/ যশোরের ভবদহে জলাবদ্ধতা এবারও বোরোর আবাদ হলো না ৭ হাজার হেক্টর জমিতে

যশোরের ভবদহে জলাবদ্ধতা এবারও বোরোর আবাদ হলো না ৭ হাজার হেক্টর জমিতে

রিপন হোসেন সাজু, নেহালপুর (মনিরামপুর) : যশোরের ভবদহ অঞ্চলের বেশিরভাগ বিল ভরে আছে গত বর্ষার পানিতে। বিলের কোথাও কোমর সমান আবার কোথাও বুক সমান পানি। বিলের জমিতে এলাকার বেশিরভাগ কৃষক এবারও বোরো ধানের চাষ করতে পারেননি। যশোরের মনিরামপুর, অভয়নগর, ও কেশবপুর উপজেলা এবং খুলনার ডুমুরিয়া ও ফুলতলা উপজেলার অংশবিশেষ ভবদহ অঞ্চল হিসেবে পরিচিত। ভবদহ অঞ্চলে অন্তত ৫২টি ছোট-বড় বিল আছে। মুক্তেশ্বরী, টেকা, শ্রী ও হরি নদ-নদীর জোয়ারভাটার সঙ্গে এসব বিলের পানি ওঠানামা করে। কিন্তু পলি পড়ায় নদীগুলো নাব্যতা হারিয়েছে। ফলে এসব নদী দিয়ে এখন ঠিকমতো পানি নিষ্কাশন হয় না। প্রতিবছর বর্ষা মৌসুমে অতিবৃষ্টিতে এলাকার বিলগুলো প্লাবিত হয়। বিল উপচে পানি ঢোকে বিলসংলগ্ন গ্রামগুলোতে। সর্বশেষ গত বছরের ভারী বৃষ্টিপাতে মনিরামপুর, অভয়নগর ও কেশবপুর উপজেলার বিলসংলগ্ন গ্রামে পানি ঢুকে পড়ে। এসব গ্রামের বেশিরভাগ ঘরবাড়ি, ধর্মীয় ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, রাস্তাঘাট এবং মাছের ঘের পানিতে প্লাবিত হয়। পান্দিবন্দী হয়ে দুর্ভোগে পড়েন দুই লাখেরও বেশি মানুষ। এরপর ভবদহে শ্রী ও হরি নদীতে মাটি কাটার যন্ত্র দিয়ে পাইলট (পরীক্ষামূলক) চ্যানেল কাটার কাজ শুরু করে পানি উন্নয়ন বোর্ড। একপর্যায়ে বাড়িঘর থেকে পানি নেমে যায়। কিন্তু এখনো এই অঞ্চলের বেশিরভাগ বিল পানিতে তলিয়ে রয়েছে।


কৃষি-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, ডিসেম্বর থেকে শুরু করে এপ্রিল পর্যন্ত বোরো মৌসুম। বোরোর বীজতলা তৈরির সময় ১৫ ডিসেম্বর থেকে ১০ জানুয়ারি পর্যন্ত। বোরো ধানের চারা রোপণের সময় ১ থেকে ৩১ জানুয়ারি। নাবিতে ২০ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ধানর চারা রোপন করা যায়।

মনিরামপুর, অভয়নগর ও কেশবপুর উপজেলার কৃষি সম্প্রসারণ দপ্তর সূত্রে জানা গেছে, উপজেলা তিনটির ভবদহ অঞ্চলে কৃষক আছেন প্রায় ৫০ হাজার। ওই অঞ্চলে ২৪ হাজার ৯০৪ হেক্টর জমিতে বোরোর আবাদ হতো। এর মধ্যে অভয়নগর উপজেলায় ৭ হাজার ৪০০ হেক্টর, কেশবপুর উপজেলায় ৫ হাজার ৪০০ হেক্টর এবং মনিরামপুর উপজেলায় ১২ হাজার ১০৪ হেক্টর। এর মধ্যে এবার ১৭ হাজার ৬৬১ হেক্টর জমিতে বোরো ধানের চাষ হয়েছে। জলাবদ্ধতার কারণে এবার উপজেলার তিনটির ৭ হাজার ২৪৩ হেক্টর জমিতে বোরো চাষ হয়নি। এর মধ্যে অভয়নর উপজেলায় ১ হাজার ২৯০ হেক্টর, কেশবপুর উপজেলায় ২ হাজার ১৩০ হেক্টর এবং মনিরামপুর উপজেলায় ৩ হাজার ৮২৩ হেক্টর জমি রয়েছে। সূত্র জানায়, গত বছর এই অঞ্চলে ১৬ হাজার ৬৫৭ হেক্টর জমিতে বোরো ধানের চাষ হয়েছিল। গত বছরের চেয়ে এবার ১ হাজার ৪ হেক্টর বেশি জমিতে বোরো ধানের চাষ হয়েছে। গত এক সপ্তাহে ভবদহ অঞ্চলের অন্তত ১০টি বিল এলাকায় গিয়ে দেখা গেছে, বিলগুলো ভরে আছে পানিতে। বিল বোকড়, বিল কেদারিয়া, বিল কপালিয়া, বিল ডুমুর, বিল ঝিকরা, বিল গান্ধীমারি, বিল গজালমারি ও বিল পায়রায় শুধু পানি আর পানি। কোনো কোনো বিলের উপরের অংশ চারদিকে বাঁধ দিয়ে সেচযন্ত্র দিয়ে সেচে বোরো ধানের চাষ করা হয়েছে। তবে বেশিরভাগ বিলে কোনো ধানখেত নেই। বিলের পানিতে ভাসছে কিছু আগাছা, কচুরিপানা আর শাপলা।


মনিরামপুর উপজেলার নেবুগাতী গ্রামের কৃষক বিমল রায়ের (৬৮) বিল বোকড়ে জমি আছে ৯ বিঘা (৪২ শতকে বিঘা)। এর মধ্যে বিলের একটি মাছের ঘেরের মধ্যে তাঁর জমি আছে তিন বিঘা। সেচযন্ত্র দিয়ে সেচে তিনি এর মধ্যে দেড় বিঘা জমিতে বোরো ধানের চাষ করেছেন। তিনি বলেন,‘বিল বোকড়ে মুক্তেশ্বরী নদীর এক পাশে আমার ৬ বিঘা জমি আছে। ওই জমিতে এখনও পাঁচ থেকে সাত ফুট জল। সেখানে বোরো ধান চাষ সম্ভব না। নদীর অপর পাশে তিন বিঘা জমি আছে। জল অনেকটা কম থাকায় জল সেচে এর মধ্যে দেড় বিঘা জমিতে বোরো ধান করেছি।’


বিল ডুমুরে ১৫ বিঘা (৫২ শতকে বিঘা) জমি আছে মনিরামপুর উপজেলার হরিদাসকাটি গ্রামের কৃষক অসীম ধরের (৬৪)। ওই জমিতে বুক সমান পানি রয়েছে। এবার সেচযন্ত্র দিয়ে পানি সেচে তিনি আট বিঘা জমিতে বোরো ধান চাষ করেছেন। তিনি বলেন,‘বিলের ওপরের অংশে জল কম ছিল। সেচযন্ত্র দিয়ে সেচে আট বিঘা জমিতে বোরো ধানের চাষ করেছি। নিচের জমিতে অনেক জল। সেচের মতো অবস্থা নেই। ওই জমিতে ধান লাগানো সম্ভব হয়নি।’ অভয়নগর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা লাভলী খাতুন বলেন, ‘উপজেলার ভবদহ এলাকার জলাবদ্ধ বিলের পানি সেচে বোরো চাষ করেছেন কৃষকেরা। জলাবদ্ধ এলাকায় গত বছরের চেয়ে এবার ১৪০ হেক্টর বেশি জমিতে বোরো ধানের চাষ হয়েছে।’ মনিরামপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মাহমুদা আক্তার বলেন, ‘ভবদহ এলাকার ছোট বিলগুলো সেচে বোরো চাষের জন্য কৃষকেরা উদ্যোগী হয়েছেন। শেষ পর্যন্ত জলাবদ্ধ এলাকায় গতবছরের চেয়ে এবার বেশি জমিতে বোরোর চাষ হয়েছে। আরও কিছু জমিতে বোরো চাষ হতো। কিন্তু সেচের সময় বাঁধ ভেঙ্গে পানি ঢুকে তলিয়ে যাওয়ায় ২৫৫ হেক্টর জমিতে শেষ পর্যন্ত বোরো ধান চাষ সম্ভব হয়নি।’


কেশবপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মোঃ আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, ‘এলাকার কৃষকেরা ছোট বিলগুলো সেচে বোরো চাষের আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়েছেন। কিন্তু খননের জন্য নদীতে আড়াআড়ি বাঁধ দেওয়ায় শেষ সময়ে এসে নদী দিয়ে বিলের পানি নামতে পারেনি। পানি নামতে পারলে আরও অনেক বেশি জমিতে বোরো চাষ করা সম্ভব হতো।’ ভবদহ পানি নিষ্কাশন সংগ্রাম কমিটির যুগ্ম আহ্বায়ক গাজী আব্দুল হামিদ বলেন, ‘কৃষি অফিস ভবদহ অঞ্চলের কৃষি জমি এবং জলাবদ্ধ কৃষি জমির যে তথ্য দিয়েছে তা ঠিক নয়। এ তথ্য অগ্রহণযোগ্য এবং বিভ্রান্তিকর। প্রকৃতপক্ষে ভবদহ অঞ্চলের এর চেয়ে অনেক অনেক বেশি জমিতে এবার বোরো চাষ হচ্ছে না।’


পানি উন্নয়ন বোর্ড, যশোরের কার্যালয়ের নির্বাহী প্রকৌশলী পলাশ কুমার ব্যানার্জী বলেন, ‘ভবদহ এলাকার পানি নিষ্কাশনের জন্য নদী পুনঃখননের কাজ চলছে। নদীতে আড়াআড়ি বাঁধ দিয়ে সেচে নদী শুকিয়ে পুনঃখননের কাজ করা হচ্ছে। এলাকার বিলগুলোতে বোরো আবাদের জন্য তিন বার পিছিয়ে গত ১ জানুয়ারি নদীতে বাঁধ দেওয়া হয়েছে। ভবদহ ২১-ভেন্ট স্লুইসগেটের ১২টি গেট খোলা ছিল। এজন্য নদীতে বাঁধ দেওয়ার আগেই এলাকার বেশিরভাগ পানি দ্রুত নেমে গেছে। এজন্য এলাকার বিলগুলোতে গত বছরের চেয়ে এবার বেশি জমিতে বোরো ধানের চাষ হয়েছে।