শেখ মনিরুল ইসলাম, দিঘলিয়া (খুলনা) : খুলনার দিঘলিয়ার আতাই নদীতে এবার ইলিশের দেখা মিলছে না। দিন-রাত নদীতে জাল ফেলেও অধিকাংশ সময় খালি হাতে ফিরছেন জেলেরা। গত বছরগুলোতে এ সময়ে জেলেদের জালে ঝাঁকে ঝাঁকে ইলিশ ধরা পড়লেও চলতি মৌসুমে চিত্র সম্পূর্ণ উল্টো। দু-একটি ছোট ইলিশ ধরা পড়লেও তা দিয়ে নৌকার জ্বালানি ও শ্রমের খরচই উঠছে না। ফলে ইলিশনির্ভর শত শত জেলে পরিবারে দেখা দিয়েছে হতাশা।
রূপসা ও দিঘলিয়া উপজেলার মধ্য দিয়ে প্রবাহিত আতাই নদী। বছরের এ সময়ে রূপসা-আতাইয়ের মোহনা থেকে তেরখাদা ও সেনহাটীসংলগ্ন নদী এলাকায় ইলিশের আনাগোনা বাড়ে। জেলেরা জাল ফেলে প্রচুর ইলিশ আহরণ করেন। নদীসংলগ্ন ঘাটগুলোতে জমে ওঠে মাছের বেচাকেনা। তবে এবার নদীতে বারবার জাল ফেলেও আশানুরূপ মাছ পাচ্ছেন না জেলেরা।
আড়ুয়া, মাধবপুর, লক্ষ্মীকাঠী, মমিনপুর, হাজীগ্রাম, সেনহাটী, কোলা, পাটগাতী, নৈহাটি ও নিকলাপুর এলাকার কয়েকশ জেলে পরিবার আতাই নদীর ওপর নির্ভরশীল। তাঁদের অনেকেই দাদন নিয়ে নৌকা ও জাল নিয়ে নদীতে নামেন। মাছ না পাওয়ায় ঋণের বোঝা বাড়ছে। দু-একটি ছোট ইলিশ ধরা পড়লেও তা দাদনদাতা ও ফড়িয়াদের হাতে চলে যাচ্ছে।
ইলিশ গবেষক ও বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের সাবেক পরিচালক আনিসুর রহমান বলেন, গত দুই বছরে ইলিশের উৎপাদন ও মাছের গড় আকার—দুটিই কমেছে। একসময় একটি ইলিশের গড় ওজন ৪০০ থেকে ৪৫০ গ্রাম থাকলেও এখন তা কমে ৩০০ থেকে ৩৫০ গ্রামে নেমে এসেছে।
তিনি বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সমুদ্রের তাপমাত্রা বৃদ্ধি, নদীদূষণ, নাব্য কমে যাওয়া এবং ইলিশের প্রজননক্ষেত্র ধ্বংসের প্রভাব পড়ছে ইলিশের উৎপাদনে।
খুলনা জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. বদরুজ্জামান বলেন, একটি ইলিশের ওজন এক থেকে দেড় কেজি হতে অন্তত দেড় বছর সময় লাগে। নদীতে ডিম ফুটে জাটকা বা পোনা ইলিশ সাগরে চলে যায়। প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পর ডিম ছাড়তে আবার স্বাদুপানিতে ফিরে আসে। কিন্তু অতিরিক্ত মাছ ধরার কারণে ইলিশ তার জীবনচক্র সম্পন্ন করতে পারছে না।
তিনি আরও বলেন, মোহনায় নিষিদ্ধ জালের ব্যবহার, বালু উত্তোলন, শিল্পদূষণ, অপরিকল্পিত অবকাঠামো নির্মাণ এবং ট্রলারে মা ইলিশ ও জাটকা নিধনের কারণে ইলিশের মজুদ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
নিষিদ্ধ জাল ব্যবহারের বিরুদ্ধে আইনে সর্বোচ্চ দুই বছরের কারাদণ্ড বা পাঁচ লাখ টাকা জরিমানা অথবা উভয় দণ্ডের বিধান রয়েছে। তারপরও নদীতে নিষিদ্ধ জালের ব্যবহার বন্ধ না হওয়ায় ইলিশের প্রজনন ও বিচরণক্ষেত্র হুমকির মুখে পড়ছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানান।