স্টাফ রিপোর্টার : খুলনা বিভাগে হামের (Measles) সংক্রমণ আবারও বাড়তে শুরু করেছে। বিশেষ করে ছোট শিশুদের মধ্যে নতুন ভেরিয়েন্টের হাম দেখা দিয়েছে। স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা সতর্ক করেছেন যে, এই নতুন ভেরিয়েন্ট শিশুদের মধ্যে দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে পারে এবং মৃত্যুর ঝুঁকি বৃদ্ধি করতে পারে। চার বছরের ব্যবধানে দেওয়ার কথা থাকা হাম প্রতিরোধক টিকা ২০২২ সালে নিয়মিতভাবে কার্যকর না হওয়ায় টিকা না পাওয়া শিশুদের মধ্যে সংক্রমণ বেড়েছে।
পবিত্র ঈদুল ফিতরের আগে খুলনার বিপণিবিতান ও ফুটপাতগুলোতে উপচে পড়া ভিড়ের মাঝে শিশুদের মধ্যে হামের সংক্রমণ জনস্বাস্থ্যের জন্য নতুন দু:শ্চিন্তা তৈরি করেছে। শ্রমজীবী মানুষের শেষ মুহূর্তের কেনাকাটার সঙ্গে শিশুদের সংক্রমণের ঝুঁকি যুক্ত হয়ে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে।
স্বাস্থ্য বিভাগের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী (২৯ মার্চ ২০২৬ পর্যন্ত), খুলনা বিভাগে মোট ৭৮ জন সন্দেহভাজন হাম রোগী শনাক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে ল্যাবরেটরিতে ২৬ জন রোগীর দেহে হামের জীবাণু নিশ্চিত হয়েছে। আক্রান্তদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকি রয়েছে কুষ্টিয়া জেলায়, যেখানে ৬৩ জন সন্দেহভাজন রোগী শনাক্ত হয়েছে। এর মধ্যে ৫০ জন চিকিৎসাধীন কুষ্টিয়া মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। এছাড়া যশোরে ছয়জন, খুলনা জেলায় তিনজন, মাগুরা, ঝিনাইদহ ও সাতক্ষীরাতেও সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়েছে। স্বস্তির বিষয় হলো, বাগেরহাট, চুয়াডাঙ্গা, মেহেরপুর ও নড়াইলে এখন পর্যন্ত কোনো রোগী শনাক্ত হয়নি।
ল্যাবরেটরিতে নিশ্চিত হওয়া ২৬ জন রোগীর বিশ্লেষণে দেখা গেছে, আক্রান্তদের মধ্যে বড় অংশই শিশু। বিশেষ করে ৬ মাস থেকে ৯ মাস বয়সী শিশুদের মধ্যে সংক্রমণের হার সবচেয়ে বেশি (২৬.৯%)। এছাড়া ১ থেকে ৪ বছর বয়সীদের মধ্যে সংক্রমণের হার ২৩.১%। চিকিৎসকদের মতে, শিশুদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম এবং টিকা সময়মতো না দেওয়ায় ঝুঁকি বেড়েছে।
দীর্ঘ সময় টিকা না দেওয়ার ফলে নতুন ভেরিয়েন্টের হাম শিশুদের মধ্যে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে জানিয়েছেন, ঈদের কেনাকাটার জন্য জনসমাগমে শিশুদের সঙ্গে যাওয়া ঝুঁকিপূর্ণ। হাম অত্যন্ত সংক্রামক এবং সহজেই একটি শিশুর মাধ্যমে অন্যদের আক্রান্ত করতে পারে।
খুলনা বিভাগে হামের জেলাওয়ারী সংক্রমণের তথ্যে জানা গেছে (প্রতি ১০ লাখ জনসংখ্যায়) কুষ্টিয়ায় ১৪.৬, চুয়াডাঙ্গা ১৪.৫, যশোর ১১.৬, খুলনা জেলা ৭.১, নড়াইল ৫.৭, মাগুরা ৪.৩, ঝিনাইদহ ২.২, সাতক্ষীরা ২.০, বাগেরহাট ০.০, খুলনা সিটি কর্পোরেশন ০.০, মেহেরপুর ০.০ এবং খুলনা বিভাগ মোট ৬.৭। ২০২৪ এবং ২০২৫ সালের তুলনায় ২০২৬ সালে সংক্রমণের হার উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে স্বাস্থ্য বিভাগের পক্ষ থেকে হাসপাতাল ও সিভিল সার্জনদের জন্য ছয়টি গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। প্রথমত, জ্বর এবং শরীরে লালচে দানা যুক্ত সকল ব্যক্তিকে সন্দেহজনক হাম রোগী হিসেবে রিপোর্ট করতে হবে। দ্বিতীয়ত, হাসপাতালে পৌঁছানোর সঙ্গে সঙ্গে রোগীকে আলাদা কক্ষে রাখতে হবে এবং প্রয়োজনে আলাদা আইসোলেশন ওয়ার্ড তৈরি করতে হবে। তৃতীয়ত, চিকিৎসক, নার্স, স্বাস্থ্যকর্মী এবং রোগীর স্বজনদের বাধ্যতামূলকভাবে মাস্ক পরিধান করতে হবে। চতুর্থত, নিউমোনিয়া ও অন্ধত্ব প্রতিরোধে আক্রান্ত শিশুদের উচ্চ মাত্রার ভিটামিন-এ প্রদানের সুপারিশ করা হয়েছে। পঞ্চমত, লালচে দানা দেখা দেওয়ার ৭ দিনের মধ্যে সিরাম ও থ্রোট সোয়াব সংগ্রহ করতে হবে। ষষ্ঠত, সংগৃহীত নমুনা ২৮ সেলসিয়াস তাপমাত্রায় রেখে ঢাকার মহাখালীতে জাতীয় পোলিও-মিজেলস পরীক্ষাগারে পাঠাতে হবে।
খুলনা জেলায় ৯ মাসের কম বয়সী তিনজন শিশু আক্রান্ত হয়েছেন। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, টিকা না হওয়ায় এই শিশুদের মৃত্যু ঝুঁকি রয়েছে। খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালসহ অন্যান্য সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে আলাদা আইসোলেশন ওয়ার্ড খোলা হয়েছে। নতুন ভেরিয়েন্টের হাম দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে পারে এবং স্বাভাবিকভাবে শেষ হয় না।
স্বাস্থ্য বিভাগের পক্ষ থেকে জনগণকে সতর্ক করা হয়েছে, শিশুদের হাম টিকা সময়মতো নিশ্চিত করতে হবে এবং শিশুর স্বাস্থ্য ও পরিচ্ছন্নতা নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করতে হবে। এছাড়া জনসমাগম এড়িয়ে চলা, হাইজিন বজায় রাখা এবং অসুস্থ হলে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়া জরুরি।
বিভাগীয় স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সংক্রমণ দ্রুত শনাক্ত করে নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা চলছে। সরকারি হাসপাতালগুলোতে পর্যাপ্ত ওয়ার্ড, চিকিৎসক এবং চিকিৎসা সরঞ্জাম নিশ্চিত করা হয়েছে। বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক অধ্যাপক মুজিবুর রহমান জানিয়েছেন, তাদের অধীনে থাকা হাসপাতালগুলোতে সর্বাত্মক প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।
তবে আক্রান্তের সংখ্যা বাড়লে পরিস্থিতি আরও সংকটময় হয়ে উঠতে পারে। স্বাস্থ্য বিভাগ সকলকে সচেতন থাকার জন্য আহ্বান জানাচ্ছে, বিশেষ করে নবজাতক, ছোট শিশু এবং ঝুঁকিপূর্ণ পরিবারের সদস্যদের নিরাপত্তার বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে।