জ্বালানি তেলের তেলেসমাতি
যেন কমছেই না খুলনাঞ্চলে
স্টাফ রিপোর্টার : খুলনাঞ্চলে জ্বালানি তেলের সংকট দিন দিন তীব্র আকার ধারণ করছে। ডিপো পর্যায়ে সরবরাহ কমে যাওয়া, ট্যাংকলরিতে অর্ধেক তেল দেওয়া, ফিলিং স্টেশনগুলোতে রেশনিং ব্যবস্থা চালু হওয়া এবং গ্রাহকদের দীর্ঘ লাইনের কারণে নগরজুড়ে এক ধরনের অস্থির পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। এতে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েছেন সাধারণ যানবাহন চালক ও পরিবহন সংশ্লিষ্টরা।
গতকাল রবিবার সকালে নগরীর দৌলতপুর এলাকায় অবস্থিত পদ্মা, মেঘনা ও যমুনা এই তিনটি প্রধান তেল ডিপোতে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, সকাল ৭টা থেকে সরবরাহ কার্যক্রম শুরু হলেও চাহিদার তুলনায় তেলের সরবরাহ অনেক কম। ডিপোর সামনে শতাধিক ট্যাংকলরি ও ট্রাক দীর্ঘ লাইনে অপেক্ষা করছে। অনেক গাড়ি তেল নিয়ে বের হলেও অধিকাংশ চালকের অভিযোগ তাদের চাহিদা অনুযায়ী তেল দেওয়া হচ্ছে না।
চালকরা জানান, ৯ হাজার লিটার ধারণক্ষমতার একটি ট্যাংকলরিতে তারা মাত্র ৪ থেকে ৫ হাজার লিটার তেল পাচ্ছেন। অনেক ক্ষেত্রে অর্ধেকেরও কম দেওয়া হচ্ছে, আবার কেউ কেউ কোনো তেল না পেয়েই ফিরে যাচ্ছেন। এতে করে পরিবহন খরচ ওঠানো কঠিন হয়ে পড়ছে বলে অভিযোগ করেন তারা।
ট্যাংকলরি চালক আমজাদ বলেন, আমরা দূর-দূরান্ত থেকে তেল নিতে আসি। কিন্তু যদি অর্ধেক তেল নিয়ে ফিরে যেতে হয়, তাহলে খরচই উঠে না। এতে আমরা বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়ছি।
ডিপো সূত্রে জানা গেছে, গতকাল রবিবার সকাল পর্যন্ত মেঘনা ও যমুনা ডিপো থেকে প্রায় ৩০টি এবং পদ্মা ডিপো থেকে প্রায় ৪২টি ট্যাংকলরি তেল নিয়ে বিভিন্ন জেলায় গেছে। তবে খুলনা বিভাগসহ বৃহত্তর ফরিদপুর অঞ্চলের মোট ১৫টি জেলার চাহিদার তুলনায় এই সরবরাহ অত্যন্ত অপ্রতুল বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
এদিকে ডিপো এলাকায় একটি জাহাজ থেকে ডিজেল খালাস করতে দেখা গেছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, আগামী মাসের প্রথম সপ্তাহে চট্টগ্রাম বন্দরে আরও দুটি জাহাজে করে ডিজেল ও অকটেন আসার সম্ভাবনা রয়েছে। এসব চালান পৌঁছালে বর্তমান সংকট কিছুটা লাঘব হতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে।
ডিপো থেকে সরবরাহ কম থাকায় এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে নগরীর ফিলিং স্টেশনগুলোতে। অনেক পাম্পে সকাল থেকেই তেল সরবরাহ বন্ধ ছিল। কিছু পাম্প অল্প সময়ের জন্য খুললেও দ্রুত তেল শেষ হয়ে যাওয়ায় আবার বন্ধ করে দেওয়া হচ্ছে।
যেসব পাম্প খোলা রয়েছে, সেখানে দীর্ঘ লাইন দেখা গেছে। মোটরসাইকেল, প্রাইভেটকার, মাইক্রোবাসসহ বিভিন্ন যানবাহনের চালকরা ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করছেন। অনেক জায়গায় রেশনিং পদ্ধতিতে তেল দেওয়া হচ্ছে কোথাও ২০০ টাকা, কোথাও ৫০০ টাকার বেশি তেল দেওয়া হচ্ছে না।
মোটরসাইকেল চালক আসাদুল্লাহ বলেন, দুই ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে মাত্র ৩০০ টাকার তেল পেয়েছি। এতে করে দৈনন্দিন কাজ চালানো খুবই কঠিন হয়ে পড়েছে।
পাশাপাশি পার্শ্ববর্তী উপজেলা থেকে বিপুল সংখ্যক যানবাহন নগরীতে এসে তেল নেওয়ার চেষ্টা করায় শহরের বিভিন্ন সড়কে তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়েছে।
জ্বালানি সংকটকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন ফিলিং স্টেশনে উত্তেজনা ও বিশৃঙ্খলা দেখা যাচ্ছে। কোথাও বাকবিতণ্ডা, কোথাও ধাক্কাধাক্কি এমনকি হামলার ঘটনাও ঘটছে। একাধিক স্থানে ফিলিং স্টেশন কর্তৃপক্ষ হুমকির মুখে পড়েছেন বলে জানা গেছে।
সম্প্রতি নড়াইলে একটি ঘটনায় ফিলিং স্টেশনের ম্যানেজারকে ট্রাক চাপা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। এ ঘটনায় অভিযুক্ত চালককে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী গ্রেফতার করেছে।
সংকটের সুযোগে কিছু অসাধু ব্যবসায়ী তেলের পরিমাপে কারচুপি করছে বলেও অভিযোগ উঠেছে। এ প্রেক্ষিতে প্রশাসন অভিযান জোরদার করেছে।
খুলনা বাইপাস সড়কের খানজাহান আলী এলাকায় আকন ফিলিং স্টেশনে ভ্রাম্যমাণ আদালত, র্যাব-৬ ও বিএসটিআই এর যৌথ অভিযানে তেল কম দেওয়ার প্রমাণ পাওয়া যায়। সেখানে প্রতি ১০ লিটার তেলে প্রায় ৮০০ থেকে ৮২০ গ্রাম পর্যন্ত কম দেওয়া হচ্ছিল। এ অপরাধে সংশ্লিষ্ট পাম্পকে ৩০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে।
অভিযানে উপস্থিত নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সাকিব হোসেন জানান, গ্রাহকদের সঙ্গে প্রতারণা কোনোভাবেই সহ্য করা হবে না। নিয়মিত তদারকি চালানো হবে এবং অপরাধ প্রমাণিত হলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
বর্তমানে খুলনার তিনটি ডিপো থেকেই খুলনা বিভাগ ও আশপাশের জেলাগুলোতে তেল সরবরাহ করা হয়। কিন্তু সরবরাহ কম থাকায় পুরো ব্যবস্থায় চাপ তৈরি হয়েছে। ডিলাররা বলছেন, তারা পর্যাপ্ত তেল না পেলে পাম্পে সরবরাহ বাড়ানো সম্ভব নয়।
এদিকে কালোবাজারি ঠেকাতে ডিপো থেকে সীমিত তেল দেওয়া হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। তবে এতে করে সাধারণ গ্রাহকদের দুর্ভোগ আরও বেড়েছে।
ডিপো সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা আশা করছেন, নতুন জাহাজে তেল আসার পর পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হবে। তবে ততদিন পর্যন্ত এই সংকট অব্যাহত থাকতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
খুলনায় জ্বালানি তেলের সংকট এখন বহুমাত্রিক সমস্যায় রূপ নিয়েছে। ডিপো থেকে শুরু করে পাম্প পর্যন্ত সরবরাহ ব্যবস্থার প্রতিটি স্তরে অস্থিরতা দেখা যাচ্ছে। দ্রুত সরবরাহ বৃদ্ধি ও কার্যকর নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা না নেওয়া হলে এই সংকট আরও গভীর হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।