নগরীতে ২০ ঘন্টার ব্যবধানে তাঁতীদল নেতাসহ ২ জন খুন
১০ মাস ১ দিনে ৭৩ হত্যা, গুলিতে প্রাণ গেছে ২৩ জনের
ক্লিনিকে হামলা, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে চাঁদা দাবি ও ভাঙচুরের অভিযোগ
রঞ্জু আহমদ ঃ কখনো প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা, কখনো ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে খুন কিংবা জখম, আবার কখনো বাড়িতে ঢুকে গুলিবর্ষণ। ছিনতাইয়ের মতো অপরাধেও ব্যবহার করা হচ্ছে আগ্নেয়াস্ত্র।
অন্যদিকে চাঁদা না পেয়ে ক্লিনিক ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে হামলা-ভাঙচুর হচ্ছে হামেশাই। চাঁদা দিতে না পেরে বন্ধ হচ্ছে প্রতিষ্ঠান। প্ল্যান নিয়েও বাড়ি করা থেকে বিরত থাকছেন অনেকে চাঁদার ভয়ে। প্রতিনিয়ত এসব ঘটনায় উদ্বেগ-আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছে খুলনা মহানগর ও জেলার বাসিন্দারা। নিরাপত্তাহীনতায় রয়েছেন ব্যবসায়ী, চিকিৎসক, রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ।
খুলনায় হত্যাকাণ্ডের পাশাপাশি বাড়ছে সশস্ত্র হামলার ঘটনাও। রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মী, ব্যবসায়ী, নারী, শিক্ষক, স্কুলছাত্রী ও সাধারণ পথচারীরাও গুলির শিকার হয়েছেন। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী অস্ত্র উদ্ধার ও অপরাধীদের গ্রেপ্তারে অভিযান চালানোর কথা বললেও একের পর এক সহিংস ঘটনায় আতঙ্ক বাড়ছে। বরং যখনই সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের কথা বলা হয় সরকারের বিভিন্ন সংস্থার পক্ষ থেকে তখনই তাদের প্রতি চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দেওয়া হচ্ছে সন্ত্রাসীদের তরফ থেকে। সম্প্রতি আইজিপির খুলনা অবস্থানকালে যেমন তেরখাদায় গুলির ঘটনা ঘটে তেমনি তাঁর প্রস্থানের পরই ঘটে আরও কয়েকটি অঘটন। এমনকি স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী যেদিন খুলনা-বাগেরহাট সফর করেন সেদিনও খুলনায় দু’টি খুনের ঘটনা ঘটে। এমনকি মায়ের সামনে মেয়েকে ‘আপা কেমন আছেন’ বলেই গুলি করে ও কুপিয়ে হত্যার মতো ঘটনাও ঘটে।
পর পর খুন ও গুলি : খুলনা নগরীতে গত ২০ ঘণ্টার ব্যবধানে পৃথক ঘটনায় দুই ব্যক্তি খুন হয়েছেন। তাঁদের একজন মহানগর তাঁতি দলের যুগ্ম আহ্বায়ক হুমায়ুন কবির। রবিবার সন্ধ্যায় নগরীর রায়েরমহল বড় মসজিদের পেছনে নিজের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান হিল ক্যান্টিনে তাঁকে কুপিয়ে হত্যা করে অস্ত্রধারীরা। এর আগে শনিবার রাতে লবণচরা থানা এলাকায় শহীদুল ইসলাম কলিন (৩৫) নামে এক যুবকের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। তাঁর শরীরেও ধারালো অস্ত্রের আঘাতের চিহ্ন রয়েছে।
পুুলিশ ও স্থানীয়রা জানান, রবিবার সন্ধ্যায় হুমায়ুন কবির নিজের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে বসে ছিলেন। এসময় ৪/৫জন দুর্বৃত্ত সেখানে গিয়ে তাঁকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে এলোপাতাড়ি কুপিয়ে গুরুতর জখম করে পালিয়ে যায়। স্থানীয় লোকজন তাঁকে উদ্ধার করে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন। নিহত হুমায়ুন কবির সৈয়দ আনোয়ার আলীর ছেলে। তিনি রায়েরমহল বড় মসজিদের পেছনে নিজ বাসায় বসবাস করতেন।
নিহতের ভাতিজা সৈয়দ দিদারুল করিম বিপ্লব অভিযোগ করেন, ছাত্রদল নেতা আরাফাত ও তাঁর সহযোগীরা দেশীয় অস্ত্র নিয়ে হুমায়ুন কবিরের ওপর হামলা করেন।
গতরাতে কেএমপি থেকে দেওয়া এক বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, হুমায়ুন কবির হত্যাকাণ্ডে জড়িত চারজনকে শনাক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে একজনকে আটক করেছে পুলিশ।
কেএমপির উপপুলিশ কমিশনার (উত্তর) সুদর্শন কুমার রায় বলেন, প্রাথমিক অনুসন্ধানে জানা গেছে, আরাফাতের দোকান থেকে কিস্তিতে ফ্রিজ কিনেছিলেন হুমায়ুন কবির। কিস্তির টাকা সময়মতো পরিশোধ না করায় ঘটনার আগে আরাফাত ও ফায়েকের সঙ্গে তাঁর কথা-কাটাকাটি ও হাতাহাতি হয়। এর জেরেই হত্যাকাণ্ড ঘটে থাকতে পারে। হুমায়ুন কবির হত্যার সঙ্গে জড়িত থাকার সন্দেহে একজনকে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় জড়িত অন্যদের গ্রেপ্তারে পুলিশ কাজ করছে।
এর আগে শনিবার রাত ১১টার দিকে নগরীর লবণচরা থানাধীন বুড়ো মৌলভীর দরগার কাশেমিয়া জামে মসজিদ থেকে প্রায় ৫০০ গজ দূরে রাস্তার ওপর শহীদুল ইসলাম কলিনের মরদেহ পাওয়া যায়। তিনি ওই এলাকার মাহতাব উদ্দিনের ছেলে।
লবণচরা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সৈয়দ মোশারেফ হোসেন বলেন, নিহত কলিনের বিরুদ্ধে মাদকসংক্রান্ত সাতটি এবং একটি হত্যা মামলা রয়েছে। তিনি প্রায়ই বাড়ির বাইরে থাকতেন। মাঝেমধ্যে মা-বাবার সঙ্গে দেখা করতে আসতেন। শনিবার বাড়িতে এসে সন্ধ্যার দিকে বের হওয়ার পর তাঁর মরদেহ উদ্ধার করা হয়। হত্যাকাণ্ডের বিষয়টি তদন্ত করা হচ্ছে।
এর আগে ২২ অক্টোবর সকালে ও সন্ধ্যার পর খুলনা নগরে দুটি হত্যাকাণ্ড ঘটে। সেদিন সকালে খুন হন তাওহিদুল ইসলাম নামের এক যুবক। সন্ধ্যার পর খুন হন খুশি আক্তার নামের এক নারী।
পুলিশের তদন্ত-সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, তাওহিদুল ‘পলাশ গ্রুপের’ সদস্য ছিলেন। এই গ্রুপের সঙ্গে রনি চৌধুরী বাবু ওরফে ‘গ্রেনেড বাবু’ গ্রুপ বা বি কোম্পানির বিরোধ রয়েছে। অন্যদিকে খুশি আক্তার একটি গ্রুপের হয়ে মাদক বিক্রি করতেন বলে পুলিশের কাছে তথ্য রয়েছে।
এর পর ২৪ ও ২৫ অক্টোবর বটিয়াঘাটার বিএনপি ও যুবদলের দুই নেতাকে গুলি করে। তাদের অবস্থা আশঙ্কাজনক। ওইদিন নগরীর নিরালা মোড়ে এক সালমান হাওলাদার নামে এক বেসরকারি চাকরীজিবীকে গুলি করে সন্ত্রাসীরা।
নগর ও জেলা পুলিশের দেওয়া তথ্য মতে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে অক্টোবর পর্যন্ত ১০ মাসে খুলনা মহানগর ও জেলায় ৭২ জন খুন হয়েছেন। আর গতকাল সন্ধ্যায় একজনসহ খুলনায় মোট হত্যার ঘটনা ঘটলো ৭৩টি। এসব ঘটনায় মামলা হয়েছে ৭০টি। এর মধ্যে ২৪ জনকে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। অন্যদের কুপিয়ে বা পিটিয়ে হত্যা করা হয়। পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, মাদক ব্যবসা, চাঁদাবাজির নিয়ন্ত্রণ, ছিনতাই, পূর্বশত্রুতা এবং সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোর বিরোধ এসব হত্যাকাণ্ডের অন্যতম কারণ। একই সময়ে অন্তত ৩৬টি হত্যার ঘটনা ঘটে জেলা পুলিশের আওতাধীন বিভিন্ন এলাকায়। পুলিশের সূত্রটি জানিয়েছে, অধিকাংশ হত্যাকাণ্ডের পেছনেই মাদকসংক্রান্ত বিরোধ রয়েছে।
পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর তথ্যমতে, খুলনায় সক্রিয় রয়েছে ৯টি সন্ত্রাসী গ্রুপ। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সূত্রগুলোর দাবি, এসব গোষ্ঠী নগরীর বিভিন্ন এলাকায় নিজেদের আধিপত্য বিস্তার করে রেখেছে।
এসব গোষ্ঠীর বিরোধের পেছনে মাদক ব্যবসা, চাঁদাবাজি এবং অপরাধজগতের নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
পুলিশের সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, এক পক্ষের বিরুদ্ধে অন্য পক্ষের এলাকায় প্রভাব বিস্তার ও ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। এর জেরে সংঘর্ষ, গুলিবর্ষণ ও হত্যাকাণ্ড ঘটছে।
বাদ যাচ্ছে না ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষ : নগরীর পুরনো ফার্মেসীগুলোর মধ্যে অন্যতম টুটপাড়া সেন্ট্রাল রোডের চয়নিকা ফার্মেসী। ওই ফার্মেসিতে ২০ লাখ টাকা চাঁদা দাবির অভিযোগ উঠেছে। চাঁদা না দিলে অপহরণের হুমকি দেওয়ার অভিযোগের পর নিরাপত্তাহীনতায় ফার্মেসিটি বন্ধ রেখেছেন মালিকপক্ষ। একই সঙ্গে প্রাণভয়ে বাড়ি ছেড়েছেন প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপক। দীর্ঘ দুই যুগেরও বেশি সময় ধরে সেবা দিয়ে আসা ফার্মেসিটি হঠাৎ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় স্থানীয় বাসিন্দা ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে উদ্বেগ-আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে।
গত বুধবার সন্ধ্যায় অস্ত্রধারী দুই ব্যক্তি সরাসরি ফার্মেসিতে গিয়ে চাঁদার টাকা প্রস্তুত না রাখলে ব্যবস্থাপককে তুলে নিয়ে যাওয়ার হুমকি দেয়। এর কয়েকদিন আগে অক্টোবর রাতে নগরীর পুরনো ক্লিনিক সন্ধানী ক্লিনিকে হামলা চালায় সন্ত্রাসীরা। ভাঙচুর করে ক্লিনিকের যন্ত্রপাতি। এসময় সন্ত্রাসীরা আতঙ্ক ছড়াতে ফাঁকা গুলি চালায়। একইভাবে সোনাডাঙ্গায় অবস্থিত সন্ধানী ক্লিনিকেও হামলা চালানো হয়। এছাড়া চাইনিজ প্যালেস নামক আহসান আহমেদ রোডের একটি রেস্টুরেন্টে হামলা চালায় সন্ত্রাসীরা।
এসব ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন খুলনার নাগরিক সমাজের নেতৃবৃন্দ। সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) খুলনার সভাপতি এড. কুদরত ই খুদা বলেন, হত্যা ও চাঁদাবাজির ঘটনায় মানুষের মাঝে উদ্বেগ আতঙ্ক বাড়ছে। পুলিশের উচিত ছিলো আরও সক্রিয়ভাবে কাজ করা। যেভাবে আইনশ্ঙৃখলা পরিস্থিতির অবনতি হচ্ছে তাতে সাধারণ মানুষের মধ্যে ভয় কাজ করছে।
খুলনা মহানগর পুলিশের (কেএমপি) পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ৩১ অক্টোবর পর্যন্ত মহানগর এলাকায় ৩৬টি হত্যা মামলা হয়েছে। এসব ঘটনায় নিহত হয়েছেন ৩৬ জন। একই সময়ে জেলা পুলিশের আওতাধীন এলাকায় হত্যা মামলা হয়েছে ৩৬টি। সর্বশেষ গতকাল তাঁতীদল নেতা হুমায়ুন কবির হত্যার পর নগরী ও জেলায় এ বছরের ১০ মাস একদিনে মোট খুন হয় ৭৩টি।
কেএমপির অতিরিক্ত কমিশনার এম এম শাকিলুজ্জামান বলেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ঠিক করতে পুলিশ মাঠে কাজ করছে। তবে এই কাজ পুলিশের একার পক্ষে সম্ভব নয়। সাধারণ জনগনকে এগিয়ে আসতে হবে। পুলিশকে সহযোগিতা করতে হবে।
জেলা পুলিশ সুপার সরকার ওমর ফারুক বলেন, আমরা দ্রুত হত্যাকান্ডগুলোর রহস্য উদঘাটন করার চেষ্টা করছি। পাশাপাশি অপরাধীরা গ্রেপ্তার হচ্ছে। তবে পুলিশসহ সকল পর্যায়ের মানুষের অপরাধীদের বিষয়ে সজাগ থাকতে হবে।