নজর কাড়ছে দর্শনার্থীদের, বিক্রি হবে ১২ লাখে
রহমতুল্লাহ ও আনোয়ার আকুঞ্জী : খুলনার ডুমুরিয়া উপজেলার এক গ্রামীণ খামারে এখন প্রতিদিন উৎসবের আমেজ। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত একপলেকে দেখতে ভিড় করছেন শত শত মানুষ। কেউ বিশাল আকৃতির ষাঁড়টির সঙ্গে ছবি তুলছেন। কেউ ভিডিও করছেন, আবার কেউ শুধু বিস্ময় নিয়ে তাকিয়ে থাকছেন তার দিকে।
তবে গরুটির বিশাল দেহই শুধু নয়, মানুষের কথা বুঝে দাঁত দেখানোর অদ্ভুত অভ্যাসও তাকে আলাদা পরিচিতি এনে দিয়েছে। রাজা মানিক, দাঁত দেখাও এ কথা শুনলেই মুহূর্তে মুখ তুলে দাঁত বের করে দেয় ষাঁড়টি। আর সেই দৃশ্য ঘিরেই দর্শনার্থীদের মধ্যে তৈরি হয় হাসি, বিস্ময় আর আনন্দের আবহ। মানিক নামের রাজা নাম যুক্ত করেছে স্কুলের কোমলমতি শিক্ষার্থীরা।
রঘুনাথপুর ইউনিয়নর রঘুনাথপুর গ্রামের মিনু সাহার খামারে বেড়ে ওঠা এই বিশাল ষাঁড়টির নাম রাজা মানিক। প্রায় পাঁচ বছর ধরে নিজ সন্তানের মতো লালন-পালন করা গরুটি এখন পুরো এলাকায় আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। আসন্ন ঈদুল আজহা উপলক্ষে দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ ছুটে আসছেন একনজর রাজা মানিককে দেখতে।
খামার মালিক মিনু সাহা জানান, ছোটবেলা থেকেই তিনি গরুটিকে মানিক বলে ডাকতেন। পরে এলাকার শিশু-কিশোররা মজা করে নামের আগে রাজা যুক্ত করে দেয়। এরপর থেকেই সবার কাছে এটি রাজা মানিক নামেই পরিচিত হয়ে ওঠে।
খামারে গিয়ে দেখা যায়, গরুটিকে ঘিরে দর্শনার্থীদের কৌতূহলের শেষ নেই। কেউ তার উচ্চতা মাপার চো করছেন, কেউ শরীরের দৈর্ঘ্য নিয়ে আলোচনা করছেন। আর দাঁত দেখানোর দৃশ্যটি মোবাইল ক্যামেরায় ধারণ করতে ব্যস্ত। মিনু সাহা ডাক দিলে গরুটিও যেন প্রশিক্ষিত প্রাণীর মতো দাঁত বের করে দেয়।
মিনু সাহা বলেন, আমি ওকে কখনো বাজারের ক্ষতিকর ফিড খাওয়াইনি। ছোটবেলা থেকে নিজের সন্তানের মতো যত্ন করেছি। স্বাভাবিক খাবার দিয়েই এত বড় হয়েছে।
তিনি জানান, প্রতিদিন গরুটিকে কুঁড়ির ভাত, ভুট্টার গুঁড়ো, গমের ভুষি, খৈল, কাঁচা ঘাস, খড় ও বিভিন্ন ফলমূল খাওয়ানো হয়। শরীর ঠিক রাখতে মাঝে মধ্যে সামান্য লবণও দেওয়া হয়। তার দাবি, সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক পদ্ধতিতেই গরুটিকে বড় করা হয়েছে।
গরুটির জাত সম্পর্কে মিনু সাহা বলেন, এটি ফ্রিজিয়ান জাতের। বাড়ির পুরোনো গাভীর বংশ থেকেই এর জন্ম। কয়েক মাস আগে গরুটির মাকে আড়াই লাখ টাকায় বিক্রি করা হয়েছে। সেই গাভীও উন্নত জাতের ছিল এবং প্রচুর দুধ দিত।
পরিবারের বিষয়ে তিনি জানান, তাদের পরিবারে আগে পাঁচ ভাই ও তিন বোন ছিলেন। সম্প্রতি এক বোন মারা গেছেন। বর্তমানে দুই বোন ও পাঁচ ভাই রয়েছেন। মিনু সাহা অবিবাহিত এবং বাবার বাড়িতেই থাকেন। ভাই অসীম সাহাও খামারের কাজে সহযোগিতা করেন।
এলাকাজুড়ে এখন সবচেয়ে বেশি আলোচনা গরুটির ওজন নিয়ে। কেউ বলছেন ৩৫ মণ, কেউ ৪০ মণ, আবার কেউ ৪৮ মণ পর্যন্ত ধারণা করছেন। তবে মিনু সাহার দাবি, রাজা মানিক এর ওজন প্রায় ৪৫ মণের কাছাকাছি।
তিনি বলেন, এত বড় শরীর নিয়ে ওর চলাফেরা করতেও কষ্ট হয়। শুয়ে পড়লে উঠতে সময় লাগে। কিছুদিন আগে পড়ে গিয়ে পায়ে ব্যথাও পেয়েছিল।
গরুটির জন্য খামারের ভেতরে আলাদা জায়গা রাখা হয়েছে। সাধারণত সেই নির্দিষ্ট পরিসরের মধ্যেই ঘুরে বেড়ায় রাজা মানিক। মিনু সাহা জানান, আগে গরুটির গলায় কখনো রশি দেওয়া হতো না। কিন্তু এখন মানুষের ভিড় বেড়ে যাওয়ায় নিরাপত্তার কারণে নিয়ন্ত্রণে রাখতে হচ্ছে। গরুটি বিক্রি হলে গোয়ালঘর ভেঙ্গে তাকে বের করতে হবে।
তবে বিশাল এই গরুটিকে ঘিরে শুধু আনন্দ নয়, রয়েছে আক্ষেপও। মিনু সাহার অভিযোগ, গত বছর ১২ লাখ টাকায় গরুটি বিক্রির চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়েছিল। খুলনার এক ক্রেতা গরুটি কিনতে রাজিও হন। কিন্তু স্থানীয় একটি দালালচক্র অপপ্রচার চালিয়ে সেই বিক্রি বন্ধ করে দেয়।
তিনি বলেন, কিছু লোক গিয়ে ক্রেতাকে বলেছিল আমি নাকি ২৫ লাখ টাকা চাইছি। পরে তারা ভয় পেয়ে আর গরু নিতে আসেনি। এতে আমি অনেক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছি।
তার অভিযোগ, এখনো একটি দালালচক্র গরুটিকে নিয়ে বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়াচ্ছে, যাতে সম্ভাব্য ক্রেতারা পিছিয়ে যান।
বর্তমানে প্রতিদিন গরুটির খাবার ও পরিচর্যায় প্রায় ৮০০ থেকে ৯০০ টাকা খরচ হচ্ছে বলে জানান মিনু সাহা। গত এক বছরে অতিরিক্ত প্রায় দুই লাখ টাকা ব্যয় হয়েছে। তারপরও তিনি ১২ লাখ টাকার নিচে গরুটি বিক্রি করতে রাজি নন।
খামারে প্রতিদিন বিভিন্ন জেলা থেকে মানুষ আসছেন রাজা মানিক দেখতে। বগুড়া, যশোর, সাতক্ষীরা ও কুষ্টিয়াসহ বিভিন্ন এলাকার দর্শনার্থীরা গরুটিকে দেখে বিস্ময় প্রকাশ করছেন।
বগুড়া থেকে আসা হাফিজুর রহমান বলেন, টেলিভিশনে বড় গরু দেখেছি, কিন্তু সামনে থেকে এত বড় গরু কখনো দেখিনি।
টিএমএসএস-এ কর্মরত রায়হান খন্দকার বলেন, দাঁত দেখাতে বললে সত্যিই দাঁত বের করে দেয় এটা খুব অবাক করার মতো বিষয়।
সাতক্ষীরা থেকে আসা অরুণ সরকার বলেন, নেটে অনেক বড় গরুর ছবি দেখেছি, কিন্তু বাস্তবে এত বড় গরু এই প্রথম দেখলাম।
খামারের পরিচর্যাকারী মমতাও প্রতিদিন গরুটির দেখাশোনায় সহযোগিতা করেন। সকাল থেকে খাবার দেওয়া, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ও অন্যান্য কাজ সামলাতে হয় তাকে।
ঈদুল আজহাকে সামনে রেখে বড় গরুর বাজারে যখন প্রতিযোগিতা তুঙ্গে, তখন ডুমুরিয়ার রাজা মানিক হয়ে উঠেছে এক ব্যতিক্রমী আকর্ষণ। বিশাল আকৃতি, মানুষের কথা বুঝে দাঁত দেখানোর অভ্যাস এবং এক খামারির দীর্ঘদিনের শ্রম ও ভালোবাসার গল্প মিলিয়ে গরুটি এখন শুধু কোরবানির পশু নয়, বরং পুরো অঞ্চলের কৌতূহল আর আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু।