দিনে শিক্ষক, বিকেলে সবজি বিক্রেতা এভাবেই চলছে তার নিরন্তর জীবনসংগ্রাম।
কালীগঞ্জ (ঝিনাইদহ) প্রতিনিধি: দীর্ঘ ২৬ বছর ধরে বিনা বেতনে শিক্ষকতা করে যাচ্ছেন আব্দুল কাইউম। জীবিকার তাগিদে শেষ পর্যন্ত তাকে বেছে নিতে হয়েছে ফুটপাতে সবজি বিক্রির মতো পেশা। তবুও থেমে নেই তার শিক্ষকতা—দিনে শিক্ষক, বিকেলে সবজি বিক্রেতা এভাবেই চলছে তার নিরন্তর জীবনসংগ্রাম।
উপজেলার নিয়ামতপুর গ্রামের বাসিন্দা আব্দুল কাইউম স্থানীয় মহিষাডেরা নিয়ামতপুর দাখিল মাদ্রাসার ইবতেদায়ী শাখার একজন জুনিয়র শিক্ষক। ২০০০ সালে শিক্ষকতা শুরু করলেও আজ পর্যন্ত তিনি কোনো বেতন-ভাতা পাননি। কারণ প্রতিষ্ঠানটি এখনো এমপিওভুক্ত হয়নি।
সংসারের চাহিদা মেটাতে প্রতিদিন বিকেলে তিনি কালীগঞ্জ শহরের বড় বাজারের থানা রোডে চাটাই পেতে বসেন। সেখানে বেগুন, কলা, ঢেঁড়স, উচ্ছে, পটল ও মরিচসহ নানা ধরনের সবজি বিক্রি করেন।
আব্দুল কাইউম জানান, পাঁচ সদস্যের সংসার চালানো দিন দিন কঠিন হয়ে উঠছিল। পৈত্রিক এক বিঘা জমির ফসল দিয়ে কোনোভাবে বছরের খাদ্যের যোগান মিললেও তা যথেষ্ট নয়। পাশাপাশি একটি মক্তবে মাসিক ৬ হাজার টাকায় পাঠদান করলেও সেখানেও নিয়মিত বেতন পান না। অবশেষে লোকলজ্জা উপেক্ষা করে জীবিকার তাগিদে সবজি বিক্রিতে নামতে হয়েছে তাকে।
তিনি বলেন, শুরুতে খুব কষ্ট লাগত। ছাত্র-শিক্ষকরা দেখলে অস্বস্তি হতো। কিন্তু এখন সব মেনে নিয়েছি। সংসার তো চালাতে হবে।
তার পরিবারে রয়েছেন গৃহিণী স্ত্রী, বড় মেয়ে সানজিদা খাতুন (আলিম পরীক্ষার্থী), ছেলে মাশরাফি আহমেদ (৫ম শ্রেণির শিক্ষার্থী) এবং ছোট মেয়ে সাদিয়া খাতুন (৫)।
মহিষাডেরা নিয়ামতপুর দাখিল মাদ্রাসাটি ২০০০ সালে প্রতিষ্ঠার পর একাডেমিক স্বীকৃতি পেলেও তা দীর্ঘদিন নবায়ন না হওয়ায় এমপিওভুক্ত হতে পারেনি। তবে ২০২৫ সালে পুনরায় স্বীকৃতি নবায়ন করা হয়েছে। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটিতে ৩০০ এর বেশি শিক্ষার্থী অধ্যয়ন করছে।
মাদ্রাসার অধ্যক্ষ জুলফিকার আলম জানান, প্রতিষ্ঠানে ১৫ জন শিক্ষক-কর্মচারী কর্মরত থাকলেও কেউই নিয়মিত বেতন পান না। ফলে অনেকেই চাকরি ছেড়ে চলে গেছেন। তিনি বলেন, “বেতন ছাড়া দীর্ঘদিন শিক্ষকতা করা সম্ভব নয়। তবুও দায়বদ্ধতা থেকে অনেকেই কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন।তিনি আরও জানান, শিক্ষার্থীরা দাখিল পরীক্ষায় ভালো ফলাফল করলেও শিক্ষকদের আর্থিক সংকট শিক্ষার মানে প্রভাব ফেলছে।
ঝিনাইদহ জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা লুৎফর রহমান বলেন, এমপিওভুক্তির জন্য নির্ধারিত শর্ত পূরণ জরুরি। আগে স্বীকৃতি নবায়ন না থাকায় আবেদন সম্ভব হয়নি, তবে এখন নিয়ম অনুযায়ী আবেদন করা যেতে পারে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রেজওয়ানা নাহিদ বলেন, বিষয়টি এই প্রথম জানলাম। শিক্ষকরা যোগাযোগ করলে তাদের সমস্যার বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।