হ্যান্ড মাইক-বাঁশের লাঠি হাতে রাত জাগছেন তরুণরা
ভ্রাম্যমান প্রতিনিধি, তেরখাদা (খুলনা): রাত বাড়লেই যখন নিস্তব্ধ হয়ে আসে চারপাশ, তখন ঘুমে চোখ বন্ধ হয় না একদল তরুণের। কারও হাতে হ্যান্ড মাইক, কারও হাতে বাঁশের লাঠি। দলবেঁধে পাড়া-মহল্লার সড়ক, অলিগলি ও নির্জন জায়গায় টহল দেন তারা। হ্যান্ড মাইকে দেন মাদকবিরোধী সচেতনতামূলক বার্তা। অপরিচিত কাউকে দেখলে জানতে চান পরিচয়। নজর রাখেন মাদকের সম্ভাব্য আড্ডাস্থলগুলোতেও। তেরখাদা উপজেলার পশ্চিমপাড়ায় তরুণদের এমন উদ্যোগে তৈরি হয়েছে সামাজিক সাড়া। কয়েকজন যুবকের ব্যক্তিগত উদ্যোগে শুরু হওয়া রাতের পাহারা এখন রূপ নিচ্ছে সংগঠিত সামাজিক প্রতিরোধে। মাদক, জুয়া, ধর্ষণসহ বিভিন্ন সামাজিক অপরাধের বিরুদ্ধে সচেতনতা তৈরির পাশাপাশি তরুণদের ইতিবাচক কর্মকাণ্ডে যুক্ত করার উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। এই কার্যক্রমকে আরও সংগঠিত করতে গঠন করা হয়েছে ‘তেরখাদা পশ্চিমপাড়া মাদকবিরোধী যুব পরিষদ’-এর ৬১ সদস্যের নতুন কমিটি। এতে সোহেল রানাকে সভাপতি এবং সামিউল ইসলাম মিদুলকে সাধারণ সম্পাদক করা হয়েছে।
গত বুধবার রাতে তেরখাদার জয়সেনা বাজারের হাটখোলায় মাদক ও সামাজিক অপরাধ প্রতিরোধে আয়োজিত আলোচনা সভা শেষে এ কমিটি ঘোষণা করা হয়। জয়সেনা বাজার নূরানী ও এতিমখানা মাদ্রাসার সভাপতি মুজিবুর রহমান শেখের সভাপতিত্বে সভাটি পরিচালনা করেন মোঃ জাবের আলী। সভায় তেরখাদা উপজেলা বিএনপির সম্মেলন প্রস্তুত কমিটির আহ্বায়ক চৌধুরী কাওসার আলী, তেরখাদা থানার পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) মোঃ তহিদুল ইসলামসহ রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রতিনিধি, জনপ্রতিনিধি, শিক্ষক, সাংবাদিক, ব্যবসায়ী ও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ উপস্থিত ছিলেন। আলোচনায় বক্তারা বলেন, মাদক শুধু একজন মানুষের জীবনকে বিপথে নেয় না; এর প্রভাব পড়ে পরিবার ও পুরো সমাজে। তাই মাদক প্রতিরোধে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতার পাশাপাশি সামাজিক সচেতনতা ও স্থানীয় মানুষের সম্মিলিত উদ্যোগ জরুরি। তবে কমিটি গঠনের আগেই পশ্চিমপাড়ায় রাতের পাহারা শুরু করেছিলেন তরুণরা। কয়েকটি দলে ভাগ হয়ে তারা রাতে বিভিন্ন এলাকায় টহল দেন। কোনো স্থান বা ব্যক্তির গতিবিধি সন্দেহজনক মনে হলে স্থানীয়ভাবে খোঁজ নেওয়ার পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে জানানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়।
স্থানীয়দের অভিযোগ, জয়সেনা বিলের কাছে একটি পরিত্যক্ত এলাকায় টিনের ঘরে মাদকসেবন ও বিক্রির আড্ডা বসত। পরে তরুণদের উদ্যোগে ওই আড্ডাঘরে অভিযান চালিয়ে বিপুল পরিমানে ইয়াবা সেবনের সরঞ্জাম, গাঁজা, ইনজেকশন সিরিঞ্জ সহ নানা নেশাদ্রসহ এক যুবককে আটক করে পুলিশের কাছে হস্তান্তর করে ঘরটি উচ্ছেদ করা হয়। পশ্চিমপাড়া মাদকবিরোধী যুব পরিষদের সভাপতি শেখ সোহেল তাজ বলেন, মাদকের বিস্তার এখন শুধু শহরাঞ্চলে সীমাবদ্ধ নেই। প্রত্যন্ত এলাকাতেও এর প্রভাব রয়েছে। তাই তরুণরা কয়েকটি দলে ভাগ হয়ে রাতভর পাহারা দিচ্ছেন। হ্যান্ড মাইকে মানুষকে সচেতন করার পাশাপাশি সম্ভাব্য মাদক আড্ডাগুলোতে নজরদারি রাখা হচ্ছে। তরুণদের এ উদ্যোগে পাশে দাঁড়িয়েছেন স্থানীয় চিকিৎসক রবিউল ইসলাম। পাহারায় থাকা কোনো তরুণ অসুস্থ হয়ে পড়লে বিনামূল্যে চিকিৎসা দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন তিনি। তার ভাষ্য, মাদকের কারণে একটি পরিবার কীভাবে বিপর্যস্ত হয়, তা তিনি কাছ থেকে দেখেছেন। তাই নিজেদের দায়িত্ববোধ থেকে তরুণদের এভাবে মাঠে নামা আশাব্যঞ্জক। স্থানীয় অভিভাবকরাও বলছেন, রাতের পাহারায় এলাকায় নিরাপত্তাবোধ বাড়ছে। একই সঙ্গে তরুণদের মধ্যে সামাজিক দায়িত্ববোধও তৈরি হচ্ছে। নবগঠিত যুব পরিষদের নেতাদের প্রত্যাশা, পশ্চিমপাড়ায় শুরু হওয়া এ উদ্যোগ তেরখাদার অন্য এলাকাতেও ছড়িয়ে পড়বে। হ্যান্ড মাইকের সচেতনতামূলক বার্তা আর বাঁশের লাঠি হাতে রাতের পাহারা একসময় মাদক ও সামাজিক অপরাধের বিরুদ্ধে বৃহত্তর সামাজিক আন্দোলনে রূপ নেবে।