/ অগ্নিঝরা মার্চ

অগ্নিঝরা মার্চ

স্টাফ রিপোর্টার : ১৯৭১ সালের ৫ মার্চ । বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসে মার্চ মাস বিশ্বের ভূখন্ডে নতুন একটি মানচিত্র তৈরির মাস।বিশ্ব ভূখন্ডে সৃষ্ট বাংলাদেশের ইতিহাসের বাঁক পরিবর্তনের মাস-উত্তাল এই মার্চ মাস। বাংলাদেশের জন্ম হয় এই উত্তাল মার্চেই।
১৯৭১সালের এইদিনে ক্ষোভে,প্রতিরোধে উত্তাল সারাদেশ। বাঙালীর চোখে শুধুই স্বাধীনতার স্বপ্ন। দেশজুড়ে মিছিল, মিটিং,বিক্ষোভ। চারদিকে স্বাধিকার আন্দোলন জোরদার করার কাজ চলছে। অসহযোগের মাধ্যমে আন্দোলন এগিয়ে যায় স্বাধীনতার অবশ্যম্ভাবী ও যৌক্তিক পরিণতির দিকে।


পাশাপাশি মৃত্যুর সংবাদ আসছে প্রতিদিন। কিন্তু ঘাতকের বুলেট মৃত্যুর মিছিল বাড়িয়ে দিলেও রুখতে পারেনি মুক্তিকামী বাঙালীর উত্তাল আন্দোলন। অন্যদিকে ভুট্টোর প্রাসাদে ইয়াহিয়া-ভুট্টো ডুয়েল ষড়যন্ত্রে ২০ হাজার বাঙালীর লাশ হলেই আন্দোলন থেমে যাবে-ভুট্টোর এই অভিলাষ বাস্তবায়ন করতে নেমে পড়ে পাক হানাদার বাহিনী। রক্তে রঞ্জিত হয় রাজপথ। একাত্তরের এই দিনে, চট্টগ্রামে স্বাধীনতার জন্য প্রাণ দেন ২২২ বীর বাঙালী। তাদের রক্তে ভেসে যায় বীর চট্টলার রাজপথ। টঙ্গীতে গুলিবর্ষণে হতাহত হয় ১৮ জন। যশোরেও নিহত হন মুক্তিকামী এক বাঙালী যুবক। এমন গণহত্যার সংবাদে রাজধানীসহ সারা দেশে মানুষ প্রতিবাদে ফেটে পড়ে, মিছিল-প্রতিবাদ সভায় কেঁপে ওঠে অত্যাচারী শাসকের ভিত। এ দিনে ঘটে এক অবিশ্বাস্য ঘটনা। ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার ভেঙ্গে ৩২৫ কয়েদি মিছিল করে শহীদ মিনারে চলে আসে এবং স্বাধীনতা সংগ্রামে যোগ দেয়। অবশ্য কারাগারের ফটক ভাঙ্গার সময় প্রহরীর গুলিতে সাত কয়েদিকে প্রাণ হারাতে হয়।


জনতার ওপর গুলিবর্ষণের প্রতিবাদে একাত্তরের এই দিনে পালিত হয় দেশব্যাপী সর্বাত্মক হরতাল। মুক্তিকামী বাঙালীর উত্তাল ও অপ্রতিরোধ্য দুর্বার আন্দোলনে পাকিস্তানী শাসকগোষ্ঠীর ভিত নড়ে ওঠে। নিরীহ মানুষের ওপর গুলিবর্ষণ থেকে শুরু করে সব ধরনের অত্যাচার-নির্যাতনের মাত্রা বাড়লেও দমেনি বাংলার প্রতিবাদী মানুষ। ঐতিহাসিক মার্চের এই দিনে ঘটে আরও অনেক উল্লেখযোগ্য ঘটনা। জাতীয় পরিষদের অধিবেশন স্থগিত করার ঘোষণাকে অবাঞ্ছিত ও অগণতান্ত্রিক ঘোষণা করে বেলুচিস্তান ন্যাপ।


এছাড়া ‘সংখ্যাগুরু দলের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করে দেশের সংহতি রক্ষা করা অপরিহার্য’ বলে এয়ার ভাইস মার্শাল (অব.) আসগর খান মন্তব্য করেন। মাওলানা গোলাম গাউস হাজারী জানিয়ে দেন,পশ্চিম পাকিস্তানের সব নির্বাচিত সদস্যের পক্ষ থেকে ভুট্টোর কথা বলার অধিকার নেই। মানিক গোলাম জিলানী বলেন, অবিলম্বে সংখ্যাগুরু দলের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর ছাড়া আর কোন বিকল্প নেই। কিন্তু তৎকালীন পাকিস্তানী শাসকগোষ্ঠী এসব নেতার কারও বক্তব্যকেই গুরুত্ব দেয়নি।


এদিকে প্রতিটি বাঙালীর চোখে তখন স্বাধীনতার স্বপ্ন। সবাই ভাবছে কবে আসবে সেই দিনের ডাক, সেদিন দেশের স্বাধীনতা ছিনিয়ে আনতে তারা একযোগে ঝাঁপিয়ে পড়তে পারবে যুদ্ধে এবং পাবে একটি স্বাধীন দেশ। এ সংবাদে ঢাকায় জনসাধারণের মধ্যে উত্তেজনার সৃষ্টি হয়। সন্ধ্যায় সরকারিভাবে ঘোষণা করা হয়,আজ ঢাকায় সেনাবাহিনীকে ব্যারাকে ফিরিয়ে নেয়া হয়েছে। মসজিদে মসজিদে জুমার নামাজের পর শহীদানের আত্মার শান্তি কামনা করে বিশেষ মোনাজাত অনুষ্ঠিত হয়। ঢাকাসহ সারাদেশে প্রতিবাদ সভা ও শোভাযাত্রার আয়োজন করা হয়। লাহোরে দেশের পূর্বাঞ্চলে সাম্প্রতিক আন্দোলনে নিহত শহীদদের গায়েবানা জানাজা অনুষ্ঠিত হয় এবং সঙ্কটময় মুহূর্তে দেশের সংহতির জন্য বিভিন্ন মসজিদে বিশেষ মোনাজাত অনুষ্ঠিত হয়। পিপলস পার্টির চেয়ারম্যান জেড. এ. ভুট্টো রাওয়ালপিন্ডির প্রেসিডেন্ট ভবনে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়ার সাথে ৫ ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে আলোচনা করেন।


রাওয়ালপিন্ডিতে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়ার সাথে পিপলস পার্টির প্রধান জেড. এ. ভুট্টোর আলোচনা বৈঠক শেষে পার্টির মুখপাত্র আবদুল হাফিজ পীরজাদা মন্তব্য করেন, জাতীয় পরিষদ অধিবেশন স্থগিত রাখার প্রেক্ষিতে প্রতিক্রিয়া যেভাবেই বিচার করা হোক না কেন, তা অত্যন্ত অবাঞ্ছিত এবং আদৌ যুক্তিযুক্ত নয়।