স্টাফ রিপোর্টার: সুন্দরবন আবারও বনদস্যুদের দৌরাত্ম্যে অশান্ত হয়ে উঠেছে। আলামিন বাহিনী নামে একটি বাহিনীর বেপরোয়া তৎপরতায় জেলে, বাওয়ালী ও মৌয়ালদের জীবন-জীবিকা আজ চরম ঝুঁকির মুখে। অপহরণ, নির্যাতন, গুলি করে পঙ্গু করে দেওয়া এসব অভিযোগ এখন যেন নিত্যদিনের ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। সুন্দরবনে যেতেও ভয় পাচ্ছে জেলেরা।
স্থানীয় সূত্র ও ভুক্তভোগীদের স্বজনদের অভিযোগ, বাহিনীর প্রধান আলামিন সুন্দরবনের বিস্তীর্ণ এলাকায় আধিপত্য বিস্তার করে জেলেদের জিম্মি করে মোটা অঙ্কের চাঁদা আদায় করছে। বর্তমানে অন্তত ১৫ জন জেলে তার বাহিনীর হাতে আটক রয়েছে বলে জানা গেছে। তাদের মুক্তির জন্য পরিবারগুলোর কাছে মোটা অঙ্কের টাকা দাবি করা হচ্ছে। টাকা দিতে না পারলেই নেমে আসছে নির্মম নির্যাতন।
সম্প্রতি হান্নান নামে এক জেলেকে অপহরণ করে এক লাখ টাকা দাবি করা হয়। কিন্তু নির্ধারিত টাকা দিতে না পারায় তাকে পায়ে গুলি করে ছেড়ে দেওয়া হয়। গুরুতর আহত অবস্থায় বাড়ি ফিরলেও তার পায়ে পচন ধরেছে বলে জানিয়েছেন স্বজনরা। একইভাবে বর্তমানে আটক থাকা জেলেদের স্বজনদেরও হুমকি দেওয়া হচ্ছে দাবিকৃত অর্থ পরিশোধ না করলে তাদের পঙ্গু করে দেওয়া হবে।
অভিযোগ রয়েছে, জেলে বা বাওয়ালীদের বনাঞ্চলে ঢুকতে হলে আলামিন বাহিনীর কাছ থেকে অনুমতি নিতে হয়। এজন্য নৌকা প্রতি ২০ থেকে ৩০ হাজার টাকা পর্যন্ত চাঁদা দিতে হয়। আর মধু সংগ্রহ মৌসুমে মৌয়ালদের ক্ষেত্রে এই চাঁদার পরিমাণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে নৌকা প্রতি এক লাখ টাকায়। নির্ধারিত টাকা পরিশোধের পর একটি ‘কার্ড’ দেওয়া হয়, যা দেখিয়েই তারা নির্দিষ্ট এলাকায় কাজ করতে পারেন।
স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, এই চাঁদা সংগ্রহের কাজ পরিচালনা করেন আলামিনের স্ত্রী, যিনি কয়রা সদর এলাকায় ভাড়াবাসায় থাকেন। তার কাছেই পৌঁছে দিতে হয় সব অর্থ। ফলে পুরো প্রক্রিয়াটি একটি সুসংগঠিত চক্রের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে।
আলামিনের অতীত সম্পর্কেও উঠে এসেছে নানা তথ্য। তিনি একসময় কুখ্যাত জাহাঙ্গীর বাহিনীর সেন্ডে ইন কমান্ড ছিলেন। পরে দল থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে নিজস্ব বাহিনী গড়ে তোলেন। তার ভাই মো. হান্নানও পূর্বে বনদস্যু কর্মকাণ্ডে জড়িত ছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া তাদের মামা আজগর হোসেন সুন্দরবনের দস্যুদের কাছে অস্ত্র ও গুলি সরবরাহের সঙ্গে যুক্ত বলে স্থানীয়দের দাবি। প্রতিটি গুলি দেড় থেকে দুই হাজার টাকায় বিক্রি করা হয় বলেও অভিযোগ উঠেছে।
বর্তমানে আলামিন বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে রয়েছে সুন্দরবনের গেড়া, চালকি, আড়ুয়া শিবসা, খড়কুড়িয়া, জাবা, মুরুলি, কুরুলি, মার্কি, আদাপাচা ও মাদারবাড়ি এলাকা। এসব এলাকায় জেলে বা বনজীবীরা কার্যত তাদের অনুমতি ছাড়া প্রবেশ করতে পারেন না। বর্তমানে তার হাতে ১৫ জন জেলে জিম্মী রয়েছে। এরমধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে উপজেলার কালাম, হাফিজুর, মোক্তার, হাবিব ও আজগর। টাকা না দিলে তাদেরকে পঙ্গু করে পাঠিয়ে দেওয়া হবে বলে হুমকি দিয়েছে ভুক্তভোগীদের স্বজনদের।
এতসব অভিযোগ ও ঘটনার পরও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দৃশ্যমান তৎপরতা না থাকায় ক্ষোভ বাড়ছে স্থানীয়দের মধ্যে। ভুক্তভোগীদের পরিবারগুলো বলছে, সব তথ্য-প্রমাণ থাকার পরও এখনো পর্যন্ত কার্যকর কোনো অভিযান দেখা যাচ্ছে না। এতে করে দস্যুদের দৌরাত্ম্য আরও বেড়ে যাচ্ছে।
এ বিষয়ে কয়রা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. জাহিদুল ইসলাম জাহাঙ্গীর জানান, বনদস্যুদের বিরুদ্ধে পুলিশ তৎপর রয়েছে। তবে এখনো পর্যন্ত সুনির্দিষ্ট কোনো অভিযোগ দায়ের করা হয়নি। তিনি বলেন, সরকারের বিভিন্ন বাহিনী একযোগে কাজ করছে। আমরাও তাদের গ্রেপ্তারে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি।