ৭১ হাজার ৮০১টি চারা বিক্রি হয়েছে। এসব চারার বিক্রিমূল্য ১ কোটি ৩ লাখ ৩৩ হাজার ৬শত ৪০ টাকা। গত রবিবার রাতেই বিক্রির অঙ্ক কোটি টাকা অতিক্রম করেছে।
গত বছর পুরো মেলায় ৪৩ হাজার ৭২১টি চারা বিক্রি হয়েছিল, যার মূল্য ছিল ৫৯ লাখ ৮৪ হাজার টাকা। সেই হিসাবে এবার এখন পর্যন্ত চারা বিক্রি বেড়েছে ২৮ হাজার ৮০টি । বিক্রির অর্থের পরিমাণও গত বছরের তুলনায় বেড়েছে প্রায় ৪৩ লাখ ৪৯ হাজার ৬৪০ টাকা।
মেলার নিয়ন্ত্রণ কক্ষে দায়িত্ব পালনকারী মো. জাকির হোসেন বলেন, ৩০ দিনে এক কোটি টাকার ওপরে চারা বিক্রি হয়েছে। শেষ দিনে বিক্রির পরিমাণ আরও বাড়বে বলে আশা করছেন তাঁরা।
বিক্রি হওয়া চারার মধ্যে সবচেয়ে বেশি চাহিদা ফলদ গাছের। গত রবিবার পর্যন্ত মেলায় মোট চারা বিক্রি হয়েছে ৭১ হাজার ৮০১টি ।
মেলার বিভিন্ন স্টলে দেশি ফলের পাশাপাশি থাই, ভিয়েতনামি ও দক্ষিণ আমেরিকার নানা দুর্লভ প্রজাতির গাছ বিক্রি হচ্ছে। করিম নার্সারির স্টলে যেন ছোট্ট এক বিদেশি ফলের বাগান। সেখানে ফলসহ রামবুটান ২৫ হাজার, ফলসহ আপেল ২৬ হাজার, পার্সিমন ২৫ হাজার, পিচ ১৫ হাজার, বেলজিয়াম লিচু ১২ হাজার, বলিভিয়ার আচচাইরু ১৫ হাজার, ডুরিয়ান ১২ হাজার এবং রুবি লংগান ৬ হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
করিম নার্সারির স্বত্বাধিকারী মো. আকবার বিন ওসমানী বলেন, নতুন ও কৌতূহল জাগানো বিদেশি ফলের গাছের প্রতি মানুষের আগ্রহ বেড়েছে। আগে যেখানে ক্রেতারা পরিচিত ফলের চারার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকতেন, এখন অনেকেই নতুন জাতের গাছ সম্পর্কে জানতে চাইছেন, দাম বেশি হলেও কিনছেন।
নার্সারির এক কর্মকর্তা বলেন, আল্লাহর রহমতে এ বছর বেচাকেনা ভালো হয়েছে। প্রচুর মানুষ আসছেন, গাছ কিনছেন। একই সঙ্গে তাঁরা বিভিন্ন প্রজাতির গাছের সঙ্গে পরিচিতও হচ্ছেন।
মেলায় দেখা হয় রূপসা নদীর ওপারের রুপসার এলাকার ক্রেতা ইসহাকের সঙ্গে। তাঁর কাছে গাছ কেনা নিছক শখ নয়, অনেকটা নেশা। একবারে নয়, কয়েক দফায় কিনেছেন বিপুলসংখ্যক গাছ। কিনেছেন থাই আমলকী, করসল, ভ্যারিগেটেড সফেদা, বারোমাসি আমড়া, ব্যানানা ম্যাঙ্গো ও বারোমাসি জলপাইসহ বিভিন্ন প্রজাতির গাছ। তাঁর কথায়, মেলার পরিবেশ ও শৃঙ্খলা ভালো। গাছের দামও সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে।
এই ক্রেতার গল্পটিই যেন বদলে যাওয়া শহরের গল্প। একসময় বাগান মানেই ছিল বাড়ির উঠোন। এখন সেই বাগান উঠে এসেছে ছাদে, বারান্দায়, জানালার পাশে কিংবা ঘরের ভেতরে। জায়গা কমেছে, কিন্তু সবুজের আকাঙ্ক্ষা কমেনি।
করিম নার্সারির পক্ষ থেকে বলা হয়, সবার বাড়ি বা জমি নেই। অনেকে ভাড়া বাসায় থাকেন। কিন্তু তাঁদেরও গাছ লাগানোর আগ্রহ রয়েছে। ফলে ইনডোর প্ল্যান্ট ও শোভাবর্ধনকারী গাছের ক্রেতা বাড়ছে।
মেলার ভিড় দেখে সাফল্যের ছবি ফুটে উঠলেও বিক্রেতাদের কথায় উঠে এসেছে কিছু অসুবিধার কথা। রাবেয়া নার্সারির এক বিক্রেতার অভিযোগ, আগের বছর মাঠের অন্য পাশে নার্সারি থাকায় ক্রেতারা গাড়ি নিয়ে প্রায় স্টলের কাছাকাছি যেতে পারতেন। গাড়ি রাখার ব্যবস্থাও ছিল। ফলে একসঙ্গে বড় পরিমাণে গাছ কেনার সুযোগ পেতেন ক্রেতারা।
এবার নার্সারিগুলো মাঠের এমন অংশে রাখা হয়েছে, যেখানে গাড়ি প্রবেশ ও পার্কিংয়ের সুযোগ খুবই সীমিত। ফলে বেশি পরিমাণে গাছ কিনতে আগ্রহী ক্রেতারা সমস্যায় পড়ছেন।
ওই বিক্রেতার ভাষায়, আগে দুই-তিন পিকআপ করে গাছ বিক্রি হয়েছে। এবার একটি পিকআপও বিক্রি হয়নি। গাড়ি রাখার ব্যবস্থা থাকলে বেচাকেনা আরও ভালো হতো।
কেন তাঁদের ওই অংশে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে, সে বিষয়ে আয়োজকদের কাছ থেকে স্পষ্ট ব্যাখ্যা পাননি বলেও দাবি করেন তিনি। তবে মালিক সমিতির মাধ্যমে তাঁরা জানতে পেরেছেন, মাঠে খেলাধুলা চালু রাখার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে নার্সারিগুলো অন্য পাশে রাখা হয়েছে।
মালঞ্চ পুষ্পকেন্দ্র নার্সারির মালিক মো. ওয়াহিদুল ইসলাম অবশ্য জানান, গতবারের তুলনায় এবার বিক্রি ভালো হয়েছে। তবে মেলাটি শহরের প্রাণকেন্দ্র শিববাড়ী মোড়ের জিয়া হল চত্বরে আয়োজন করা হলে কেনাবেচা আরও বাড়ত বলে মনে করেন তিনি।
আরেক বিক্রেতার মতে, দর্শনার্থীর পাশাপাশি ক্রেতার উপস্থিতিও ভালো ছিল। তবে মেলা আরও বড় পরিসরে আয়োজন করা গেলে ক্রেতা-বিক্রেতা উভয়েই লাভবান হতেন। একই সঙ্গে আরও বেশি নার্সারি অংশ নেওয়ার সুযোগ পেলে গাছের বৈচিত্র্যও বাড়ত।
প্রচার-প্রচারণা নিয়েও রয়েছে আক্ষেপ। বিক্রেতাদের মতে, খুলনা বিভাগীয় বৃক্ষমেলার খবর আরও ব্যাপকভাবে মানুষের কাছে পৌঁছানো দরকার ছিল। স্থানীয় নার্সারিতে নানা প্রজাতির গাছ থাকলেও প্রচারের ঘাটতির কারণে অনেক সম্ভাব্য ক্রেতাই মেলার খবর জানেন না।
তবে এই মেলার গল্প শুধু চারা কেনাবেচার নয়। প্রবেশমুখেই দর্শনার্থীদের জন্য তৈরি করা হয়েছে এক টুকরো সুন্দরবন।
বাংলাদেশ বন গবেষণা ইনস্টিটিউটের ম্যানগ্রোভ সিলভিকালচার বিভাগ কৃত্রিমভাবে তৈরি করেছে একটি ম্যানগ্রোভ নার্সারি। সেখানে সুন্দরী, পশুর ও ভাতকাঠি গাছের পাশাপাশি রূপ দেওয়া হয়েছে লাল ও সাদা কাঁকড়ার বিচরণভূমির।
এক পাশে ফরমালিনে সংরক্ষিত সুন্দরবনের বিরল উদ্ভিদ ও ফলের নমুনা। কোথাও সাপ, কোথাও মাছ। রয়েছে বাঘের মাথার খুলির সংরক্ষিত নমুনাও। শিক্ষার্থী ও তরুণ দর্শনার্থীদের কাছে জায়গাটি তাই মেলার ভেতরেই যেন আরেকটি ছোট্ট পাঠশালা বইয়ের পাতায় নয়, চোখের সামনে সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্যকে চেনার সুযোগ।
আজ মেলা শেষ হবে। স্টল গুটিয়ে যাবে, টবভর্তি গাছ উঠবে ভ্যান বা পিকআপে। কিন্তু মেলার আসল গল্পটি হয়তো থেকে যাবে শহরের ঘরে ঘরে।
কারও হাতে ৩০ হাজার টাকার মাম্মি সফেদা, কারও বারান্দায় ছোট্ট রামবুটান, কারও জানালার পাশে একটি ইনডোর প্ল্যান্ট। কারও ছাদে হয়তো আগামী বছর ফল ধরবে পার্সিমন।
জায়গা ছোট হয়েছে, শহর কংক্রিটে ঢেকেছে কিন্তু মানুষের সবুজের স্বপ্নটা ছোট হয়নি। বরং সেই স্বপ্ন এখন টবের মাটিতে, বারান্দার রোদে, ছাদের কোণে নতুন করে শিকড় ছড়াচ্ছে।
মেলা শেষ হচ্ছে আজ। সবুজের এই মেলা অবশ্য শেষ হওয়ার নয়।